Published : 06 Jul 2026, 01:41 AM
খুলনার সুন্দরবন ঘেঁষা দাকোপ উপজেলার প্রত্যন্ত চুনকুড়ি গ্রামের ৭০ বছর বয়সি বাবর আলী এক সময় দিনমজুরি করতেন। বয়সের কারণে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ, ইদানিং বেশি ভুগছেন কোমরের ব্যথায়।
কষ্ট বেশি হলে স্থানীয় দোকান থেকে তিনি ‘ব্যথার বড়ি’ কিনে খান। খরচের কথা ভেবে ডাক্তার দেখাতে যেতে পারেন না।
এর মধ্যে তার ৬৬ বছর বয়সি স্ত্রী মহিফুল বিবি কয়েকবছর ধরে ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ করছেন। স্থানীয় ওঝা-কবিরাজ দিয়ে ঝারফুঁক করিয়েছেন, তাতে কাজ হয়নি।
৪ ছেলে, ৪ মেয়ের জনক বাবরের এখন নিজের কোনো আয় নেই। এক ছেলে বাদে সবার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেরা কেউ দেখে না, মেয়েরা মাঝেমধ্যে কিছু টাকা পয়সা দেয়। তাতে বুড়োবুড়ির বেঁচে থাকা দায়।
এমন ‘বয়োজ্যেষ্ঠ’ নাগরিকদের সহায়তার জন্যই সরকার বয়স্ক ভাতা দেয়। বাবর আলীও প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা পান। সেই টাকা তার হাতে আসে তিন মাস পরপর। তাতে প্রয়োজন মেটে?
ভূমিহীন এই বৃদ্ধ বললেন, “ওইতো খালি ওষুধ কিনতিই যায়, ওই টাকায় আমার সংসারে কোনো কাজ হয়?”
তিনি হিসাব দিয়ে বলতে থাকেন, দুইজনে দৈনিক তিনবেলা ভাত খেতে কেজিখানেক চালের দরকার পড়ে। সবচেয়ে কমদামি চালের কেজিও এখন ৫৫-৬০ টাকা। ৫০ টাকা কেজি ধরলেও মাসপ্রতি ৩০ কেজি চালের দামই ১৫০০ টাকা।
“এর বাইরি তেল, ডাল, মসলা, তরিতরকারির খচ্চা ধরলি মাসে আরো ১৫০০ টাআর কমে অয়? মাছ-গোসতের হিসেব না করলিও মাসে সাড়ে ৬০০ টাআয় খায়ে বাঁচে থাহা সম্ভব?”
অথচ সন্তানেরা মনে করছেন, তাদের বাবা-মা সরকারি সহায়তা পান। নামমাত্র ভাতায় সন্তানদের কাছে ‘নির্ভার হওয়ার ভাব’ যেন এই বয়স্ক দম্পতির আরেক ‘বিড়ম্বনা’।
চোখে মুখে হতাশা নিয়ে বাবর আলী বলেন, “গরিব মানষির বাঁচে থাহার দরকারই নেই! বয়স অয়ে গেলি তো আরো আগেই না। পোলাপানতো মনে কত্তেছে আমরা টাআ পাচ্ছিই। আর তারাই বা কনতে দেবে, সবারইতো সংসার আছে।”
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং একটি মূল মহাপরিকল্পনা বা কৌশলের আওতায় পরিচালিত হয়।
সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একে বাস্তব রূপ দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সমন্বিত কাঠামোয় আনতে ২০১৫ সালে ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ নামে একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করে সরকার।
রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী বয়স্ক ভাতা চালু করা হয়েছে ‘বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবারে মর্যাদা বৃদ্ধির’ লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু বর্তমান বাজারে মাসে ৬৫০ টাকায় ‘আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা সম্ভব?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, এসব ভাতার নামে ‘ঢালাওভাবে কিছু অর্থ’ দেওয়া হলেও সেই অর্থ দিয়ে বাজার মূল্যে কতটা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, তা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
তার ভাষ্য, “যে পরিমাণ অর্থ এই সমস্ত মানুষদেরকে দেওয়া হয়, এটা আসলে তাদের অসহায়ত্বের সাথে রাষ্ট্রের এক ধরনের তামাশা।”
সরকারের দায়িত্বশীলরাও প্রয়োজনের তুলনায় এই ‘স্বল্প বরাদ্দের’ কথা স্বীকার করছেন। তবে তারা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সার্বিকভাবে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা ‘নেহাত কম নয়’।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ অবশ্য অন্য কথা বললেন। তার ভাষায়, সামাজিক নিরাপত্তার যে সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা সরকারের তরফে দেওয়া হয়, তার ভেতরেই গণ্ডগোল আছে।
“আমরা অনেক কিছুকেই সোশ্যাল প্রটেকশন বলি। আমরা যদি একটু নিবিড়ভাবে দেখার চেষ্টা করি, তখন বুঝব, এগুলো আসলে সামাজিক সুরক্ষা নয়। এগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয় যে বিশাল একটা অংক আমরা সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ দিচ্ছি।”
চলতি বছরের মার্চে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে 'ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম চালু করেছে।
‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’–এই নীতি সামনে রেখে দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোকে ‘সুসংগঠিত সামাজিক সুরক্ষার আওতায়’ আনার লক্ষ্য নিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ৪১ লাখ উপকারভোগীকে এ কার্ডের আওতায় সুবিধা দিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যা সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে বরাদ্দের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম।
এই কার্ডের আওতায় এক একটি নারী-প্রধান পরিবারকে মাসপ্রতি ২৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য সরকার ঠিক করেছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ডকেই’ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন। তবে অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে ভাতাভোগী এবং ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের জন্য ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। একইসঙ্গে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ করে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৬১ লাখ ও ৩০ লাখ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
নতুন অর্থ বছরে প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার পাশাপাশি ভাতাভোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করা হয়েছে।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ফার্মার্স কার্ড এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী ভাতার কথাও বলা হয়েছে বাজেটে।

ভাতার টাকায় কতটা চলে
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষ এবং ৬২ বছর বা তার বেশি বয়সী কোনো নারীর বার্ষিক আয় যদি ৪৫ হাজার টাকার কম হয়, তাহলে তিনি বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করতে পারেন। দাকোপ উপজেলার চুনকুড়ি গ্রামের গাজী সরদার এবং তার স্ত্রী সখিনা বিবিও বয়স্ক ভাতা পান।
গাজী সরদার একসময় ইট ভেঙে জীবন চালাতেন, এখন তার শরীর এখন আর চলে না। বয়স পৌঁছেছে একশর কাছাকাছি; কানে ঠিকমত শুনতে পান না, চোখেও ঝাপসা দেখেন।
গাজী সরদার স্মৃতি হাতড়ে বলার চেষ্টা করেন, কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় কত খাটাখাটনি করেছেন, চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। শেষ ক’বছর স্ত্রী সখিনা বিবিকে সঙ্গে নিয়ে এলাকার খাল-বিল থেকে শাক-পাতা কুড়িয়ে বাজারে বেচে দিনাতিপাত করেছেন! এখন সেই সক্ষমতাও নেই।
জীবনসায়াহ্নে এসে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানান রোগ, কোনোমতে স্থানীয় ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কিনে খেতেও দুবার ভাবতে হয়।
রোজকার খাবার জোগাতেই ‘হিমশিম’ খাওয়া গাজী সরদার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাঁপা গলায় বলেন, “আর চলে না।”
বয়স্ক ভাতার টাকায় সংসার চলে কি না জানতে চাইলে তার স্ত্রী সখিনা বিবির এক কথায় উত্তর, “জিনিসির যা দাম, দুই কেজি চাইল কিনলিই ১০০ টাআ লাগে।”
কাজেই সরদার-সখিনা দম্পতির মাস চলতে এখন তাকিয়ে থাকতে হয় মেয়েদের দেওয়া অনির্ধারিত সহায়তার দিকে। কখনো উপায় না পেলে সখিনা বিবি নিজেই ছোটেন স্থানীয় বাজারে শাক বিক্রি করতে। কিন্তু অসুস্থ স্বামীকে একলা ঘরে রেখে শাক কুড়াতে যাওয়াও এক বিড়ম্বনা।
সখিনার ভাষ্য, “টাআ পাওয়ার পরে বাজার-টাজার করি। করার পরে টাআ পয়সা বেশি একটা থায়ে না। শাকপাতা তুলি তাতে কিছু অয়, ওইরকম করে কোনরকম চলতিছি। কোনরমে পরানডা বাঁচানে। কাপড়চোপড় কিনলি তো মোটেই অতো না।”
এলার্জি ও চোখের অসুখে ভোগা গাজী সরদারের নিয়মিত ওষুধ লাগে। সে বিষয়ে বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ থেমে তার স্ত্রী বলেন, “দেহা গেছে ৫০০ টাআর ওষুধ লাগল, ২০০ টাআর নিয়ে আসলাম। টাআর অভাবে বাকিটা আনা অলো না। ওষুধডা খাওয়া হয়ে গেলি পরে আবার টাআ গুছাইতি পারলি নিয়ে আইলাম।”
দাকোপ উপজেলার এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই নিন্মবিত্ত। তাই ঈদের সময় জাকাতও তেমন মেলে না। ভাতা পান বলে অন্য সরকারি সহায়তাও আর জোটে না কপালে।
তাদের চাওয়াও বেশি না, সরকারের দেওয়া সহায়তাটা ‘বেঁচে থাকার মত’ হলেই হয়।
সখিনা বিবি বলেন, “টাআটা আরেট্টু বেশি হলি চলতো, মেলা লাগবেন না।”

কত বেড়েছে বরাদ্দ
দেশের ৬১ লাখ প্রবীণ বর্তমানে ‘বয়স্ক ভাতার’ আওতায় রয়েছেন। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া এই বয়স্ক ভাতা দীর্ঘ ২৯ বছরে বেড়ে বর্তমানে ৬৫০ টাকায় ঠেকেছে, যা আসন্ন বাজেটে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাড়ে ১২ কোটি টাকায় শুরু করা এ কর্মসূচির বাজেট এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকায়।
তবে খোদ বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে যে পরিমাণ ভাতা দেওয়া হয়, তা ভাতাগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ‘যথেষ্ট নয়’।
২০২২ সালে পরিচালিত ‘সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল্যায়ন’ শীর্ষক ওই গবেষণায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ‘প্রধান ত্রুটি’ হিসেবে সাহায্যের নগণ্য পরিমাণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফেনী, কুমিল্লা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলায় পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩.৬ শতাংশ ভাতাগ্রহীতাই মনে করেন এর পরিমাণ কম।
যখন গবেষণাটি করা হয়, তখন বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ছিল ৫০০ টাকা। বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত ৯৬.৪ শতাংশই বলেছিলেন এই টাকা তাদের জন্য ‘যথেষ্ট নয়’। ৯৬.৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিলেন।
গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম মনে করেন, ব্যক্তিপর্যায়ে দেওয়া ভাতার পরিমাণ এবং মোট যে বরাদ্দ–কোনটিই ‘যথেষ্ট নয়’।
তারপরও উপকারভোগীর সঙ্গে স্বল্প পরিমাণে হলেও ভাতা বাড়ানোর বিষয়টিকে রাষ্ট্রের ‘সক্ষমতা’ বাজার লক্ষণ হিসেবে দেখতে চান এই গবেষক।
তার ভাষ্য, “আমাদের দেশের লক্ষ্য হওয়া দরকার ক্রমান্বয়ে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দিকে যাওয়া, যেখানে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের নিরাপত্তা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।”
বয়স্ক ভাতা যেভাবে বেড়েছে
|
অর্থবছর |
উপকারভোগীর সংখ্যা (হাজার জন) |
জনপ্রতি মাসিক ভাতার হার (টাকা) |
বার্ষিক বাজেট (কোটি টাকা) |
|
১৯৯৭-৯৮ |
৪০৩.১১ |
১০০ |
১২.৫০ |
|
১৯৯৮-৯৯ |
৪০৩.১১ |
১০০ |
৪৮.৫০ |
|
১৯৯৯-০০ |
৪১৩.১৯ |
১০০ |
৫০.০০ |
|
২০০০-০১ |
৪১৫.১৭ |
১০০ |
৫০.০০ |
|
২০০১-০২ |
৪১৫.১৭ |
১০০ |
৪৯.৯২ |
|
২০০২-০৩ |
৫০০.৩৯ |
১২৫ |
৭৫০.৫৮ |
|
২০০৩-০৪ |
৯৯৯.৯৯ |
১৫০ |
১৭৯.৯৯ |
|
২০০৪-০৫ |
১৩১৫.০০ |
১৬৫ |
২৬০.৩৭ |
|
২০০৫-০৬ |
১৫০০.০০ |
১৮০ |
৩২৪.০০ |
|
২০০৬-০৭ |
১৬০০.০০ |
২০০ |
৩৮৪.০০ |
|
২০০৭-০৮ |
১৭০০.০০ |
২২০ |
৪৪৮.৮০ |
|
২০০৮-০৯ |
২০০০.০০ |
২৫০ |
৬০০.০০ |
|
২০০৯-১০ |
২২৫০.০০ |
৩০০ |
৮১০.০০ |
|
২০১০-১১ |
২৪৭৫.০০ |
৩০০ |
৮৯১.০০ |
|
২০১১-১২ |
২৪৭৫.০০ |
৩০০ |
৮৯১.০০ |
|
২০১২-১৩ |
২৪৭৫.০০ |
৩০০ |
৮৯১.০০ |
|
২০১৩-১৪ |
২৭২২.৫০ |
৩০০ |
৯৮০.১০ |
|
২০১৪-১৫ |
২৭২২.৫০ |
৪০০ |
১৩০৬.৮০ |
|
২০১৫-১৬ |
৩০০০.০০ |
৪০০ |
১৪৪০.০০ |
|
২০১৬-১৭ |
৩১৫০.০০ |
৫০০ |
১৮৯০.০০ |
|
২০১৭-১৮ |
৩৫০০.০০ |
৫০০ |
২১০০.০০ |
|
২০১৮-১৯ |
৪০০০.০০ |
৫০০ |
২৪০০.০০ |
|
২০১৯-২০ |
৪৪০০.০০ |
৫০০ |
২৬৪০.০০ |
|
২০২০-২১ |
৪৯০০.০০ |
৫০০ |
২৯৪০.০০ |
|
২০২১-২২ |
৫৭০১.০০ |
৫০০ |
৩৪৪৪.৫৪ |
|
২০২২-২৩ |
৫৭০১.০০ |
৫০০ |
৩৪৪৪.৫৪ |
|
২০২৩-২৪ |
৫৮০১.০০ |
৬০০ |
৪২০৫.৯৬ |
|
২০২৪-২৫ |
৬০০০.০১ |
৬০০ |
৪৩৫০.৯৭ |
|
২০২৫-২৬ |
৬১০০.০০ |
৬৫০ |
৪৭৯১.৩১ |
কোন যুক্তিতে এই বরাদ্দ
ভাতার অংকের যৌক্তিকতার প্রসঙ্গ তুলতেই ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নেতৃত্ব দেওয়া গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, “সরকারের সামর্থ্য কতটুকু?”
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, “এমন পরিমাণ ভাতা দেওয়া যাবে না, যেটা সরকারের সামর্থ্যকে অতিক্রম করে। আবার এরকমও দেওয়া যাবে না, যেটার ওপর মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। পরে আর কাজকর্ম করবে না, ভাতার আশায় বসে থাকবে।
“সরকার তো চাইবেই যে, দেশের মানুষের মধ্যে একটা কর্মস্পৃহা যেন থাকে। তারা যেন ইনকাম জেনারেটিং অ্যাক্টিভিটিসের মধ্যে ইনভলভড হয়।”
কিন্তু যারা বয়স্ক, তাদের কাছে তো সেই কর্মক্ষমতা আশা করা উচিত না।
এ প্রশ্ন তুলতেই নূরুল কবির পিতামাতার ভরণপোষণ আইনের প্রসঙ্গ টানলেন, যেখানে পিতামাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানদের ওপর বর্তায়।
আর কারো যদি সন্তান না থাকে বা কর্মক্ষম না হয়ে থাকে বা সম্পত্তি না থাকে, সেই চিন্তা থেকেই সরকার ‘বৃদ্ধ নিবাস’ বা ‘প্রবীণ নিবাস’ করেছে বলে ভাষ্য এই সাবেক কর্মকর্তার।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত পরিচালকও বলেন, বাংলাদেশ সরকার শতভাগ সহায়তা দিতে পারবে না।
“এই দেশ আমেরিকা-কানাডা না। সবমিলিয়ে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বিভিন্ন ভাতার আওতায় আনতে সরকারের কত খরচ হচ্ছে, সেটাও তো বিবেচনা করা দরকার।”
তবে অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, যে দৃষ্টিভঙ্গি অথবা যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন দেশ পিছিয়ে পড়া মানুষদের এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু করেছিল, বাংলাদেশের পরিচালিত নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই।
“আমাদের এখানে এটা শুরুই হয়েছে রাজনৈতিক বাহবা নেওয়ার জন্য। সকল দলের ক্ষেত্রে আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি, সকল দলই একই কাজ করেছে।”
এর ফলে সমাজে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী এগিয়ে যেতে পারছে না বলে মনে করেন তিনি।
“আমাদের এখানে ঢালাওভাবে কিছু অর্থ দেওয়া হয়, সেই অর্থ দিয়ে বাজার মূল্য বা তার চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি পারবে না, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয় না।”
তার ওপর এই অর্থ বা সুবিধা পাওয়ার জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়, একজন প্রান্তিক মানুষের জন্য তা কতটা সহজ–সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তালিকাভুক্তিতে ‘নয়-ছয়’
বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের গবেষণায় ৫৫.৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ভাতার জন্য তালিকাভুক্ত হতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। আর ৫৯.২৮ শতাংশ ভাতাগ্রহীতা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তি দূর করার অনুরোধ করেছেন।
২৭.১৪ শতাংশ বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়ায় ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি রয়েছে’ আর রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলেছেন ২৩.১ শতাংশ ভাতাগ্রহীতা।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে ২০১৯ সালে বয়স্ক ভাতার বিষয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি দেশের দরিদ্র বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের ‘সবচেয়ে বড়’ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি। কিন্তু ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘অযোগ্য বা সচ্ছল’ ব্যক্তিরাও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।
গত ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে খোদ সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, উপকারভোগীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ‘স্বজনপ্রীতির’ তথ্য তারা পেয়েছেন।
৬ মে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনে তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী নির্বাচনে বিগত সময়ে হওয়া ‘অনিয়ম যাচাই-বাছাই করার জন্য’ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) এক গবেষণায় দেখা গেছে, লক্ষ্য নির্ধারণে ত্রুটির কারণে সম্পদের ভুল বণ্টন ও সেবার নিম্নমান প্রায়ই এসব কর্মসূচির কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সবশেষ ২০২২ সালের বিবিএসের গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ বিশ্লেষণ করে গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্তত একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৬২.৮ শতাংশই দরিদ্র বা ঝুঁকিপ্রবণ নয়। মাঝারি দরিদ্রদের মধ্যে মাত্র ১৩.৫ শতাংশ সুবিধা পাচ্ছেন আর চরম দরিদ্রদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬.৬ শতাংশ।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার দক্ষিণ সূচিপাড়া ইউনিয়নের রাগৈ গ্রামের বানিন্দা আকিমা বেগম থাকেন একটি দোচালা ঘরে। ৬৫ বছর বয়সী আকিমার স্বামী থাকলেও তিনি কর্মহীন। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। সংসারে নেই আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "কত মানুষ বয়স্ক ভাতা পায়, আমরা কিছুই পাই না। টিসিবির একটা কার্ড ছিল আগে। কিছু চাইল পাইতাম। এখন অনলাইন সিস্টেম হওয়ার পরে আর কিছুই পাই না। আমাদের দেখারও কেউ নেই।”
অথচ প্রতিবেশী আবদুল আজিজ স্থানীয় বাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর পাকা বাড়ির মালিক হয়েও দুটি টিসিবি কার্ডের সুবিধাভোগী। তার বোন পুতুলকে বিয়ে দিয়েছেন রামগঞ্জে। বোনের নামেও একটি কার্ড করিয়ে রেখেছেন। সময়মত স্বামীর বাড়ি থেকে ওই গ্রামে এসে কার্ডের মাধ্যমে পণ্য তুলে চলে যান পুতুল।
এ বিষয়ে জানতে আবদুল আজিজের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, “এই কার্ড হচ্ছে আওয়ামী লীগের আমলের। ইউনিয়ন পরিষদে কার্ড বরাদ্দ হইছে ধরেন ৩০০। তার মধ্যে দলীয়ভাবে দিয়ে দিছে অর্ধেক। দলীয় যারা আছে, তাদের নেতাকর্মীরা পাইছে। আর আমরা যে অর্ধেক পাইছি, এই অর্ধেক দিয়া ধরেন, আমার এলাকায় জনগণ আছে প্রায় ১০ হাজার, ভোটার আছে ধরেন ৩৬-৩৭ শ।
“তো ১০০-১৫০ কার্ড দিয়ে তো আমার পুরা ওয়ার্ডের চাহিদা মিটানো কোনো প্রকারে সম্ভব হয় না। আমার এখানে বাড়ি আছে ষাইটের কাছাকাছি। আমি তখন মোটামুটি প্রত্যেক বাড়িতে সমন্বয় করে দিতে যাই, তখন দেখা যায়, দরিদ্র ফ্যামিলি অনেকে বাকি রয়ে গেছে। দেওয়া সম্ভব হয় না আরকি।”
রাজনৈতিকভাবে যেসব কার্ড আগে দেওয়া হয়েছে, সেসব সিদ্ধান্ত স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে আসত বলে বিল্লালের ভাষ্য।
এখন সরকার বদলেছে, যারা যোগ্য নন বা সামর্থ্যবান, তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনা পেলে আবার যাচাই-বাছাই করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানালেন এই ইউপি সদস্য।
|
কভারেজ (জন) |
বাজেট (টাকা) |
সেবার বিবরণ |
|||
|
১৯৯৭-৯৮ |
২০২৫-২৬ |
১৯৯৭-৯৮ |
২০২৫-২৬ |
১৯৯৭-৯৮ |
২০২৫-২৬ |
|
৪.০৩ লাখ |
৬১ লাখ |
১২.৫০ কোটি |
৪৭৯১.৩১ কোটি |
মাসে ১০০ টাকা |
মাসে ৬৫০ টাকা |
বরাদ্দ আদৌ বেড়েছে?
সবশেষ প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক পর্যবেক্ষণে বলেছে, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আকার বাড়লেও এর গুণগত মান এবং প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
গত বছর প্রতিষ্ঠানটি তাদের এক প্রতিবেদনে বলে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেটটি মূলত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ‘কৃত্রিমভাবে বড় করে’ দেখানো হয়।
এবারো সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছে, তার প্রায় ৪৩ শতাংশ চলে যাচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকি মেটাতে।
এবার সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে; যার মধ্যে পেনশনে ৩৫ হাজার কোটি ও কৃষি ভর্তুকিকে ২৭ হাজার কোটিসহ মোট মোট ৬২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
সিপিডির ভাষ্য, পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা সরাসরি দরিদ্রদের জন্য নয়; তবুও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাজেটের সিংহভাগ দখল করে আছে।
সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৫.৩৯ শতাংশ এবং জিডিপির ২.১১ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দাঁড়ায় মোট বাজেটের ১১.৬ শতাংশ এবং জিডিপির ১.৬০ শতাংশ।
অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ।
সিপিডির এবারের পর্যবেক্ষণে মোট ৯০টি কর্মসূচির মধ্যে ৪৮টিকে 'দরিদ্র-বান্ধব' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৬ হাজার ২২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের ৩৮.৬৯ শতাংশ।
মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১৬ মাসের সর্বোচ্চ (৯.৪২ শতাংশ) । সিপিডি গত বছরই বলেছিল, এই ‘আকাশচুম্বী দামের’ বাজারে সামান্য মাসিক ভাতা দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের 'খানা আয় ও ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যের স্তর মূলত দুটি। বর্তমানে মাসিক মাথাপিছু খরচ বা আয় ৩ হাজার ৮৩২ টাকা বা তার কম হলে তাকে সাধারণ দরিদ্র বা উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে ধরা হয়। আর মাথাপিছু খরচ বা আয় গড়ে ২,৭৫০ টাকা বা তার কম হলে তাকে অতি দরিদ্র বা নিম্ন দারিদ্র্যসীমার নিচে ধরা হয়।
বিবিএসের হিসাব বলছে, দেশে গত এক যুগে দারিদ্র্য ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। এ সময় অতিদরিদ্র সাড়ে ১৭ শতাংশ থেকে কমে সাড়ে ৫ শতাংশে নেমেছে। তার পরও দেশের তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমায় এবং ৯৩ লাখ মানুষ অতিদরিদ্রের কাতারে।
এর বাইরে দেশের ১৫ শতাংশের বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। অর্থাৎ আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হলে তারা যে কোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন।

বরাদ্দের অংকে রাজনৈতিক বয়ান
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন কৌশল পুনর্গঠন, আর্থিক ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর খুঁজে বের করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য ১২ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে।
সেই টাস্কফোর্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তা খাতে বাজেটে বরাদ্দ করা টাকার ৫৩ শতাংশই ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।
সেখানে সামাজিক নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত খাতগুলোর মধ্যে অবসরভোগী সরকারি কর্মচারীর পেনশন, কৃষি খাতে ভর্তুকি ও সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধের মত বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের একমাত্র বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা ১৪০টি থেকে কমিয়ে ৯৫টিতে নামিয়ে এনেছিল। সেবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদের বিষয়টি বাদ দেওয়া হলেও বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকির জন্য রাখা হয়।
ওই টাস্কফোর্সের প্রধান কে এ এস মুরশিদ মনে করেন, “কোনো সরকার অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে দেখাতে চায় যে, আমরা অমুক অমুকের জন্য কাজ করছি বা অমুক গোষ্ঠীর জন্য কাজ করছি বা অতি দরিদ্রের জন্য আমরা বিনিয়োগ করছি।
“এতে রেজাল্ট যেটা হয়, খুব ঢালাওভাবে আমরা অনেক কিছুকেই সোশাল প্রটেকশন বলি, যেটা আসলে তা নয়। এটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয় যে বিশাল একটা অংক বা একটা বিশাল পারসেন্টেজ আমরা সোশাল প্রটেকশনে এলোকেশন দিচ্ছি।”
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার হার পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় কার্যকরী কমিটি’ গঠন করেছিল সরকার। ওই কমিটি বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারী এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাসিক ভাতার হার চলতি বছরেই আরো ৫০ টাকা করে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
কমিটির পর্যালোচনা ছিল, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৬ শতাংশ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে ভাতার হার বাড়ানো প্রয়োজন।
ওই কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, একটি ঋণদাতা সংস্থা বিষয়টি পর্যালোচনা করতে বলেছিল, সেজন্যই ওই কমিটি করা হয়েছিল।
তাদের পর্যালোচনার আলোকে ভাতা যথেষ্ট কি না জানতে চাইলে সরকারের ওই কর্মকর্তা বলেন, “সত্যিকার অর্থে এই টাকাতে কী হয়? এটা জাস্ট ওয়ান কাইন্ড অফ টোকেন মানি আর কি!”
সময়ের সাথে সাথে এটা অবশ্যই বাড়ানো উচিত, তবে সরকারের আর্থিক সামর্থ্য কেমন সেটিও দেখার কথা বলেন তিনি।
প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না বাড়ার পেছনে পূর্ববর্তী কোনো অব্যবস্থাপনা দায়ী ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, এত কিছু আমরা করি নাই, ওইটা একটা জাস্ট রুটিনের মত কাজ ছিল।”
উত্তরণ কোন পথে
র্যাপিডের পর্যবেক্ষণ বলছে, অর্থবছরের বাজেটে শুধু বরাদ্দের অংক না বাড়িয়ে লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত।
কর্মসূচি একীভূতকরণের সুপারিশ রেখে সেখানে শতাধিক কর্মসূচি কমিয়ে ১৫-২০টি বড় ও জীবনচক্রভিত্তিক কর্মসূচিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে সেখানে।
অর্থনীতির গবেষক কে এ এস মুরশিদ বলেন, “আমাদেরকে বলতে হবে যে আমরা কোন কোন গ্রুপকে কীভাবে কতটুকু সাহায্য করব। যাদের বয়স্ক ভাতা দেব, কিন্তু খুব নগণ্য একটা অ্যামাউন্ট দিলাম…আমরা দিচ্ছি হয়ত অনেককে, কিন্তু এত নগণ্য যে ওটা দিয়ে আসলে তেমন কোনো ইমপ্যাক্ট হয় না।”
ভাতাগুলোকে ‘ইমপ্যাক্টফুল’ করতে স্পষ্ট একটি লক্ষ্য ধরে অগ্রসর হওয়ার এবং যে গ্রুপকে দেওয়া হবে, তাদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি যে প্রক্রিয়ায় তাদের সহায়তা করা হবে, তা নির্ধারণের কথা বলেন তিনি।
“এমনিতেই আমাদের রিসোর্স কম এবং যেটা আমরা বিনিয়োগ করছি এটা টার্গেট গ্রুপের কাছে যাচ্ছে না। লিকেজ অনেক বেশি, এটা তো মৌলিক সমস্যা বহুকাল থেকে। এটা তো আর কন্টিনিউ করতে দেওয়া উচিত না। আমাদের এখন এই জায়গাটাই সবচেয়ে বেশি টাইট করে ধরা উচিত।”
কী করছে সরকার
সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা এ ধরনের ত্রুটি এড়াতে তিন মাস পর পর ‘লাইভ ভেরিফিকেশনের’ ব্যবস্থা রেখেছেন।
এরপরেও কিছু ত্রুটি থেকে যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “কিছু লোক মারা গেলে খবর পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক প্রভাব যে একটা বিষয়, এটা সবসময়ই থাকে কম-বেশি।”
যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সরকারের তরফে যে কমিটির কথা বলা হয়েছিল, সে বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ওই কমিটি শিগগিরই কাজ শুরু করবে।
দীর্ঘ দিন ধরে অযোগ্য ব্যক্তিদের সুবিধা পেয়ে আসার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তার দাবি, সেটা সংখ্যায় ‘খুবই কম’।
“আমাদের যেটা হয়, প্রতি কোয়ার্টারে আমরা তো পে-রোল তৈরি করি। সে সময় ওই লোকটা আসলেই বৃদ্ধ কি না, আসলেই বিধবা কি না বা তারা আসলেই এক্সিস্ট করেন কি না- এসব শতভাগ যাচাই করে ভাতা দেওয়া হয়।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, “এ ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সজাগ। সেজন্যই দেখছেন ফ্যামিলি কার্ডে কোনো রাজনৈতিক-স্বজনপ্রীতি নাই। এখানে ইউনিভার্সাল টার্গেটিং করা হয়েছে অর্থাৎ একটা নির্ধারিত এলাকার মধ্যে যারা অতি দরিদ্র, দরিদ্র এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত, তারা পাবে। তারা কোন ধর্মের, কোন বর্ণের, কোন রাজনৈতিক বিশ্বাসের, তা এখানে কাজ করছে না।
“অন্যান্য ভাতার বিষয়ে বেশ কিছু অভিযোগ আগে থেকে আছে এবং সেগুলো ইনকয়ারি করা হচ্ছে। আমরা চেক করছি এবং প্রতি মাসেই কিছু কিছু অ্যাড্রেস করা হচ্ছে এবং দেখা যাচ্ছে যে, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো রাজনৈতিকভাবে ম্যানিপুলেট করে আগে কার্ড দেওয়া হয়েছে।”
তার ভাষ্য, “যারা পেনশন পাওয়ার তারা পাচ্ছে, কিন্তু সামাজিক সুরক্ষার আওতায় যে কর্মসূচি চলছে, তারাও তা পাচ্ছে। এখানে বাজেটে বরাদ্দ বেশি বা কম দেখানোর কোনো লক্ষ্য নেই।”