Published : 06 Jul 2026, 01:10 PM
তিন মাস পর গত এপ্রিলে সুদ-আসল পরিশোধের খরচের চেয়ে বেশি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে পেরেছে সরকার।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর রোববার সঞ্চয়পত্র বিক্রির সর্বশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিলে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা অর্থবছরের দশ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
অর্থাৎ, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের চেয়ে এপ্রিলে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা বেশি।
অথচ এর আগে জানুয়ারি থেকে মার্চ–তিন মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক বা আগের সঞ্চয়পত্রের জন্য পরিশোধ করা সুদ-আসলের চেয়ে কম।
জানুয়ারিতে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। মার্চে ছিল ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, এই তিন মাসে সঞ্চয়পত্রে যত টাকার নতুন বিনিয়োগ হয়েছে, তা আগের সঞ্চয়পত্রের জন্য পরিশোধ করা সুদ-আসলের চেয়ে ৫ হাজার ১৫১ কোটি টাকা কম ছিল।
তার মানে হল, ওই তিন মাসে এই পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অথবা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের পরিশোধ করেছে সরকার।
এর আগে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ধনাত্মক ছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে। ওই মাসে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল পরিশোধ করা সুদ-আসলের চেয়ে ৩৮৫ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু তার আগের মাস নভেম্বরে ছিল ২৯৩ কোটি টাকা কম।
তার আগের চার মাসই অবশ্য নিট বিক্রি ধনাত্মক ছিল। বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, অগাস্টে ২৭৯ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ৩৭৩ কোটি টাকা এবং অক্টোবরে ৪২৪ কোটি টাকা বেশি ছিল নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ।
অর্থবছরের ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) হিসাবে অবশ্য এখনও নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ পরিশোধ করা সুদ আসলের চেয়ে পিছিয়ে আছে। বাকি দুই মাসের (মে ও জুন) তথ্য পাওয়া গেলে পুরো অর্থবছরের চিত্র স্পষ্ট হবে।
আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়।
এপ্রিলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ার কারণ জানতে চাইলে অর্থনীতির গবেষক, বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশের ব্যাংকিং খাতে একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দিয়েছে। মানুষ আর ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। সে কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বাড়তি খরচ মিটিয়ে যার কাছে যতটুকু সঞ্চয় থাকছে, তা দিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্র কিনছে।
“সঞ্চয়পত্রে কোনো ঝুঁকি নেই; টাকা মার যাওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। জরুরি প্রয়োজনে যখন খুশি তখন ভাঙানো যায়। মুনাফার হার ভালো। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুকছে মানুষ। সে কারণেই বিক্রি বাড়ছে।”
প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে জাতীয় বাজেট পাস করে সরকার। এই ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে মেটানো হয়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে আছে ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র খাত।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার। বিএনপি সরকার সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে।
সবশেষ ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, এ খাত থেকে নতুন যা ঋণ সরকার সরকার; তারচেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি শোধ করতে হয়েছে সুদ-আসল বাবদ। শুধু এ অর্থবছর নয়, আগের তিন অর্থবছরও একই চিত্র দেখা গেছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। ফলে সঞ্চয় করতে পারছে না। অন্যদিকে সুদের হার কমায় এবং নানা কড়াকড়ির কারণেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ গত কয়েক বছরে কমে গেছে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসভিত্তিক) মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। আগের মাস ছিল ৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ।
এদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি সুবিধার কারণে অনেকে এখন সেদিকেও ঝুঁকছেন। এটাও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কয়েক বছর আগের তুলনায় কমার একটি কারণ হতে পারে মনে মনে করেন তিনি।
বর্তমানে মেয়াদ ও বিনিয়োগের পরিমাণ বিবেচনায় সঞ্চয়পত্র থেকে একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ সুদ পেয়ে থাকেন ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত।
মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা মাথায় রেখে সঞ্চয়পত্রের সুদহার আগামী ছয় মাসের জন্য (জুলাই-ডিসেম্বর) অপরিবর্তিত রেখেছে বিএনপি সরকার।