ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশ: আগের রাতেই মাঠ পরিপূর্ণ

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শুক্রবার গণসমাবেশস্থলে পৌঁছেছেন।

ফরিদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Nov 2022, 07:36 PM
Updated : 11 Nov 2022, 07:36 PM


ফরিদপুরে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ স্থল কোমরপুরের আব্দুল আজিজ ইন্সটিটিউট মাঠ আগের রাতেই নেতাকর্মীদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। 

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শুক্রবার রাতে গণসমাবেশস্থলে এসে পৌঁছেছেন। 

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমরও উপস্থিত হয়েছেন। মাঠে নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
শনিবার দুপুরে শহরের উপকণ্ঠে কোমরপুর আব্দুল আজিজ ইন্সটিটিউটশন মাঠে বিএনপির ষষ্ঠ বিভাগীয় গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। 

এর আগে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর ও বরিশালে পাঁচটি গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেব সমাবেশেও নানাভাবে বাধার মুখে পড়েছেন সমাবেশমুখী নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। পরিবহন ধর্মঘট ছাড়াও নেতাকর্মীদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে, বিভাগীয় এই গণসমাবেশের একদিন আগে থেকে ফরিদপুরে শুরু হয়েছে বাস ও মিনিবাস ধর্মঘট। এতে ফরিদপুরের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। 

বিএনপি নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন, তাদের সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে বাস-নিবাস ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। গণসমাবেশের আগে তাদের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। 

শুক্রবার বিকালে কোমরপুরের জনসভাস্থলে দেখো গেছে, সমাবেশে আগতদের ভিড়ে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সমাবেশস্থল। বাস ও মিনিবাস ধর্মঘট উপক্ষো করে বিভিন্ন উপায়ে সেখানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পৌঁছাচ্ছেন। তারা সেখানে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে প্রদক্ষিণ করছেন সমাবেশের মাঠ ছাড়িয়ে আশেপাশের এলাকা। এতে সেখানে এক ভিন্ন আমেজের সৃষ্টি হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার রাত থেকেই কয়েক হাজার নেতাকর্মী মাঠে অবস্থান নেন। সারারাত তাদের অনেকে খোলা জায়গায় অবস্থান করেন। 

শুক্রবার পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা আসতে থাকেন। দুপুরের পর থেকেই বাড়তে থাকে আগতদের ভিড়। সন্ধ্যা নাগাদ পূর্ণ হয়ে ওঠে মাঠ।

শুক্রবার দুপুরে সমবেত নেতাকর্মীরা কোমরপুর আব্দুল আজিজ ইন্সটিটিউটশন জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেছেন। গণসমাবেশস্থল সংলগ্ন মসজিদে মুসুল্লিদের ভিড় মসজিদ উপচে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। 

নামাজে জামাতের ইমামতি করেন কোমরপুর জামে মসজিদের ঈমাম হাফেজ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

বিএনপি নেতৃবৃন্দ বলছেন, তাদের এই গণসমাবেশে নির্ধারিত সমাবেশস্থল ছাড়িয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি শহরের রাজবাড়ি রাস্তার মোড় ছাড়িয়ে দুই কিলোমিটার দুরে শহর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। শুক্রবারের মধ্যেই গণসমাবেশের মূল মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বাইরে গণসমাবেশের মাইক লাগানো হচ্ছে প্রায় এককিলোমিটার জুড়ে। 

সমাবেশের মাঠ ছাড়িয়ে ঢাকা-ফরিদপুর মহাসড়ক হয়ে শহর পর্যন্ত জনসমাগম ঘটবে বলে জানানো হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। 

শুক্রবার সন্ধ্যায় সমাবেশস্থলে দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করেন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের শিল্পীরা। 

এদিকে, মহাসড়কে থ্রি হুইলার বন্ধের দাবিতে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত ৩৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছে ফরিদপুরের মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। এর পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে বিআরটিসি বাস চলাচলও। 

ফরিদপুর বিআরটিসি বাস পরিবহনের সহকারী পরিচালক মামুন হাসান বলেন, “শুক্র ও শনিবার ফরিদপুর থেকে সকল পথে বিআরটিসি বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। বাস মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছি আমরা।” 

৩৮ ঘণ্টার এই বাস ও মিনিবাস ধর্মঘটের ফলে সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। 

ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ঈসার অভিযোগ, তাদের গণসমাবেশের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ নগরকান্দা ও বোয়ালমারীসহ বিভিন্নস্থান থেকে ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে। আওয়ামী লীগ গণসমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পাল্টা জমায়েত করে জনমনে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা চালিয়েছে। যুবলীগ ও ছাত্রলীগ শহরে মিছিল বের করেছে। এর বাইরে গণসমাবেশের শুরু থেকেই সমাবেশের জন্য আবেদন করা নির্ধারিত স্থানের বদলে তাদের শহরের বাইরে গণসমাবেশ ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এসব সত্বেও নেতাকর্মীরা বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো ছুটে আসছেন।

শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী সমাবেশস্থলে পৌঁছেছেন বলে দলের নেতারা জানিয়েছেন। 

বিএনপির ফরিদপুর বিভাগীয় গণসমাবেশের সমন্বয়কারী কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, বেসরকারি বাসের পাশাপাশি দুই দিন বিআরটিসি বাস বন্ধ করার কারণ বিএনপির গণসমাবেশকে বাধা দেওয়া। কিন্তু এতে বিএনপির গণসমাবেশে কোনো সমস্যা হবে না। কেননা বাধা পেলেই মানুষ বেশি বের হয় বাঁধ ভাঙার জন্য। তবে সমস্যা ও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে যাত্রী সাধারণকে। 

সমাবেশের প্রেস উপ কমিটির আহবায়ক এ বি সিদ্দিকী মিতুল বলেন, গণসমাবেশে হলুদ ক্যাপ মাথায় সামনের সারিতে থাকবেন কৃষকদলের কর্মীরা। ফরিদপুরের এই গণসমাবেশ স্মরণকালের ঐতিহাসিক সমাবেশ হিসেবে পরিগণিত হবে।  

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, গোপালগঞ্জ থেকে দুই হাজার নেতা-কর্মী এসেছেন। ওই যে সামিয়ানা (মঞ্চের পাশে) সব গোপালগঞ্জের। এরকম সব জেলা থেকেই নেতা-কর্মী আসছেন।

সমাবেশের মাঠে উপস্থিত যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান ভুইয়া পিংকু বলেন, ফরিদপুর কারো পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। নেতা-কর্মীদের আটকাতে পারবে না কোনো বাধাই। 

পিংকু জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ৭/৮ হাজার নেতা-কর্মীর মাঝে রাতের খবার বিতরণ করা হয়েছে। জেলার নেতারা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এসব ব্যবস্থা করছেন। গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকারের পক্ষ থেকে বাধা বিঘ্ন সত্বেও নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশস্থলে আসছেন। 

গণসমাবেশের শৃঙ্খলা উপকমিটির প্রধান ও শহর বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক এমটি আক্তার টুটুল জানান, গণসমাবেশ স্থানের সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে কাজ করছে তাদের কর্মীরা।

বিএনপির এই ষষ্ঠ বিভাগীয় গণসমাবেশের আগের দিনে ফরিদপুরে শুক্রবার বিকালে গণমিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হকের নেতৃত্বে শহরের আলিপুরে শেখ রাসেল ক্রীড়া কমপ্লেক্স চত্বর থেকে শুরু হয়ে মুজিব সড়ক হয়ে ব্রহ্মসমাজ সড়ক পর্যন্ত পৌছে মিছিলটি। 

বিভাগীয় এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ফরিদপুরে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মিছিলে মুখরিত আব্দুল আজিজ ইন্সটিটিউট মাঠ

দুই দিন আগে থেকেই নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেছে সমাবেশস্থলে। নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। শুক্রবার বিকালে মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয়ে উঠেছে ইন্সটিটিউট মাঠ।

ইতিমধ্যেই সমাবেশস্থলের মঞ্চ ও আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ব্যানার ও ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে সমাবেশের আশেপাশের স্থান। শুক্রবার বিকালে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে প্রবেশ করেন তারা।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা থেকে আসা বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম বলেন, “বিকালে আমরা ৫০-৬০জন এসেছি। নসিমনে করে গ্রামের মধ্যে রাস্তা দিয়ে আসতে হয়েছে। আগামীকাল সমাবেশ তাই আজকে চলে এসেছি।”

শরীয়তপুর জেলা বিএনপি নেতা আব্দুল কাশেম বলেন, “গত বুধবার রাতে আমরা তিনটি বাস নিয়ে এসেছি। ধর্মঘটের খবর জানতে পেরে আমরা আগেই চলে এসেছি। রাতে থেকেছি মাঠে, খেয়েছি এখানেই। সমাবেশ শেষ হলে বাড়ি যাব।”

শুক্রবার সকাল থেকেই গণসমাবেশস্থলে এই সমাবেশের সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাশুকুর রহমান মাসুক, মো. সেলিমুজ্জামান সেলিম, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান ভুঁইয়া পিংকু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ঈসা, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এএফএম কাইয়ুম জঙ্গি, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একেএম কিবরিয়া স্বপন, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আফজাল হোসেন খান পলাশ উপস্থিত রয়েছেন।

আরও পড়ুন:

Also Read: ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশস্থলেই চলছে থাকা-খাওয়া

Also Read: গোপালগঞ্জ থেকে ফরিদপুর ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের বাস বন্ধ

Also Read: বিএনপির সমাবেশের আগে খুলনায় পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তি

Also Read: বিএনপির সমাবেশ: শরীয়তপুর থেকেও ফরিদপুরের বাস বন্ধ

Also Read: ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশস্থলেই চলছে থাকা-খাওয়া

Also Read: বিএনপির সমাবেশের আগে খুলনায় পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তি

Also Read: গোপালগঞ্জ থেকে ফরিদপুর ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের বাস বন্ধ

Also Read: ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশের আগে বাস ধর্মঘট, ভোগান্তি

Also Read: ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশে তিন দিন আগে সমাগম শুরু

Also Read: রাজবাড়িতে তিন চাকা বন্ধের দাবিতে বাস ধর্মঘট: ভরসা সেই অটোরিকশাই

Also Read: বিএনপির সমাবেশ: মাদারীপুর-ফরিদপুর বাস বন্ধ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক