Published : 22 Jan 2026, 12:42 AM
বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থা, বুঝিয়েসুঝিয়ে সরে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা কিংবা সমাঝোতার পথে হাঁটলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন; যার মধ্যে শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনও রয়েছে।
বিএনপির শরিক এই প্রার্থীরা দলটির ‘বিদ্রোহীদের’ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন। যদিও তাদের কিছু করার নেই বলছেন তারা। কেউ বলছেন, ‘রাজনৈতিক সৌজন্য’ দেখতে চান।
নির্বাচনে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গীদের ১৭টি আসন ছেড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে নয়টি আসনে শরিকরা তাদের দলীয় প্রতীকেই ভোট করছেন।
আর বাকি আটটি আসনে প্রার্থীরা নিজেদের দল ছেড়ে এসে বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করছেন।
নাগরিক ঐক্য, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে আসন ছাড় দেয় বিএনপি।
তথ্য বলছে, যারা নিজেদের প্রতীকে ভোট করছেন; এই নয়জনের মধ্যে ছয়জনকে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হবে।

আর যারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপির সাবেক নেতাদের পাবেন। কারণ, বিদ্রোহী হওয়ার কারণে এরই মধ্যে তাদের প্রায় সবাইকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। এদিন সারাদেশের প্রার্থী তালিকার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট ৭৯টি সংসদীয় আসনে বিএনপির মোট ৯০ ‘বিদ্রোহী’ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করছেন।
বুধবার প্রার্থীদের হাতে প্রতীক বরাদ্দ দেয় নির্বাচন কমিশন। ভোটের লড়াইয়ের মূল পর্ব-প্রচার শুরুর আগেই এদিন রাতে বিএনপি ৫৯ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে; যাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি দলের টিকেটে আগে সংসদ সদস্য হওয়া নেতাও রয়েছে।
এর আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে একই কারণে ১১ জনকে বহিষ্কার করা হয়। পরে দুজন মনোনয়নপত্র তুলে নিলে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছিল দলটি।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোট সামনে রেখে মঙ্গলবার মোট ৩০৫ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৮ আসনে (পাবনা-১ ও ২ ছাড়া) এক হাজার ৯৬৭। পরে আপিলে জিতে এ তালিকায় যোগ হন আরও পাঁচজন।
এর মধ্যে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন ভোটের লড়াইয়ে আছেন; আর সবচেয়ে কম দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পিরোজপুর-১ আসনে।
ভোট যুদ্ধের মূল পর্ব-প্রচার শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার থেকে।
এবারই ব্যতিক্রম
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনপ্রথা চালুর পর কোনো নিবন্ধিত দলের জোট হলে তাদের মনোনীত প্রার্থী জোটের বড় দলের প্রতীকে ভোট করা যেত; জোটের প্রতীকে ভোটের বিষয়টি গত তিন নির্বাচনে বহাল থাকলেও এবার পাল্টে গেছে। জোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হচ্ছে প্রার্থীকে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রতীক নিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এ নতুন সংস্কার আনায় বিএনপি বিধানটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল; জামায়াত ও এনসিপি সংশোধিত বিধানটি বহালের পক্ষে অবস্থান নেন।

বিএনপির তরফে পুরনো বিধানে ফিরে যাওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে ধরনা দিয়েছিল; পরে আইন উপদেষ্টার কাছেও সুপারিশ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাতে সরকারও সায় দেয়নি, সেক্ষেত্রে জোটে করলেও নিজ দলেরই মার্কায় ভোট করতে হচ্ছে।
অতীতে এভাবে নৌকা ও ধানের শীষে জোটভুক্ত দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করে জিতেছেন।
নিজস্ব প্রতীকে ‘বিদ্রোহীর’ মুখোমুখি
বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার (কেটলি) সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম (ধানের শীষ)।
পটুয়াখালীর-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের (ট্রাক) সঙ্গে ভোটের মাঠে দেখা হচ্ছে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনের।
ঢাকা-১২ আসনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে (কোদাল) ছাড় দেননি ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব।
সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুককে (খেজুর গাছ) সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদকে (যিনি ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিত) মোকাবিলা করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমীকে (খেজুর গাছ) মোকাবিলা করতে হবে বিএনপির দুই ‘বিদ্রোহীকে’। তারা হলেন-বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহে আলম।

একইভাবে ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবের (খেজুর গাছ) সঙ্গে ভোটের মাঠে দেখা হবে বিএনপির সাবেক দুই নেতারা। তারা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা এবং জেলা বিএনপির সদস্য এস এন তরুণ দে।
তবে সেদিক থেকে নিরাপদ রয়েছেন-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি (মাথাল), নীলফামারী-১ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী (খেজুর গাছ) এবং ভোলা-১ আসনে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তাদের এখানে বিএনপির কোনো ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নেই।
ধানের শীষ নিয়ে ‘বিদ্রোহীর’ মোকাবিলা
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে তিনি বিএনপিতে এসেছেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরই তাকে ওই আসনে প্রার্থী করা হয়।
ভোটে তাকে বিএনপির ‘বিদ্রোহীকে’ মোকাবিলা করতে হবে। সেখানে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল প্রার্থী হয়েছেন।

তবে ‘বিদ্রোহীর’ ঝামেলা থেকে বেঁচে গেছেন ববি হাজ্জাজ এবং শাহাদাত হোসেন সেলিম।
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন ববি হাজ্জাজ। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন এবং ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন।
একইভাবে নিজের দল বিএলডিপি বিলুপ্ত করে সঙ্গীসাথী নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছেন শাহাদাত হোসেন সেলিম। পেয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক।
অপরদিকে পিরোজপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনিও ‘বিদ্রোহের’ ঝামেলামুক্ত।
নড়াইল-২ আসনে এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলামকে মোকাবিলা করতে হবে।
একইভাবে যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রশীদ আহমাদ (মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাস) বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করছেন। কিন্তু ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়েছেন মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন তফসিলের আগে দল ছেড়ে দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপি তাকে ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী করে। কিন্তু রাশেদকে সেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজকে মোকাবিলা করতে হবে।
একইভাবে এলডিপির মহাসচিবের পদ ছেড়ে পুরনো দল বিএনপিতে ফিরে আসেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ান আহমেদ। দল তাকে কুমিল্লা-৭ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী করেছে। তাকেও চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওনের সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে।
বিএনপি ‘ইগনোর’ করছে: মান্না
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বিএনপির পক্ষ থেকে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মান্নার খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত ঝামেলায় কৌশলগতভাবে বিএনপি সেখানে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলমকেও মনোনয়নপত্র দাখিলের অনুমতি দিয়েছিল।

প্রথমে মান্নার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেলেও পরে তিনি ভোটের অধিকার ফিরে পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মীর শাহে আলম আর তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। বুধবার তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ধানের শীষ প্রতীক সংগ্রহ করেছেন।
ফলে ওই আসনে ছাড় পাচ্ছেন না নাগরিক ঐক্যের সভাপতি। তিনি নিজস্ব প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বিএনপির সমঝোতার ক্ষেত্রে এই আসনটি ‘ব্যাতিক্রম’। কারণ, অন্য কোথাও বিএনপি নেতারা জোটকে ছেড়ে দেওয়া আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হতে পারেননি।
মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ (উত্তরা) আসন থেকে একই প্রতীকে লড়াই করছেন।
স্বভাবতই ‘হতাশ’ মাহমুদুর রহমান মান্না মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার আসনে বিএনপির প্রার্থী রয়ে গেছেন। এখন কোনো সমাধানের সুযোগ নেই। তারা তাদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমাকে ‘ইগনোর’ করেছে।”
অপরদিকে ঘোষণার পরও কেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে শরিককে ছাড় দিলেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলবেন না। যা বলার দল বলবে।
বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটিও ‘বিদ্রোহীর’ বিষয়টি নিয়ে অবগত। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদি আমিন বুধবার বলছিলেন, “প্রত্যাহারের সময় চলে গেছে। এখন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে আলাপ-আলোচনা করা হবে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে আলোচনা করা হবে। তারপরে যদি কেউ প্রার্থী থাকেন, অবশ্যই দল থেকে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘বিদ্রোহীরা’ যা বলছেন
যশোর-৫ আসনে মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল বুধবার দুপুরে বলছিলেন, “আমাকে তো মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ২০ দিন আমি বিএনপির প্রার্থী ছিলাম। হাটে-মাঠে সব জায়গায় আমি বিএনপির ভোট করে বেড়াইছি। দলের নেতাকর্মীরাও মাঠে নেমে গেছে।
“ফলে আমার তো আর পিছিয়ে আসার সুযোগ ছিল না। পরে এখানে একজনকে প্রার্থী করে দিছে। তার তো কোনো যোগ্যতাই নাই দলের পক্ষে প্রার্থী হওয়ার।”
অপরদিকে পটুয়াখালী-৩ আসনে লড়ছেন বিএনপির সাবেক নেতা হাসান মামুন। কেন দলের নির্দেশের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলেন? জবাবে তিনি বলেন, “এই প্রশ্নের তো মীমাংসা আগেই হয়ে গেছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই আমি পদত্যাগ করেছি দল থেকে।”
“এখানে ৪৬ বছর ধরে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য জিততে পারেনি। নেতা-কর্মীদের আবেগ, অনুভূতি এবং তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমি প্রার্থী হয়েছি। হয়তো বিএনপির হাই কমান্ডও এটা জানেন যে, এখানে জনমত জরিপে কার পক্ষে সমর্থন বেশি। তারপরেও তাদের জোটের রাজনীতির সীমাবদ্ধতার কারণে হয়ত আমাকে প্রার্থী করতে পারেনি।”
তিনি বলেন, “সেটা তাদের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু স্থানীয় ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা, পৌরসভা সব জায়গার নেতা-কর্মীদের দাবি আর সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী ইনশাআল্লাহ।”
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মো. শাহ আলম ২০০৮ সালে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে লড়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নন্দিত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীর কাছে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।
শাহ আলমের কাছে দলের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ বলব না। আমি বিশ্বাস করি, যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের জনগণ শুধু মার্কা নয়, ব্যক্তি বিবেচনায়ও আমাকে ভোট দেবেন। আমি তাদের ভোটে জয়যুক্ত হব।”
ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি নিজেকে একজন ‘ক্লিন ইমেজের’ লোক হিসেবে দাবি করি। দেশ ও জনগণের স্বার্থে, বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দীর্ঘদিনের যে দুরবস্থা, জলাবদ্ধতা-আমি নির্বাচিত হলে সেসব সমাধান করবো।”
শাহ আলম ছাড়াও আসনটিতে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে বহিষ্কার হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনও।
এতে আসনটিতে বিএনপির ভোট ভাগ হবে কি-না জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, “আমরাই বিএনপি। আলহামদুলিল্লাহ।”
‘রাজনৈতিক সৌজন্য’ চান সাইফুল
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। এখানে ‘বিদ্রোহী’ হয়েছেন সাবেক বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব। জোটের মধ্যে থেকেও গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার লিমাও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সমঝোতা না হওয়া নিয়ে সাইফুল হক বলছিলেন, “আমি আমার দিক থেকে কোনো পদক্ষেপের কথা ভাবছি না। কিন্তু যারা নির্বাচন করছে বা করবে-আমি এটা নিয়ে তো খানিকটা অস্বস্তিকর অবস্থায় আছি, কিন্তু ঠিক আছে।”
সাইফুল হকের মন্তব্য, “প্রত্যেকে নির্বাচন করবে, আমার দিক থেকে বলার কিছু নাই।”
এত দিনে যখন কারো উপলব্ধি হয়নি, এখন তার দিক থেকে কী আশা করবেন-এমন প্রশ্ন রেখে গণতন্ত্র মঞ্চের এই নেতা বলেন, “তারা যদি সৌজন্য দেখিয়ে বসে পড়েন, এটা নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত হবে।
“রাজনৈতিক সৌজন্য দেখিয়ে তারা যদি আমার সমর্থনে প্রত্যাহার করে নেন, অবশ্যই এটা কাঙ্ক্ষিত হবে। মোস্ট ওয়েলকাম হবে।”
তবে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণসংহতি আন্দোলনের ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সৈকত আরিফ বলেন, “গণসংহতি আন্দোলন ঢাকা-১২ আসনসহ ১৭টি আসনে নির্বাচন করছি। এখানকার মানুষ আমাদের প্রার্থী তাসলিমা আখতারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উচ্ছ্বসিত। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।”
নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়বেন বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব। তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বুধবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাইফুল আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন।”
গণঅধিকার চায় ‘উদ্যোগ’
বিএনপির কাছ থেকে এখনো ‘উদ্যোগের’ প্রত্যাশা করছে গণঅধিকার পরিষদ। দলটির উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ বলেন, “যেহেতু মিত্ররা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন করেছে, দিনরাত সংগ্রাম করেছে, সেদিক থেকে বিএনপির উদ্যোগ নেওয়ার আছে। বৃহৎ ও স্থিতিশীল স্বার্থে বিএনপিকে তাদের দলীয় লোকদের বসানোর ব্যবস্থা করবে বলে বিশ্বাস করি।”
তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, বিএনপির তাদের মিত্রদের আসনগুলোতে থাকা ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।”
এ বিষয়ে গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর ব্যস্ত থাকায় তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে পাঁচটি আসনে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুকের আসনেও বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
এ বিষয়ে জমিয়তের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী বলেন, “আমরা আশা করি, বিএনপি উদ্যোগী হয়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করবে।”
যা বলছে বিএনপি
যুগপৎ শরিকদের আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা- এ বিষয়ে জানতে দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতাকে মোবাইলে ফোন দিলেও তারা ধরেননি।
পরে স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, “আপাতত দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে উদ্যোগ না নিলে শরিক দলের প্রার্থীরা ঝুঁকিতে পড়বেন।”
নিজেও দলের ‘বিদ্রোহীর’ মুখে পড়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তিনি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
দলের ‘বিদ্রোহী’র প্রার্থীদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যাদের অবস্থান বিএনপির বিরুদ্ধে তারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করছেন। তাদের প্রতিবাদ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দেবে।
“আমার আসনেও বিএনপির একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তিনি আমাকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ফন্দি আঁটছেন। কিন্তু এতে সফল হতে পারছেন না। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছেন।”
মাঠ ছেড়েছেন অর্ধেক ‘বিদ্রোহী’
এসব ‘বিদ্রোহীদের’ মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নেতা, জেলা কমিটির নেতা, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা রয়েছেন।
দলীয় নির্দেশ অমান্য করে ঢাকা বাদে ৬৩ জেলায় ১১৮টি আসনে প্রায় ১৭৯ জন বিএনপি নেতা ধানের শীষ প্রতীকের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে মনোনয়নপত্র দিয়েছিলেন।
এরপর অনেক নেতার সঙ্গেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি কথা বলে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানান। দল থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, প্রার্থিতা অব্যাহত রাখলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।
এমনকি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানও কারও কারও সঙ্গে ঢাকায় কথা বলেছেন। তারা প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন।
অনেক ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়েও আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে কেউ কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। কোথাও কোথাও বিএনপি প্রার্থীর বিপরীতেও বিকল্প হিসেবে কেউ কেউ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তারা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এভাবে প্রায় অর্ধেক বিএনপি নেতা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
কিন্তু তারপরেও ঢাকার তিনটি আসনসহ প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসনে ধানের শীষের বিপরীতে দলটির সাবেক নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন। এ অবস্থায় বিএনপি আরও ৫৯ জনকে বহিষ্কারের তথ্য দিল।
|
নং |
আসন |
জোটের প্রার্থী |
প্রতীক |
বিএনপির বিদ্রোহী |
প্রতীক |
|
১ |
বগুড়া-২ |
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না |
কেটলি |
শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম |
ধানের শীষ |
|
২ |
পটুয়াখালী-৩ |
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর |
ট্রাক |
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন |
ঘোড়া |
|
৩ |
ঢাকা-১২ |
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক |
কোদাল |
ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব |
ফুটবল |
|
৪ |
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ |
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি |
মাথাল |
|
|
|
৫ |
নীলফামারী-১ |
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী |
খেজুর গাছ |
|
|
|
৬ |
সিলেট-৫ |
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক |
খেজুর গাছ |
সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ (যিনি ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিত) |
ফুটবল |
|
৭ |
নারায়ণগঞ্জ-৪ |
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমী |
খেজুর গাছ |
১. বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন
২. নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহে আলম |
১. ফুটবল
২. হরিণ |
|
৮ |
ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ |
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীব |
খেজুর গাছ |
১. সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা
২. জেলা বিএনপির সদস্য এস এন তরুণ দে |
১. হাঁস
২. কলার ছড়ি |
|
৯ |
ভোলা-১ |
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ |
গরুর গাড়ি |
|
|
|
নং |
আসন |
অন্য দল থেকে আসা প্রার্থী |
প্রতীক |
বিএনপির বিদ্রোহী |
প্রতীক |
|
১ |
পিরোজপুর-১ |
জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার |
ধানের শীষ |
|
|
|
২ |
নড়াইল-২ |
এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ |
ধানের শীষ |
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম |
কলস |
|
৩ |
যশোর-৫ |
জমিয়তে উল ইসলামী জোটের রশিদ আহমেদ (মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাস) |
ধানের শীষ |
মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন |
কলস |
|
৪ |
ঝিনাইদহ-৪ |
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন |
ধানের শীষ |
স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ |
কাপ-পিরিচ |
|
৫ |
কুমিল্লা-৭ |
রেদোয়ান আহমেদ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। |
ধানের শীষ |
চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন |
কলস |
|
৬ |
ঢাকা-১৩ |
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। |
ধানের শীষ |
|
|
|
৭ |
লক্ষ্মীপুর-১ |
বিএলডিপির প্রেসিডেন্ট শাহাদাত হোসেন সেলিম দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে এসেছেন |
ধানের শীষ |
|
|
|
৮ |
কিশোরগঞ্জ-৫ |
সৈয়দ এহসানুল হুদা, বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে তিনি বিএনপিতে এসেছেন |
ধানের শীষ |
বাজিতপুর উপজেলা সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল |
হাঁস |
আরও পড়ুন:
জমিয়তে উলামায়ের সঙ্গে ৪ আসনে সমঝোতা বিএনপির
মান্নার সমঝোতার আসনে আছেন বিএনপির প্রার্থীও
সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা-১২ আসনে, পিরোজপুর-১ এ সবচেয়ে কম
জোটের অঙ্কে ১৪ দল থেকে এবার কারা
আরপিও: জোট প্রার্থীর মার্কা নিয়ে সরব তিন দল, ইসি নীরব
আরপিও সংশোধন: এবার আপত্তি জানিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে বিএনপির চিঠি