Published : 03 Nov 2025, 01:16 AM
জোট মনোনীত প্রার্থীদের প্রতীকের বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধান নিয়ে কয়েকটি দল পক্ষে-বিপক্ষে সরব হলেও নির্বাচন কমিশন আপাতত চুপ থাকার কৌশল নিয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আইন মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে তারপর তারা কথা বলবেন।
তবে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হলে সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপও হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৩ অক্টোবর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) একগুচ্ছ সংস্কার এনে নীতিগত ও চূড়ান্ত অমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। এরপর এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও তা অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়নি।
আরপিওর একটি সংশোধনীকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আপত্তি দেখা গেছে। আরপিওর ২০ অনুচ্ছেদে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তাতে জোটভুক্ত হলেও মনোনীত প্রার্থীকে তার দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে।
আগের বিধান অনুযায়ী, নিবন্ধিত দলের জোটের প্রার্থীরা যে কোনো প্রতীকে ভোট করতে পারতেন। প্রধান দলগুলোর প্রতীক জোটভুক্ত ছোট দলের কয়েকজন প্রার্থীর ব্যবহারের সুযোগ ছিল এবং অতীতে তারা জিতেও এসেছেন।
নিবন্ধিত দলের স্বাতন্ত্র, প্রতীকের জনপ্রিয়তাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা রেখে জোটভুক্ত হলেও স্ব স্ব প্রতীকে ভোটের বিধান চালুর সুপারিশ করে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। এ সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনও নানা সংস্কার প্রস্তাবে তা অন্তর্ভুক্ত রাখে। সবশেষ উপদেষ্টা পরিষদেরও অনুমোদন পেয়েছে বিষয়টি।
কিন্তু বিএনপি আরপিওর ২০ অনুচ্ছেদের সংশোধনী নিয়ে আপত্তি তুলেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করার পাশাপাশি বিধানটি বাদ দিয়ে আগের অনুচ্ছেদই বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে দলটি।
বিএনপির জোটসঙ্গী কয়েকটি দলও ইসিতে চিঠি দিয়েছে, বিক্ষোভ করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ আইন উপদেষ্টার সঙ্গেও এ নিয়ে বৈঠক করেছেন।
২৮ অক্টোবর আইন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার পর তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আগেও আমি বিষয়টি আইন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন যে এটা তিনি সরকারের নজরে আনবেন। তিনি নিশ্চয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা এটা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অধ্যাদেশটি কেবিনেটে পাস হওয়ার পর দেখলাম, বিবেচিত হয়নি।”
এরপর জামায়াতের পক্ষ থেকে সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে উল্টো দাবি জানানো হয়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “কোনোভাবেই সংশোধিত বিধান পরিবর্তন করা যাবে না। জোটে ভোট করলেও স্ব স্ব দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে।”
আরপিও সংশোধনের চেষ্টার প্রতিবাদ জানান জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরও। সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, ‘অগোচরে’ আরপিও সংশোধন করছে উপদেষ্টা পরিষদ, যা একটি দলের কাছে সরকারের ‘নতি স্বীকার’।
এরইমধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে স্মারকলিপিও দিয়েছে।
সবশেষ রোববার আইন উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। দলের সচিব আখতার হোসেন সেখানে লিখেছেন, “সাম্প্রতিক সময়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২০ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেওয়া আপনার ব্যক্তিগত আশ্বাস ও অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, একজন উপদেষ্টা হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ আইন উপদেষ্টা, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন।
“নির্বাচনী আইন সংশোধনের মত বিষয়ে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে এককভাবে আশ্বাস প্রদান করা জুলাই গণঅভুথান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদের নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতার পরিপন্থি।”
রোববার এনসিপি প্রতিনিধি দল তাদের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের একটি চিঠি সিইসির কাছে জমা দেন।
সেখানে বলা হয়, “আমরা মনে করি, প্রতিটি নিবন্ধিত দলকে তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নিয়েছে তা একটি ঐতিহাসিক ও নীতিগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ।
“পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিওর সংশোধনীর মাধ্যমে উক্ত বিধান অনুমোদিত হয়েছে এবং শুধুমাত্র গেজেট প্রকাশ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এখন সরকার বা নির্বাচন কমিশন যদি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির রাজনৈতিক চাপে পাস হওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার মাধ্যমে সরকার তার অবস্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়, সেক্ষেত্রে শুধু কমিশনের স্বাধীনতার ওপরই আঘাত নয়, বরং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারের কার্যক্রমের ওপরও আঘাত।“
এ বিষয়ে আাইন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
‘হতাশাজনক’
উপদেষ্টা পরিষদের সংশোধনের পর নতুন করে আরপিওর ২০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দলগুলোর অবস্থানে ‘হতাশা’ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, জোটে ভোট করলেও প্রতীক হবে স্ব স্ব দলের–এমন বিধান তারা সুপারিশ করেছেন এবং ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার পর নানা সুপারিশের মধ্যে এটাও রেখেছে ইসি।
“বিধানটি রেখে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে। অধ্যাদেশ আকাকে গেজেট জারি হয়নি। এখন যদি বিধানটি না রাখে, তাহলে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে না। তার মানে এটা এক ধরনের হতাশা।”
এ নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “সবার সাথে আলোচনা করে যে সুপারিশ এসেছে, সেভাবে এগোচ্ছে। এখন এক ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরেক রককম যদি হয়ে যায়, সেটা আন-এক্সেপেক্টেড, এটা হওয়া উচিত না।”
>> উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত সংশোধিত আরপিও ২০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো জোট করলেও নিজস্ব দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। আগে জোটবদ্ধ দলগুলোর জোটের প্রতীকে ভোট করার সুযোগ ছিল।
>> বিএনপিসহ কয়েকটি দল আরপিও এর ২০ অনুচ্ছেদের আগে বিধান বহাল চেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দল সংশোধিত আরপিও বহাল রাখার পক্ষে।
মুখে কুলুপ ইসির
রোববার এনসিপি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সিইসির বৈঠকের পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “আরপিও সংশোধনের সর্বশেষ অবস্থা আমারও জানা নেই। আমার জানা থাকলে তো জানান। উপদেষ্টা পরিষদে নীতিগত অনুমোদনের পর বাকি কাজগুলো করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তারা এ কাজটি করে থাকে, তারা অধ্যাদেশ জারি করে। কাজেই অধ্যাদেশ জারির বিষয়টি যতক্ষণ না পর্যন্ত সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরাও আপনাদের মতোই অপেক্ষায় আছি।”
আরপিওতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বা দলগুলোর দাবি-আপত্তির সুরাহার বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের দিকে ঠেলে দেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইসি সচিব বলেন, “এ বিষয়টি সরকারের কাছে, আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে। এর উত্তর আইন মন্ত্রণালয়ই দিতে পারবে। আমাদের করার কিছু নেই। কারণ আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিষয়টি উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে অনুমোদনও হয়ে গছে। এর পরবর্তী কোনো বিষয় প্রাসঙ্গিক হয় তার সাথে ইসির কোনো সম্পর্ক নেই।”
ইসির সম্মতি ছাড়া (২০ অনুচ্ছেদ সংশোধন) আবারও আরপিওতে পরিবর্তন করা যায় কিনা– এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের এখান থেকে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমরাও অপেক্ষা করছি। আইন মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অবস্থান পাওয়ার পর এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।”
দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী সংলাপের জন্য আরপিওর অপেক্ষায় ইসি।
ইসি সচিব বলেন, “নির্বাচনে এখনো তিনটি স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সংলাপ হয়নি। এর মধ্যে প্রধান স্টেকহোল্ডার হল রাজনৈতিক দলগুলো। আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধির গেজেট না পাওয়া গেলে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ করা সম্ভব নয়। তাই আমরা অপেক্ষায় আছি। গেজেট পেলেই সংলাপের কাজ শুরু করে দেব।”
পুরনো খবর
আরপিও সংশোধন: এবার আপত্তি জানিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে বিএনপির চিঠি
পলাতক আসামি প্রার্থী হতে পারবে না, সংশোধিত আরপিও অনুমোদন
নভেম্বরে গণভোট, আরপিও আর সংশোধন নয়: ইসিকে জামায়াত
আরপিও সংশোধন: আইন উপদেষ্টার 'অবস্থান' নিয়ে এনসিপির 'উদ্বেগ'