রাকসু শিক্ষার্থীদের চোখে কতটা সফল
এক বছর মেয়াদি রাকসুর মেয়াদ ২৬ অক্টোবর শেষ হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১২টি প্যানেলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি ও এজিএসসহ ২০টিতে জয়ী হয়।
নির্বাচনে জিএস হিসেবে সালাউদ্দিন আম্মার জয়ী হন ‘শিবিরের ডামি প্যানেল’ হিসেবে আলোচিত ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব বর্তমানে শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক। এ ছাড়া আম্মারও নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে শিবিরের সাথী থেকে বহিষ্কার হন।
এক বছর মেয়াদি রাকসুর মেয়াদ ২৬ অক্টোবর শেষ হয়েছে। নির্বাচনের আগে ১২ মাসে ২৪টি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজয়ী প্যানেল। পাশাপাশি ‘৭টি হ্যাঁ’ ও ‘৭টি না’ স্লোগানে শিক্ষা, আবাসন, খাবার, নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে নানা অঙ্গীকার করেছিল তারা।
তবে মেয়াদ শেষে এসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। কারও মতে, কিছু দৃশ্যমান কাজ হলেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি রাকসু। আবার ছাত্র প্রতিনিধিদের দাবি, প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা আগের রাকসুগুলোর তুলনায় বেশি কাজ করেছেন।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন
নির্বাচনের আগে ‘১২ মাসে ২৪ সংস্কার’ শিরোনামে ইশতেহার প্রকাশ করে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। এতে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, মানসম্মত খাবার, আবাসন এবং শিক্ষা ও গবেষণাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অংশে রাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা, নিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং ১৬ জুলাইকে ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা দিতে ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ নিশ্চিত করা, ডাইনিং ও ক্যাফেটেরিয়ায় পর্যাপ্ত ভর্তুকি, খাবারের দাম নির্ধারণ ও নজরদারি এবং ক্যাফেটেরিয়া আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি জনবহুল স্থানগুলোতে আধুনিক পানির ফিল্টার স্থাপন, পানির মান পরীক্ষার সনদ প্রদর্শন এবং প্রতি তিন মাসে ফিল্টার মেশিন সার্ভিসিং বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। এসব উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।
আবাসন সংকট নিরসনে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ প্রণয়ন, আবাসন ভর্তুকি, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে কাজের সুযোগ, ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে নিরাপত্তাবলয় তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগের কোনোটিই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নিয়মিত বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচি, দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলেছিল প্যানেলটি।
তবে নিয়মিত গবেষণা বৃত্তির আওতায় মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের থিসিস প্রণোদনা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বেশকিছু কর্মশালার আয়োজন করেছে রাকসু। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এককালীন আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্য প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নও দৃশ্যমান নয়।
এ ছাড়া ‘৭টি হ্যাঁ’ কর্মসূচিতে শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ, আবাসন সংকট নিরসন, মানসম্মত খাবার, নিরাপদ ক্যাম্পাস, তথ্যসেবা ও ডিজিটালাইজেশন, সব অংশীজনের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ছিল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
অন্যদিকে ‘৭টি না’ কর্মসূচিতে হল দখল ও সিট-বাণিজ্য, ট্যাগিং ও ফ্রেমিংয়ের রাজনীতি, স্লাটশেমিং, সাইবার বুলিং ও শারীরিক নির্যাতন, মাদক ও ছিনতাই এবং সন্ত্রাস ও সহিংসতা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
তবে শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হলে অবৈধভাবে অবস্থান ও রাজনৈতিক কৌশলে আসন দখলের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ।
২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তিন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মারধরের ঘটনাও ‘ট্যাগিংয়ের রাজনীতি’ বন্ধের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ওই ঘটনায় রাকসু ও শিবিরের নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
সালাউদ্দিন আম্মার তার দেওয়া আলাদা ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে একটি কুইক রেসপন্স টিম গঠন, পাঁচ টাকায় ক্যাম্পাসের যেকোনো স্থানে পরিবেশবান্ধব যানবাহন, পশ্চিমপাড়া, টুকিটাকি, পরিবহনসহ কয়েক জায়গায় সুপারশপ স্থাপন, আারইউ অ্যাপস তৈরির মাধ্যমে ক্যাম্পাসের যাবতীয় কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এগুলোর কোনটিই বাস্তবায়নই দৃশ্যমান নয়।
শিক্ষার্থীদের কী বলছেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজাহিদ হাসান বলেন, “নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রাকসু কিছু দৃশ্যমান কাজ করতে পারলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক ও দৈনন্দিন সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।”
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যে উচ্চাভিলাষী ইশতেহার দিয়েছিলেন, তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ইশতেহারের বাইরে ছাত্র সংসদ হিসেবে রাকসুর সক্ষমতা বিবেচনা করলে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি- দুটিই রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কোন্দলে না থাকলে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আরও আন্তরিকভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতো।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা বিনতে আতিয়া বলেন, “রাকসুর কাজ করার আরও সুযোগ ছিল। শতভাগ আবাসিকতার মতো প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে তা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি বিবেচনা করা উচিত ছিল।
“তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও দাবি-দাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রাকসু গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে।”
রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা ছিল ক্যাম্পাসে অন্তত রাতে স্বাধীনভাবে চলাফেরার পরিবেশ তৈরি হবে। কমনরুমে কিছু সামগ্রী এলেও হয়রানির অভিযোগের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।”
ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী শেখ নূর উদ্দীন আবীর অভিযোগ করেন, “শিবির-সমর্থিত প্যানেল জয়ী হওয়ার পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বদলে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। রাকসুর অর্থে দলীয় কর্মীদের এনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।”
বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’ থেকে ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, “শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও নির্বাচিত প্যানেলের ইশতেহার- কোনোটিই যথাযথভাবে পূরণ করা হয়নি। এবার রাকসুর জন্য স্মরণকালের সর্বোচ্চ প্রায় সোয়া কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই তুলনায় উল্লেখযোগ্য আয়োজন দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে এটিকে ‘দায়সারা রাকসু’ বলা যেতে পারে।”
রাকসু নেতারা যা বলছেন
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাকসুর সাবেক প্রতিনিধিরা।
রাকসুর সাবেক জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমি প্রতিটি প্রতিশ্রুতি একাধিক অধিবেশনে উত্থাপন করেছি, অনুমোদন নিয়েছি এবং বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না করা পর্যন্ত প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছি। সবগুলো প্রস্তাবই অনুমোদন পেয়েছে। যেহেতু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করাই বেশি কার্যকর, তাই আমি সেই পথেই এগিয়েছি।”
আম্মার বলেন, “আমি সফল না ব্যর্থ, সেটি মূল্যায়নের চেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন আদায় করে দেওয়া। আমি এগুলো বাস্তবায়ন করিয়ে দিয়েই যাব। আশা করি, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগের সুফল পাবেন।”
রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “ইশতেহারে আমরা যেসব বিষয় নিয়ে এসেছিলাম, তার প্রায় সবই বাস্তবায়নের পথে। শতভাগ আবাসনের রোড ম্যাপ, অনাবাসিক ভাতা, মেডিকেল সেন্টারসহ সকল প্রতিশ্রুতিই আমরা যতটা সম্ভব বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। বাকি কাজগুলো আমরা শুরু করছি, রাকসু সচল থাকলে শিক্ষার্থীরা সামনে এসব সুফল পাবে আশা করি।”
প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে জাহিদ বলেন, “প্রশাসনের অসহযোগিতা ও বিভিন্ন কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘসূত্রিতা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রশাসন রাকসুর তহবিলও পুরোপুরি বুঝিয়ে দিতে পারেনি। তারপরও আগের ১৭টি রাকসুর তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে।”
বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে মেয়াদজুড়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জিএস নির্বাচিত হওয়ার পরও সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে শিক্ষক হেনস্তা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিতর্কিত ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও আছে।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক নওসাজ্জামান এক ফেসবুক পোস্টে আম্মারের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীর নগর ভবন থেকে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ করেন। তবে সেসময় আম্মার বিষয়টিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
একই বছরের ২১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থি ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে ডিনদের কার্যালয়ে তালা দিতেও দেখা যায় তাকে। পরে ওই ছয় ডিন পদত্যাগ করেন।
এ বছরের ১৮ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার সময় তাকে স্বাগত জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে একটি ব্যানার টানান বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন রাবি জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নেছার উদ্দিন। আম্মার ওই ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা একাধিক বিবৃতি দেন।
রাকসুর কার্যক্রম এবং ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যের অভিযোগে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র অধিকার পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ আম্মারের কার্যালয়ে গেলে তার সঙ্গেও আম্মার অশালীন আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বন্ধের আহ্বান জানান আম্মার। এ বছরের ৫ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘কুকুর বিড়াল মেরোনা, নাস্তিক পেলে ছেড়োনা। লীগ পেলে ছেড়ো না’ লিখে পোস্ট দেন তিনি। সমালোচনার মুখে পরে পোস্টটি সরিয়ে নেন। একই মাসে ডাকসুর এক নারী প্রতিনিধিকে নিয়েও ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু আম্মার নন, অন্যান্য প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগ।
রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের বিরুদ্ধেও ক্যাম্পাসের চেয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
এ বছরের ২৮ জুলাই রাকসু ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন জাহিদ। রাকসু ও শিবিরের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে সংবাদ করেছেন এবং সেসব প্রতিবেদন সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাকসুর সহবিতর্ক বিষয়ক সম্পাদক নয়ন মোরসালিনের উদ্যোগে গত ৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় ছাত্রশিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনের ছাদে বিতর্কবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ১৩ মার্চ রাকসুর ফেইসবুক পেজে এ বিষয়ে পোস্ট দেওয়ার পর সমালোচনা শুরু হলে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে জানা যায়, শিবিরের নেতাকর্মীদের নিয়ে ওই আয়োজন করা হয়েছিল।
রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদকের উদ্যোগে ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি: সংকটের পথে দেশ’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন নিয়েও বিতর্ক হয়। এতে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির এবং জামায়াতের শরিক দল এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদকে অতিথি করা হয়। এর প্রতিবাদে ওই দিন শিশির মনিরকে লাল কার্ড দেখান শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীদের একাংশ। অতিথি নির্বাচন নিয়ে সমালোচনার মধ্যে সেমিনারে যাননি জিএস আম্মার।
২৭ জুন রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীকে ‘জাহান্নামের ইমামের মরণ দিবস’ বলে কটাক্ষ করে ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। এ নিয়েও সমালোচনা হয়।
এ ছাড়া বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নবাব আব্দুল লতিফ হল সংসদের জিএস নুরুল ইসলাম শহিদকে মারধরের অভিযোগ ওঠে রাকসুর জিএস আম্মারের বিরুদ্ধে। গত ১৭ জুন রাতে ফেসবুক পোস্টে এ অভিযোগ করেন শহিদ।
সবশেষ ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে ৩ শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ আখ্যা দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন রাকসুর জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বিরসহ রাকসু ও শিবিরের নেতারা।
ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে ভিপি প্রার্থী মেহেদী মারুফ বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, রাকসু শিবিরের একটি ক্লাবে পরিণত হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন সময়ে পিকনিক, পার্টি ও গরু খাওয়াসহ নানা আয়োজন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অধিকারসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকেছে।”
মেহেদী মারুফ বলেন, “শিবিরের একটি এক্সটেন্ডেড ভার্সন হলো আম্মার। সংগঠন হিসেবে শিবির এবং রাকসু যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে পারত না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে। এখানে তাদের উদ্ভট কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিগত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “প্রথম ১০ মাসে রাকসুর নামে বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ব্যারিস্টার ফুয়াদকে নিয়ে সেমিনার ও কাওয়ালি অনুষ্ঠানের মতো আয়োজনের বেশির ভাগই ছাত্রশিবিরের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।”
তিনি বলেন, “তারা মেডিকেল ক্যাম্প ও প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করেছে। কিন্তু প্রকাশনা উৎসবের জন্য পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হয়নি। শিক্ষার্থীরাও জানতেন না যে, তাদের বই প্রকাশের সুযোগ থাকবে। মেডিকেল ক্যাম্পেও শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি।”
