বিদ্যুতের ‘ভেল্কিবাজিতে অসহায়’ সিলেটের সোনারা বেগম

পিডিবি সহসাই এ ‘অন্ধকার’ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা দেখছে না।

সিলেট প্রতিনিধিমঞ্জুর আহমদ,বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 July 2022, 12:44 PM
Updated : 25 July 2022, 12:44 PM

সারা দেশের জন্য দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টার লোড শেডিংয়ের ঘোষণা থাকলেও সিলেটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বিভাগ শুরুই করেছিল চার ঘণ্টার সূচি দিয়ে; এখন সেটা বাড়তে বাড়তে ১৩ ঘণ্টায় গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই জেলাকে।

এই অবস্থাকে বিদ্যুতের ‘ভেল্কিবাজি’ বলছেন সিলেট নগরীর কালিঘাট এলাকার সোনারা বেগম। তার মেয়ের সামনে এসএসসি পরীক্ষা; সে পড়তে পারছে না। বন্যার ক্ষতির পর এই সংকট। তার ওপর প্রচণ্ড গরম তো রয়েছেই।

সোমবার দুপুরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদ্যুতের ভেল্কিবাজিতে আমরা অসহায়। সামনে মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা। পড়ালেখার সময় বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে পড়তে পারে না। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে আরও লোডশেডিং বাড়লে কী যে হবে ‍বুঝতে পারছি না।“

পিডিবি সহসাই এ ‘অন্ধকার’ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা দেখছে না। যদি বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ে তাহলেই কেবল লোড শেডিং কমতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ ও তেলের খরচ কমানোর একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে রয়েছে, আপাতত দেশে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন স্থগিত রাখা হবে। পাশাপাশি পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকবে সপ্তাহে একদিন।

জ্বালানি সাশ্রয় নীতির কারণে দিনে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তা সমন্বয় করতেই আপাতত দিনে এক ঘণ্টা করে লোড শেডিংয়ের পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার।

কিন্তু শুরু থেকেই এমন ঘোষণা মানছে না সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ। প্রথম দিনই তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোড শেডিং ধরে সূচি প্রকাশ করে তারা। যদিও নিজেদের প্রকাশিত সূচি মেনেনি পিডিবি। প্রথম দিন থেকেই অনেক জায়গায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার লোড শেডিংয়ের কবলে পড়েন গ্রাহকরা।

এক সপ্তাহের মাথায় এবার ১৩ ঘণ্টার লোড শেডিংয়ের সূচি প্রকাশ করল পিডিবি। এতে দিনের বেশিরভাগ সময় লোড শেডিং থাকবে সিলেটে।

বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সামছ ই আরেফিন বলেন, “আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। চাহিদার ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ বরাদ্দ পাচ্ছি। এতে শিডিউলের বাইরে গিয়ে আরও বেশি সময় লোড শেডিং করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “মানুষজন যাতে আগে থেকেই জানতে পারেন, সেজন্য ১৩ ঘণ্টা লোড শেডিং ধরে সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। এটিও প্রাথমিক সূচি। বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে লোড শেডিং সূচি থেকে বাড়তে বা কমতে পারে।”

এই অবস্থায় চরম সংকটে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। বিদ্যুৎহীনতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। কারণ, এর আগে শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় বেশ কিছু সময় গোটা সিলেট নগরীই পানিতে তলিয়ে ছিল। এতে পরিবারের আসবাবপত্র, বিছানা-বালিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইও নষ্ট হয়েছে।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাদেপাশা গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী আয়শা আক্তার জানায়, সন্ধ্যা হলেই তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়। তারপর গভীর রাত পর্যন্ত থাকে না।

“একে তো বিদ্যুৎ থাকে না; তার ওপর তীব্র গরমের কারণে রাতে একেবারেই পড়াশোনা করা যায় না।“

সিলেট নগরীর সোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ বলেন, “বিদ্যুৎ নিয়ে চরম সমস্যায় আছি। এক ঘণ্টা বিদুৎ থাকে তো তিন ঘণ্টা লোড শেডিং। এ অবস্থায় চরম গরমে আমাদের ত্রাহি অবস্থা। সিডিউল মতো বিদ্যুৎও সরবরাহ করা হচ্ছে না।“

নাইওরপুল এলাকার জুবের আহমদ বলেন, “চার ঘণ্টা লোড শেডিংয়ের কথা বলে আট থেকে ১০ ঘণ্টা লোড শেডিং করা হতো। এখন শুনেছি ১৩ ঘণ্টা লোড শেডিংয়ের সূচি জারি করা হয়েছে।”

“আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। বাসায় অসুস্থ বৃদ্ধ মা-বাবা এই চরম গরমে অস্বস্তিকর দিনযাপন করছেন।”

জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী শামীম আহমদ বলেন, “দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় কোনোভাবেই ব্যবসা করা যাচ্ছে না। জেনারেটর দিয়ে কোনোমতে বিদ্যুৎ সচল রাখলেও জ্বালানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে আদৌ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারব কি-না তা নিয়ে সংশয়ে আছি।”

পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর শিডিউলে দেখা যায়, নগরীর বালুচর, আরামবাগ, আল-ইসলাহ, নতুন বাজার, গোপালটিলা, আলুরতল, টিবি গেট, সোনারপাড়া, মজুমদারপাড়া, পূর্ব মিরাবাজার, দর্জিপাড়া, খারপাড়া, কুমারপাড়া, নাইওরপুল, ধোপাদিঘিরপাড়, ঝর্ণারপাড়, কুশিঘাট, নয়াবস্তি, টুলটিকর, মিরাপাড়া, মেন্দিবাগ, সাদাটিকর, নোওয়াগাঁও, শাপলাবাগ, মেন্দিবাগ, হকার্স মাকেট, কালীঘাট, আমজাদ আলী রোড, মহাজনপট্টি, মাছিমপুর, ছড়ারপার, উপশহর ব্লক-এইচ, আইজেই, এফজি, সাদাটিকর, রায়নগর, ঝর্ণার্নারপাড়, দর্জিবন্দ, বসুন্ধরা, খরাদিপাড়া, দপ্তরীপাড়া, আগপাড়া, কাজীটুলা, মানিকপীর মাজার, নয়াসড়ক, বারুতখানা, জেলরোড, হাওয়াপাড়া, চারাদিঘীরপাড়, চালিবন্দর, কাষ্টঘর, সোবহানীঘাট, বিশ্বরোড, জেলখানা, বঙ্গবীর, পৌরমার্কেট, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, সবুজবাগ, সেনপাড়া, হাতিমবাগ, লামাপাড়া, রাজপাড়া উপশহর ব্লক-এ, বি, সি, ডি, তেররতন, মেন্দিবাগ পয়েন্ট, ডুবড়ীহাওর, নাইওরপুল, ধোপাদিঘিরপাড়, সোবহানীঘাট, বঙ্গবীর যতরপুর, মিরাবাজার, আগপাড়া, ঝেরঝেরিপাড়া, মীরেরচক, মুক্তিরচক, মুরাদপুর, পীরের চক এলাকা ২৪ ঘণ্টায় ১১ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে পড়বে।

পিডিবির সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির বলেন, কেবল বিতরণ বিভাগ-২ নয়, পুরো সিলেটেই এমন অবস্থা। আট থেকে ১০ ঘণ্টা লোড শেডিং ধরে নতুন সূচি করা হচ্ছে। কল-কারখানা চালু থাকায় দিনে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম মিলছে। দিনে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে, তবে রাতের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো।

তিনি বলেন, পুরো বিভাগে প্রতিদিনের চাহিদা ৫৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি ৪০-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ। এ অবস্থায় লোডশেডিং করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

শহরাঞ্চলেই যখন বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন দৈন্যদশা; তখন গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ।

ওসমানীনগর উপজেলার রাইকদাড়া গ্রামের জুন্নুন চৌধুরী বলেন, “আমার একটি ধান ভাঙার কল রয়েছে। লোড শেডিংয়ের শিডিউল দেখে মিল খোলা রাখলেও শিডিউলের কোনো তোয়াক্কাই করছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। এ অবস্থায় মিল চালু রাখা দায় হয়ে পড়েছে।“

কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ি এলাকার ময়নুল ইসলাম বলেন, “গ্রামে বিদ্যুৎ আছে বলে মনে হয় না। দিনে-রাতে মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাকি সময় অন্ধকারেই থাকতে হয়। বাচ্চাদের পড়ালেখারও ব্যাঘাত ঘটছে।”

এ বিষয়ে সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তাই শিডিউলও হেরফের করতে হচ্ছে। সময়ের চেয়ে বেশি লোড শেডিং করতে হচ্ছে।

দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, “লোড একটু বেশি হয়ে গেলেই গ্রিড লাইন থেকে ফোন করে লোড কমাতে বলে। তাদের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে না কমালে আমাদের পুরো সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। ফলে আমরাও অসহায় আসলে। জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে বুঝতে পারছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না।”

সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মহাব্যবস্থাপক সঞ্জীব কুমার রায় বলেন, চাহিদার তুলনায় পিক আওয়ারে সরবরাহ সবচেয়ে কম মিলছে। তাই গ্রামের মানুষ কষ্টে আছেন।

আরও পড়ুন:

‘ঘণ্টায় ঘণ্টায়’ লোড শেডিংয়ে কাবু রংপুর

আপাতত দিনে এক ঘণ্টা লোড শেডিং, তারপর পরিস্থিতি বুঝে: প্রতিমন্ত্রী

বিএনপির টুকুর ভাষ্যে, এটা ‘কস্টলি লোড শেডিং’

লোড শেডিং কোথায় কখন, প্রস্তুত হচ্ছে সূচি

লোড শেডিং ‘সাময়িক’, ধৈর্য ধরতে বললেন কাদের

লোড শেডিংয়ে দাম চড়েছে রিচার্জেবল ফ্যান-লাইটের

Also Read: সিলেটে ১৩ ঘণ্টা লোড শেডিং ধরে সূচি প্রকাশ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক