Published : 03 May 2026, 05:32 PM
গোপালগঞ্জ শহরতলীর বৈরাগীর খাল পাড়ের এলাকায় প্রতি বছরই বোরো মৌসুমে জোয়ারের পানির চাপে ধানের ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এতে কৃষকরা ক্ষেত থেকে সম্পূর্ণ ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না, নিচু জমির ধান ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চলতি মৌসুমেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানির চাপে খালের পানি উপচে বৈরাগীর খাল পাড়ের চোননিয়াকান্দি, খাটরা, ঘোষগাতী ও বোড়াশী বিলের প্রায় ২৫০ একর জমির ধানক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এতে অনেক জমির ধান হেলে পড়েছে, আবার কিছু জমির ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেতের ধান এখনো আধাপাকা অবস্থায় থাকায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।
স্থানীয়রা বলছেন, ধান কাটা শ্রমিক সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জলমগ্ন জমিতে শ্রমিক না যাওয়ায় ধান কাটাও ব্যাহত হচ্ছে।
শুক্রবার গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, “আমি ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। এ বছর পানির চাপ বেশি। এতে অন্তত ২৫০ একর জমির ধান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।”

এ সময় কৃষকরা ফসল রক্ষায় বৈরাগীর খনন করে লকগেইট বা রিং বাঁধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বৈরাগীর খালটি গোপালগঞ্জ শহরের মধুমতি নদীর যুগশিখা স্কুল এলাকা থেকে শুরু হয়ে মিয়াপাড়া, চেচানিয়াকান্দি হয়ে বোড়াশী পাচুড়িয়া খালের সঙ্গে মিশেছে। এই খাল দিয়ে চোননিয়াকান্দি, খাটরা, ঘোষগাতী ও বোড়াশী বিলের প্রায় ৫ হাজার একর জমির চাষাবাদ হয়। পাশাপাশি শহরের পয়ঃনিষ্কাশনও এই খাল দিয়ে হয়।
খালটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে শহর অংশের ১ হাজার ৯০০ মিটার নাব্যতা থাকলেও গ্রামের ২ হাজার ১০০ মিটার অংশে পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে এবং পাড় ভেঙে গেছে।
এ কারণে ধান কাটা সৌসুমে জোয়ারের পানির চাপে এ খালের পাড় উপচে পানি ধান ক্ষেতে ঢুকে পড়ছে । এতে কমপক্ষে একশ পাঁচ একরের ৫৪০ মেট্রিকটন ধান নষ্ট হচ্ছে; যার বাজার মূল্য এক কোটি টাকার বেশি।
চেচানিয়াকান্দি গ্রামের কৃষক সুদীপ হীরা বলেন, “বৈরাগীর খাল পাড়ের দূরবর্তী অনেক জমি খুবই নিচু। এখানে জোয়ারের পানি উঠলে আর নামে না। প্রতি বছর ধান কাটার সময় জোয়ারের পানি ধান ক্ষেতে উঠে ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোটি-কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়।
তিনি বলেন, “এ বছরও জোয়ারের পানি উঠেছে; প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ক্ষেতে পানি বেড়ে যাচ্ছে। দমকা হওয়ায় অনেক ক্ষেতের ধান জমির পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।
“জলমগ্ন ধান কাটতে শ্রমিক যাওয়া যাচ্ছে না । তাই ধানের উৎপাদন কমে যাবে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ উঠবে কি-না, তা নিয়ে সবাই শঙ্কায় পড়েছেন।”
খাটরা গ্রামের কৃষাণী মাধুরী বৈদ্য বলেন, তাদের এক বিঘা জমির ধান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এখনো ধান পাকেনি।
তিনি বলেন, “ধান কেটে ঘরে তুলতে পারব কি-না সন্দেহ। তারওপর শ্রমিক পাচ্ছি না। ধান রোপন করতে অন্তত ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধান তুলতে না পারলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কি খাব? গরুর জন্য খড় রাখতে পারবো না।”

বোড়াশী গ্রামের কৃষক গোপাল বৈদ্য বলেন, “বৈরাগীর খাল আমাদের ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। আবার প্লাবিত করে ধান কেড়ে নেয়। তাই খালের জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ ও পানি সম্পদ সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি। এটি করা গেলে প্রতি বছর কোটি টাকার ধান রক্ষা করা অসম্ভব হবে।”
পানিউন্নয়ন বোর্ডের গোপালগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া ফেরদৌস বলেন, “চার হাজার মিটার দৈঘ্যর বৈরাগীর খালের গ্রামের অংশের ২ হাজার ১শ’ মিটারের নাব্যতা নষ্ট হয়েছে। ওই অংশ থেকে জোয়ারের পানি উঠে ধান ক্ষেত জলমগ্ন হচ্ছে । খালের ওই অংশ খনন করে রিং বাঁধ নির্মাণ করে দিতে হবে। এটি করলে এ সমস্যার সমাধান হবে। এতে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
তিনি আরও বলেন, খালের দুই মুখে স্লুইচ গেট নির্মাণ করলে শহরের পয়ঃনিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হতে পারে, ফলে জলাবদ্ধতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের জন্য প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।