Published : 14 Jul 2026, 03:29 PM
বান্দরবানে বন্যায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত, ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত এবং পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে সাতজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় নিজ কার্যালয়ে সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সামিউল ফেরদৌস।
ভবিষ্যতে পার্বত্য এই জেলাকে বন্যামুক্ত করতে সমন্বিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, বান্দরবানে বন্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, প্রয়োজন অনুযায়ী রাস্তাঘাট উঁচু, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী খনন এবং শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ম্যাকসি খাল দখলমুক্ত করে সংস্কার করতে হবে।
জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও এলজিইডির সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানান সামিউল ফেরদৌস।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
তবে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ দশমিক ৪৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৩ দশমিক ৭১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এ পর্যন্ত জেলায় ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে; যার মধ্যে ১১টি বড় আকারের। ভূমিধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অধিকাংশ সড়ক সচল করা হয়েছে।
এ ছাড়া আলাদা দুটি ভূমিধসে লামা উপজেলায় পাঁচজন এবং পানিতে ডুবে দুইজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
বন্যায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও ২,১০৪ হেক্টর কৃষিজমির ক্ষতি
বন্যায় সওজের ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডির প্রায় ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চারটি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট। এর মধ্যে একটি সচল করা হলেও বাকি তিনটির মেরামতকাজ চলছে।

কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, এখন পর্যন্ত দুই হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৩২৩ জন।
বন্যা পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলায় প্রস্তুত রাখা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে বানভাসিরা আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে দুই হাজার ৫৮২ জন অবস্থান করছেন। এ ছাড়া ১২ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- লামা পৌর এলাকা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলা। জেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে জানানো হয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ৪০০ টন চাল, ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
এ পর্যন্ত আট হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী, ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়। পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া নগদ তিন লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। আরও তিন হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।
পর্যটন পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক সামিউউ ফেরদৌস বলেন, বন্যার কারণে থানচিতে ১৬৭ জন এবং রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। সবশেষ আমিয়াখুমে আটকা পড়া চারজন পর্যটককে বিজিবির সহায়তায় উদ্ধার করা হয়। আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ওষুধ ও সাপের কামড়ের এন্টিভেনম মজুত রয়েছে। একইসঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
সমস্যা থেকে উত্তরণে কয়েক দফা সুপারিশ তুলে ধরে জেলা প্রশাসক মো. সামিউউ ফেরদৌস বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য বিশেষ নকশার গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করা এবং সদর পৌর এলাকার ম্যাকছি খাল সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরার সময় অন্তত দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। ভেঙে যাওয়া ঘর মেরামতের জন্য এক হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারকে তিন হাজার টাকা করে গৃহ মেরামত অনুদান চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান, বিদ্যৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন মাসুম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দে উপস্থিত ছিলেন।
আর পড়ুন-
বান্দরবানে পানি নামছে, কাদাভরা ঘর এখন দুর্ভোগ
বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি, নিম্নাঞ্চল এখনও প্লাবিত
বান্দরবানে বন্যার ঝুঁকিতে থাকা ১৫,৬০০ পরিবারকে ডব্লিউএফপির সহায়তা