Published : 12 Jul 2026, 09:52 PM
বান্দরবান শহরে কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে; তবে নিম্নাঞ্চল এখনও প্লাবিত।
স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার বিকাল থেকে ভারি বৃষ্টি না হওয়ায় রোববার সকালে অনেক এলাকা থেকে পানি নেমে যায়।
তবে শহরের নিম্নাঞ্চল বিশেষ করে ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, কাসেমপাড়া, বনানী সমিল এলাকায় এখনও বুক সমান পানি। এসব এলাকার লোকজনদের এখনও নৌকা ও ভেলায় করে জরুরি কাজ সামলাতে হচ্ছে।
শহরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকালে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় দুর্গত লোকজন খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধুয়ামোছার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে বাইরে বেরিয়ে পড়েন।
কিন্তু দুপুর গড়াতেই আবারও ভারি বৃষ্টি নেমে আসে। থেমে থেমে চলে দুপুর ১টা থেকে প্রায় সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। ফলে আবারও ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষদের।

দুপুরে তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন আর্মিপাড়ায় আসে প্রশাসনের রান্না করা খাবারের গাড়ি। গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে মানুষ মাথায় ছাতা নিয়ে জড়ো হয়ে যান। কেউ প্লেট, কেউ পলিথিন হাতে করে খাবার নিতে আসেন। পরে লাইন করে খাবার বিতরণ করতে দেখা যায়। তবে লোকজন খুব বেশি দেখা যায়নি।
খাবার নিতে আসা রহিমা বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে থেকে ঘর পানিতে ডুবে গেছে। পাশে শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন সবাই। সেখানেও দুপুরে খাবার দেওয়া হয়। হঠাৎ খাবার গাড়ি সামনে পড়ায় এখান থেকে খাবার সংগ্রহ করছেন।
আর্মিপাড়ার অল্প কিছু দূরে বিদ্যুৎ কার্যালয় সংলগ্ন ওয়াপদা ব্রিজ এলাকা। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরোপুরি পানিতে ডুবে ছিল এলাকাটি। সেখানেও দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে প্রশাসন থেকে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। খাবার হিসেবে রয়েছে রান্না করা খিচুড়ি। লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজন খাবার নিচ্ছে। তবে সড়কের পাশে হওয়ায় সেখানে লোকজন কিছুটা বেশি দেখা গেছে।

হিলবার্ড এলাকা মোড়ে রয়েছে সব ধরনের পর্যটকবাহী গাড়ি স্টেশন। বান্দরবানে বেড়াতে আসা লোকজন সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে থাকে। সেখানে রয়েছে শহরে প্রথম সারির আবাসিক হোটেল হিলটন।
নিচে রয়েছে ঢাকাগামী এসি বাসের কয়েকটি কাউন্টার। এই আবাসিক হোটেল হিলটন ও বাস কাউন্টারগুলো শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্ধেক ডুবে ছিল। সেখান থেকে রোববার সকালে পানি নেমে গেছে বলে জানান একজন পরিবহন শ্রমিক।
হোটেল হিলটনের পেছনে থাকা বান্দরবান অফিসার্স ক্লাব ও খেলার প্রাঙ্গণ এলাকাটিও অর্ধেক ডুবে আছে। পাশেই রয়েছে ইসলামপুর এলাকা। আর এই ইসলামপুর প্রবেশমুখেই রোববার বিকাল পর্যন্ত বুকসমান পানি রয়েছে। সেখানে একটি নৌকা ও ভেলায় করে স্থানীয়রা পারপার করছেন। তখনও ঝরছে অবিরাম বৃষ্টি। সেখানে ব্র্যাক সংস্থার ত্রাণবাহী দুইটা জিপ গাড়ি নিয়ে ১০-১২ জন কর্মী ছিলেন।
বান্দরবান ব্র্যাক কার্যালয়ের সিনিয়র অ্যাডমিন অফিসার শিবলু বড়ুয়া বলেন, প্রশাসনের লোকজন নিয়ে ইসলামপুরের ভেতরে ১২০ পরিবারের মধ্যে ব্র্যাকের ত্রাণের প্যাকেট বিতরণ করা হচ্ছে। এই নৌকায় করে ত্রাণের প্যাকেটগুলো সেখানে পারাপার করে দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যেক দিন পানিবন্দি এলাকায় গিয়ে ব্র্যাকের ত্রাণ এভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের জন্য বন্যা পরবর্তীতেও বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানান শিবলু।
এদিকে সাঙ্গু নদীর পাড়ে লোকজন এখনও চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। তাদের ঘরবাড়ি অর্ধেক ডুবে রয়েছে। যেসব এলাকা থেকে পানি নামছে সেসব ঘরগুলোও কাদায় ভরা। কেউ কেউ পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ঘর গোছানোর কাজ শুরু করে দেন।
তবে পানি বাড়ায় আবারও আগের মত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন। পাশে একটা আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে রয়েছে দুর্গত লোকজন।
শহরের উজানি পাড়ার পাড়াস্কুল এলাকাটি সাঙ্গু নদীর পাড়ে। সেখানকার বাসিন্দা কণিকা রুদ্র বলেন, “আমরা পাশে এক আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। সকালে পানি কমছে দেখে ঘর পরিষ্কার করতে আসছি। পরিস্কার করার পর আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘর সব কাদায় ভরে গেছে। এখন ভিজে ভিজে মালামালগুলো আবার সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে।”

পাড়াস্কুলে আশ্রয় নেওয়া প্রমিলা দাশ বলেন, “পাঁচ দিন হল আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছি। এই বৃষ্টির মধ্যে কষ্ট করে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। শুধু বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় আছি। প্রশাসনের লোকজন এসে দেখে গেছে। এখানে কিছু শুকনা খাবার ছাড়া আর কিছু দেওয়া হয়নি।”
পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, শনিবার রাতে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা থেকে কয়েকটি দূরপাল্লার বাস ছেড়ে এসেছে। তবে বেশিরভাগ বাস চলাচল এখনও বন্ধ। আভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। তবে জরুরি প্রয়োজনে জিপ গাড়ি ও অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের।

বান্দরবান বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন বলেন, “বেশিরভাগ এলাকা এখনও পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। আমাদের প্রথম বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। সে কারণে পানি নিমজ্জিত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এখন পানি কমতে শুরু করেছে। যেসব এলাকা এখনও নিমজ্জিত, পানি কমলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংযোগ দেওয়া হবে।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমকর্তা বুলবুল আক্তার সেতু বলেন, “রোববার বিকাল পর্যন্ত পৌর এলাকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দুই হাজার ৯৫৩ জনকে শুকনা খবার, ২৩৫টি শিশুখাদ্য ও বিভিন্ন এনজিওর পক্ষ থেকে এক হাজার ৪৫ জনকে ত্রাণের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। তবে সারাদিনে ঠিক কতজনকে দেওয়া হয়েছে সব তথ্য সন্ধ্যার পর জানা যাবে।”