Published : 11 Jul 2026, 05:19 PM
বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
শনিবার সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া- চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানান বান্দরবান সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন।
শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লা বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া শুক্রবার রাতে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে গেছে। এতে দুই জেলার সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, জেলা শহরে কোনো রকমে ভেঙে ভেঙে যেতে পারলেও সকাল থেকে বান্দরবান- রাঙ্গামাটি সড়কে বাঙ্গাল হালিয়ার কাছাকাছি ব্রিজঘাটা এলাকায় একটা বেইলি সেতু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ফলে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা পর্যন্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজনকে ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে এপার ওপার পার হতে দেখা গেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে গেছে। এতে সকাল থেকে এই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
“বান্দরবান সওজয়ের পক্ষ হতে যোগাযোগ পুন:স্থাপনের জন্য একটা টিম প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ওই সড়কের বালাঘাটা ও স্বর্ণমন্দির এলাকায় পানি থাকায় আমরা রওনা করতে পারছি না”, বলেন তিনি।
এদিকে শহরে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও সকালে কসাই পাড়া এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের উপর গাছ পড়ে যাওয়ায় গোটা শহরে বিদ্যুৎ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
শহরে কিছু এলাকা ছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিক মত কাজ করছে না। পাওয়া যাচ্ছে না মোবাইল ইন্টারনেটও। ফলে জরুরি খবরা-খবর পেতে ভোগান্তিতে পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের রেস্ট হাউস, সেনা বাহিনীর ব্রিগেড এলাকা, বেতার এলাকা ও পুলিশ লাইন এলাকায় পানি থই থই করছে। এর মধ্যে বালাঘাটার ব্রিগেড এলাকা ও পুলিশ লাইন্স এলাকায় জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষদের নৌকায় করে চলাচল করতে দেখা গেছে।
বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার সকাল থেকে আবহাওয়া শুষ্ক দেখা গিয়েছিল। পানি নামতে শুরু করেছিল নিম্নাঞ্চল এলাকা থেকেও। তবে দুপুরের পর থেকে দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। রাতে আবার ভারি বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি অবনতি হতে শুরু করে।

এতে শনিবার সকাল থেকে জেলা শহর এবং উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে আবার অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়তে শুরু করে।
এদিকে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলাতেও বন্যার পরিস্থিতিও সকাল থেকে আবারও অবনতি হয়েছে। সেখানেও বিদ্যুৎ ও কোনো কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।
রোয়াংছড়ির উপজেলা সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা বলেন, “সদরে নিম্নাঞ্চল এলাকার পাড়াগুলো পুরোপুরি ডুবে গেছে। ফোন করে খবর নেব সে উপায়ও নেই। গিয়ে গিয়ে খবর নিতে হচ্ছে।”
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, “এরকম দুর্যোগ পরিস্থিতিতে যাতে ওভারল্যাপিং না হয়, সেজন্য ত্রাণ বিতরণের জন্য সমন্বিতভাবে সভা করা হয়েছে। উপজেলার চার ইউনিয়ন মিলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে সংখ্যা আনুমানিক এক হাজার ৩৩০।
“ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বলতে যাদের বসতঘরে পানি ঢুকেছে তাদের বিবেচনায় নিয়েছি। যাদের কৃষিজমি বা ফসলের ক্ষতি হয়েছে, তাদের বিষয়ে কৃষি বিভাগেরর মাধ্যমে আলাদাভাবে তালিকা করা হবে।”

তবে সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বন্যা দুর্গতদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান ব্র্যাকের বান্দরবান জেলার সমন্বয়ক সুশান্ত বিশ্বাস।
তিনি বলেন, বন্যা দুর্গত এলাকার লামায় ৩০০ পরিবার, নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০০ পরিবার এবং সদর উপজেলার গোয়ালিখোলা এলাকায় ২৬৫ পরিবারকে ৮৮৫ টাকার একটা ত্রাণ প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ প্যাকেজে ছিল চাল, ডাল, চিনি, গুড়, লবন, পেঁয়াজের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য।
বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থার (বিএনকেএস) উপ-নির্বাহী পরিচালক উবানু মারমা বলেন, তাদের সংস্থার একটা প্রকল্প থেকে বন্যায় দুর্গত ১৬ হাজার পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা করে বিকাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক এস এম মঞ্জুরুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, সকাল যেটুকু পানি ছিল সেটা আরও বাড়ছে। শহরে পৌর এলাকায় যেসব আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে এবং তার বাইরে যেখানে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সবমিলে তিন হাজার ৩০০ জনকে দুপুরে খাবার দেওয়া হয়েছে।
রাতে আট হাজারও বেশি বন্যা দুর্গত মানুষদের জন্য খাবার আয়োজন করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শহরে সাঙ্গু নদী তীরবর্তী এবং লামা ও আলীকদমের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ ১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে জেলা প্রশাসন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সময়ের মধ্যে স্থানীয়দেরও চলাচলের সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।