Published : 18 Aug 2025, 10:04 PM
উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উপজেলার ‘স্বপ্ননগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে’ বসবাসরত অন্তত ২৫০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
এক সপ্তাহ ধরে ওই এলাকার অধিকাংশ ঘর পানিতে তলিয়ে থাকায় কেউ রাস্তায় কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন বয়স্করা। সেইসঙ্গে গৃহপালিত পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দিরা।
মঙ্গলবার পানিবন্দিদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করার কথা জানিয়েছেন আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল।
২০২০-২১ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের চরকাতলাসুর গ্রামে ৩৩ একর জমির ওপর টিনশেডের ২৫০টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। সেই সময় জেলা প্রশাসন এলাকাটির নামকরণ করে ‘স্বপ্ননগর আবাসন প্রকল্প’।
সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রবেশপথে কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও তার চেয়ে বেশি। ঘরগুলোর প্রতিটি গলিতে পানি প্রায় হাঁটু সমান। বেশির ভাগ ঘরের মেঝেতে ঢুকে পড়েছে নোংরা পানি। তলিয়ে গেছে রান্না করার চুলা।

এ ছাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে টয়লেটের রিং-স্লাব। এতে নোংরা পানির দুর্গন্ধে অসহনীয় হয়ে পড়েছে পরিবেশ। ছোট শিশুরা ঘর থেকে বের হতে পারছে না। সুপেয় পানির অভাব ও নোংরা-দুর্গন্ধযুক্ত পানির স্পর্শে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব।
সেখানকার বাসিন্দারা দিন এনে দিন খায়। পশু পালন, ভ্যান চালানো, কৃষি কাজ, টেইলাসের কাজসহ নানান পেশায় জড়িত তারা। পানিবন্দি হয়ে পড়ায় দিন এনে দিন খাওয়া বাসিন্দারা বেকার হয়ে পড়েছেন। এমনকি বসবাসকারীদের ঘরে জ্বলছে না তিনবেলা চুলা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৪ নম্বর ঘরের বাসিন্দা জবেদা বেগম বলেন, “মধুমতি নদীতে সাতবার বাড়ি ভাঙছে। পরে সরকার এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকার জন্য একটা ঘর দিছে। কিন্তু এখানে এসেও চরম বিপাকে পড়েছি।

“ঘরে পানি। রান্না ঘর তলিয়ে গেছে। ঠিকমতো রান্না করতে পারছি না। আবার অর্থ সংকটও রয়েছে। এক বেলা রান্না করে কোনো রকম বেঁচে আছি।”
বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম (৫৫) বলেন, “ক্ষেত-খামার যা করছিলাম সব পানির নিচে। তিনবেলার জায়গায় এক বেলা খেয়ে দিন পার করছি। এখন ঘরে খাটের ওপর বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নাই। তবে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কেউ খোঁজখবর নেয়নি।”
রাত হলে আতঙ্কে থাকতে হয় জানিয়ে সেলিনা বেগম বলেন, “কয়েক দিন আগে একটি সাপ দেখতে পেয়ে ভয়ে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যায়। সাপ, পোকামাকড়ের ভয়ে রাতে না ঘুমিয়ে চোকির উপর বসে থাকতে হয়।”
দুর্ভোগের কথা জানান আশ্রয়ণ প্রকল্পের শিক্ষার্থী মীম খানম ও ফাতেমা খানম। তারা স্থানীয় চর কাতলাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা বলে, অনেক কষ্ট করে স্কুলে যেতে হয়। পানি দিয়ে যাওয়া আসার সময় পড়ে গিয়ে জামা-কাপড় ও বইখাতা ভিজে যায়।
চর কাতলাসুর গ্রামের বাসিন্দা ও আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকার মুদিদোকানী ফিরোজ মোল্যা বলেন, “১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এ এলাকায় এতো বন্যা হয়নি। আমার ঘরে খাটের উপর পানি উঠেছে। বউ বাচ্চাদের বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। দোকানে তেমন বেচাকেনা নাই। দোকানেও পানি ওঠা ওঠা ভাব।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. বিল্লাল মোল্যা বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা বসবাস করেন, তারা খুব দরিদ্র। তারা সকালে কাজে বের হন, আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। সারাদিন তারা বাইরেই থাকেন। কিন্তু এখন তারা ঠিকমতো কাজকর্মে যেতে পারছেন না।”

গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খান সাইফুল ইসলাম বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দ্রুত তালিকাটি উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হবে।
সেখানে বসবাসকারীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার কথা জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান।
সোমবার দুপুরে ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পে জলাবদ্ধতার খবর পেয়েছি। মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে সেখানে হাঁটু সমান পানি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভুক্তভোগীদের তালিকা করছেন।”
তিনি বলেন, স্বপ্ননগরের বাসিন্দা ও মধুমতি নদীর ভাঙনে কবলে পড়া বাসিন্দাদের জন্য চার টন চাল ও দুই লাখ টাকা সরকারি অনুদান পাওয়া গেছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে মঙ্গলবার থেকে চাল ও টাকা বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও রাসেল ইকবাল।