Published : 09 Jun 2026, 12:56 AM
গ্রামের অর্থনীতি ‘চাঙা’ করতে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৮ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে ঋণ পাবেন কৃষক।
এ তহবিলের নাম ‘দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কৃষি ও পল্লী খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’।
সোমবার রাতে এ তহবিলের নীতিমালা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই দিন আরও দুটি তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। একটি হল- ৫ হাজার কোটি টাকার কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাতের তহবিল; এর ঋণের সুদের হার হবে ৯ শতাংশ।
দ্বিতীয়টি পরিবেশবান্ধব কারখানা করতে হাজার কোটির টাকার তহবিল; যেটির সুদের হার হবে ৫ শতাংশ।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বিদ্যমান সুদের চেয়ে প্রায় অর্ধেক সুদে এই তিন তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ২৩ মে বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতি ‘চাঙা’ করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার ১৬ হাজার কোটি টাকার এই তিন তহবিলের নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে।
গত ৪ জুন বন্ধ ও আংশিক চালু কারখানা পুরোপুরি সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবে বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। এ জন্য গ্রাহকদের সুদ দিতে হবে ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূলত কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার এই নতুন তহবিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে এর অর্থের যোগান দেওয়া হবে। তহবিলের স্কিমের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। আর ব্যাংকগুলো কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ (সরল সুদে) ঋণ বিতরণ করতে পারবে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও মুনাফার হার কোনোভাবেই ৮ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
তহবিলের আওতায় সব ধরনের শস্য-ফসল চাষ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি কেনা এবং গ্রামে আয় উৎসারী নানা কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপিরা এই সুবিধা পাবেন না। এই তহবিল থেকে একজন কৃষক সর্বোচ্চ তিনবার ঋণ নিতে পারবেন।
ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্যও বড় সুবিধা রাখা হয়েছে এ তহবিলে। শস্য ও ফসল চাষের জন্য কোনো জামানত ছাড়াই (শুধুমাত্র শস্য-ফসল দায়বদ্ধকরণের বিপরীতে) একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। পাশাপাশি নারী ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য প্রচলিত জমির কাগজের পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে ব্যক্তিগত বা সামাজিক-দলগত জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ স্কিমের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১৮ মাস, যার মধ্যে ৩ মাস গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধের সাময়িক বিরতি) হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া এ টাকা কোনোভাবেই তাদের পুরোনো কোনো ঋণ সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করতে পারবে না।
কোনো ব্যাংক যদি এ তহবিলের অপব্যবহার করে কিংবা গ্রাহকের কাছ থেকে ৮ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করে, তবে ওই ব্যাংকের ওপর ২ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নীতিমালায় এই তহবিল থেকে সুবিধা নিতে ইচ্ছুক ব্যাংকগুলোকে আগামী এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-২ এর সঙ্গে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি করতে বলা হয়েছে।
সিএমএসএমই খাতের তহবিল
নতুন এ তহবিলের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এ খাতটি শ্রমনিবিড় ও স্বল্প পুঁজি নির্ভর হওয়ায় এবং এর উৎপাদন সময়কাল স্বল্প হওয়ায় আমদানি বিকল্প পণ্য/সেবা উৎপাদনসহ জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম।
তবে বাস্তবতার নিরিখে চাহিদার তুলনায় এ খাতে চলতি মূলধনের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায়, এর বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
এমন প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সিএমএসএমই খাতের বিকাশের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের অপেক্ষাকৃত কম সুদে এবং সহজ শর্তে চলতি মূলধন ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করতে তফসিলি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় গঠিত তহবিল থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার এই ‘আবর্তনশীল পুনঃ অর্থায়ন’ তহবিল গঠন করা হয়। এর মেয়াদ তিন বছর।
এই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে গ্রাহকেদের ৯ শতাংশ সুদে বিতরণ করবে।
পরিবেশবান্ধব কারখানা করতে তহবিল
দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা তৈরি এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ‘আবর্তনশীল পুনঃ অর্থায়ন’ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও জাতীয় টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার সঙ্গে সংগতি রেখে শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব করার উদ্দেশ্যে এই তহবিল গঠন করা হয়েছে।
নতুন এই ‘গ্রিন তহবিলের’ আওতায় সুদ ও মেয়াদের ক্ষেত্রে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে পরিবেশবান্ধব কারখানা বা ভবন নির্মাণের জন্য ঋণ নিলে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৫ শতাংশ। গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো লুকানো খরচ বা ফি নেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে ব্যাংক ও ফিন্যান্স কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ২ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে অর্থ নিতে পারবে।
এই ঋণের মেয়াদ হবে ৩ থেকে ১০ বছর। ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা কিস্তি পরিশোধের সাময়িক ছাড় পাবেন। কোনো একক উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের আওতায় সর্বোচ্চ শত কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।