গৃহবিবাদ নিয়েই ভোটে জাতীয় পার্টি

প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে জাতীয় পার্টির কিন্তু ‘অভিমান’ ভাঙেনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের। তার অনুসারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি; যাদের একজন এরশাদ পুত্র সাদ।

ওয়াসেক বিল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 Nov 2023, 07:24 PM
Updated : 27 Nov 2023, 07:24 PM

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যে প্রার্থী তালিকা জাতীয় পার্টি ঘোষণা করল, সংসদে তাদের নেত্রীর নাম সেখানে না থাকায় দলের বিভক্তিই ফের স্পষ্ট হল।

দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের জন্য আসন ফাঁকা রাখা হলেও তিনি ফরমই নিচ্ছেন না।

রওশন একা নন, ফরম তোলেননি রাহগির আলমাহি সাদ এরশাদও। দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও রওশনের ছেলে তিনি। সাদ যে আসনের সংসদ সদস্য সেখানে আবার এরশাদের ভাই, দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

জাতীয় পার্টিতে কর্তৃত্ব নিয়ে এই দ্বন্দ্ব চলছে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে। এটির অবসানের কোনো আভাস এখনও দেখা যায়নি।

দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনা শাসক এরশাদ যতদিন বেঁচে ছিলেন, বিভেদটা ছিল মূলত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের গতি প্রকৃতি নিয়ে।

২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে দেবর-ভাবির (জি এম কাদের ও রওশন) বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে কয়েকবার। সেই বিরোধের জেরে রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত বহু নেতার ওপর নেমে এসেছে বহিষ্কারের খড়গ।

জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সোমবার যে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতেও বাদ পড়েছেন রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত বহু নেতা।

মশিউর রহমান রাঙ্গার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে রাজি নন জি এম কাদের, তাকে মনোনয়নের তালিকাতেও বিবেচনায় আনা হয়নি। অথচ রংপুর-১ আসনে তিনি লাঙ্গল নিয়ে তিনবার জিতেছেন।

দলে ফেরানো হয়নি রওশনপন্থি নেতা জিয়াউল হক মৃধাকেও। গত ৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি পান ৩৭ হাজার ৭৫৮ ভোট। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল নিয়ে এই আসনে আব্দুল হামিদ ভাসানী পান ৩ হাজার ১৮৬ ভোট। ফের তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

মনোনয়ন পাননি পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে চার চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রওশনের ময়মনসিংহ-৪ আসনটি ফাঁকা রেখে জাতীয় পার্টি বলেছে, তার প্রতি ‘সম্মানার্থে’ এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে অনুসারীদের বাদ দিয়ে এই ‘সম্মান’ রওশন চান কি না, সেই প্রশ্ন রয়েই গেছে।

রওশন এখনও নির্বাচন থেকে দূরে

জাতীয় পার্টি নির্বাচেনে যাবে কি যাবে না, এ নিয়ে প্রশ্নে রওশন বরাবর ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। গত ১৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর তিনি স্বাগত জানিয় বিবৃতি দিয়েছেন। অথচ জাতীয় পার্টি যখন মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু করল, তখন থেকেই তিনি দূরে।

জাতীয় পার্টি ২০ থেকে ২৩ নভেম্বর মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে। সময় শেষ হওয়ার পর তা বাড়ানো হয় আরও এক দিন। এই এক দিন সময় বাড়ানোর কারণ ছিল, রওশন এরশাদ ফরম তোলেননি। সময় বাড়ানোর পরেও অবশ্য চিত্র পাল্টায়নি। এর মধ্যে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শুরু করে দলটি।

শনিবার জি এম কাদেরের সঙ্গে রওশনের একান্ত বৈঠক হয় নির্বাচন নিয়ে। দল থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে, সেই রাতে রওশনের বাসায় যান জি এম কাদের। সেখানে ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ, বিরোধীদলীয় নেতার মুখপাত্র কাজী মামুনূর রশিদ ও রাহগির আল মাহি এরশাদ।

দুই নেতার মধ্যে এক ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক হয় একান্তে। বৈঠক শেষে রাত ১০টার দিকে রওশন এরশাদের বাসভবন থেকে বের হন জিএম কাদের।

বৈঠকের দুই দিন পর জাতীয় পার্টি প্রার্থী ঘোষণার দিন প্রকাশ পায়, রওশন এরশাদ এখনও ফরমও নেননি। তিনি নেননি বলে তার অনুসারীরাও দূরে আছেন।

চুন্নু গত ২৫ নভেম্বরের বলা কথা এদিন আবার বলেন। তিনি জানান, রওশন এরশাদ তিনটি আসনের জন্য ফরম চেয়েছেন। আর প্রয়োজনে তিনি নিজে গিয়ে সেই ফরম দিয়ে আসবেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যদি রওশন ফরম চান এবং যদি দিয়ে আসতে রাজি থাকেন, তাহলে কেন ফরম নিয়ে রওশনের বাসায় যাচ্ছেন না তিনি?

এই প্রশ্নে মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, “আমি তো বলেছি উনি (রওশন) নির্দেশ দিলে দিয়ে আসব। উনি বলেননি তো।”

রওশন কোন কোন আসনের জন্য ফরম চান- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা আগেই বলেছি, নতুন করে বলতে পারব না।”

গত ২৫ নভেম্বর চুন্নু জানিয়েছিলেন, ছেলে সাদ এরশাদ ও চিকিৎসক কে আর ইসলামের জন্য দুটি ফরম চেয়েছিলেন রওশন।

সাদের আসনে নিজেই প্রার্থী জি এম কাদের

জি এম কাদের বর্তমানে লালমনিরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য। তিনি ২০০৮ সালেও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সেখান থেকে ভোটে অংশ নেন। কিন্তু এবার তিনি প্রার্থী হতে চাইছেন রংপুর-৩ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে।

এরশাদ মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ২০০৮ সালে এই দুটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালেও চেয়েছিলেন এই দুটি। তবে সেবার দেওয়া হয় কেবল রংপুর-৩।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বিশেষ দূত মাসরুর মওলা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সাদের আসন নিয়ে দুই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।

একবার তিনি বলেছেন, সাদের জন্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল (ময়মনসিংহ-৭) এর ফরম চেয়েছেন রওশন। সেই আসনটি ফাঁকা রাখা হয়েছে।

আসলে জাতীয় পার্টি সেই আসনে মো. আব্দুল মজিদ নামে একজনকে মনোনয়ন দিয়ে রেখেছে।

জি এম কাদের কেন এবার রংপুরে প্রার্থী হলেন- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “ওটা আমাদের সাবেক চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আসন ছিল। এটা আমাদের চেয়ারম্যানের সিট। বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের সে সময় লালমনিরহাটের এমপি। সেটা তো তিনি ছেড়ে আসতে পারেন না, তাই তখন তাকে রংপুরে দেওয়া হয়েছিল।”

সাদ এরশাদ তো রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাহলে তাকে কেন ত্রিশালের জন্য বিবেচনা করা হবে- এই প্রশ্নে মাসরুর মওলা বলেন, “এটা আমাদের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বলতে পারবেন।”

সাদ এরশাদের জন্য কোন আসনের কথা ভাবছেন-  এই প্রশ্ন মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, “সে (সাদ) তো আসেইনি, চায়ইনি, আমরা কী করে ভাবব?

কিন্তু রওশনের জন্য তো আসন ফাঁকা রেখেছেন- এই মন্তব্য জবাব এল, “ওটা তো সম্মান করে রেখেছি।”

আলোচনায় রাঙ্গা

২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গাকে সব পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় জাতীয় পার্টি।

সে সময় আরও কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল; তাদের একজন হলেন দলের সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা, যিনি জি এম কাদেরের চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

রওশনের নির্বাচনে না যাওয়া বা তার অনুসারীদের ফরম না তোলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাঙ্গাকে নিয়ে সিদ্ধান্তের সম্পর্ক আছে কি না, এই প্রশ্নে মাসরুর মওলা বলেন, “রাঙ্গা তো জাপার কেউ না। ওনাকে নিয়ে কোনো কথা হবে কেন?”

‘অনেকে তো বলছেন, রাঙ্গাকে নিয়েই দূরত্ব?’- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি আবার বলেন, “আমি আবার বলছি, রাঙ্গা তো বহিষ্কৃত। তিনি জাতীয় পার্টির কেউ নন। তাকে নিয়ে আমরা মাথাব্যথা করতে রাজি না।”

রাঙ্গা এক সময় রওশনের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন না পেলেও তিনি এবার ভোটে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রাঙ্গা বলেন, “জাতীয় পার্টি এখন পরগাছা দলে রূপান্তর হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের উপর ভর করে আর কতদিন? আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করব।”

কে আর ইসলামও আলোচনায়

চুন্নুর দাবি, অনুযায়ী রওশন যে তিনটি ফরম চেয়েছেন, তার মধ্যে একটি চাওয়া হয় চিকিৎসক কে আর ইসলামের জন্য।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ-৬ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

মাসরুর মওলাও একই কথা বলেন।

তবে ২০২২ সালের ২ অক্টোবর এই চিকিৎসককে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাকে দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়টি কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না।

তবু অস্বীকার

রওশন ফরম নিচ্ছেন না, তার অনুসারীরা মনোনয়ন পাননি- এতসব ঘটনার মধ্যেও জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দলে বিভেদের কথা স্বীকার করেননি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমার জানা মতে কোনো দূরত্ব নেই।”

তাহলে রওশন ফরম নিচ্ছেন না কেন?- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “সেটা তো আমি বলতে পারব না, উনাকে জিজ্ঞেস করেন।”

মাসরুর মওলা আবার বলেন, “উনি (রওশন) আসলে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন না। সেদিন জি এম কাদের সাহেবের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠক হয়েছে, সেখানে তিনি কয়েকজনের সামনে বলেছেন, “আমি এই শরীরে নির্বাচন করতে চাচ্ছি না।”

তিনি যদি নির্বাচন না করেন, তাহলে জাতীয় পার্টি সেখানে প্রার্থী দিচ্ছে না কেন- এই প্রশ্নে মাসরুর বলেন, “ওই যে তাকে সম্মান দেখানো। তিনি নির্বাচন করতে চান না, তার মানে যে আমরা আরেকজন লোক দিয়ে দেব, এই বেয়াদবি তো করব না।”

তাহলে মহাসচিব কেন বলছেন যে তিনি বাসায় গিয়ে ফরম দিয়ে আসবেন?- এই প্রশ্নে মাসরুরের জবাব, “সবই একই কথার মধ্যে ফেলব। আমরা ফরম দিতে চাই, যদি তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান, তাহলে তাকে ওই আসনে মনোনয়ন দেব।”

রওশন না হয় নির্বাচন করতে চাইছেন না, বর্তমান সংসদ সদস্য হয়েও সাদ কেন ভোট থেকে দূরে- এই প্রশ্নে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বলেন, “ওর মনের কথা তো বলতে পারব না। হয়ত মা করবে না দেখে সেও মনোনয়ন ফরম নিচ্ছে না।

“তবে আমাদের ধারণা, ফাইনালি সাদ নির্বাচন করবে। ইয়াং ম্যান, তার দিন পড়ে আছে। ওর তো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আছে।”

ফাঁকা ১৩ আসন

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের ঘোষণার মধ্যে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বা সমঝোতায় না গিয়ে এককভাবে ভোটের ঘোষণা আছে জাতীয় পার্টির।

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ২২ নভেম্বর ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেন চুন্নু। তবে পাঁচ দিন পর ২৮৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেন তিনি।

যে ১৩টি আসন ফাঁকা রাখা হয়, তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোপালগঞ্জ-৩, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সুনামগঞ্জ-৩, আওয়ামী লীগ নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর শেরপুর-২ আসন যেমন আছে, তেমনি ফাঁকা রাখা হয়েছে রওশন এরশাদের ময়মনসিংহ-৪ আসন।

এর মধ্যে ময়মনসিংহ-৪ ফাঁকা রাখার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে চুন্নু বলেছেন, রওশন এরশাদের ‘সম্মানার্থে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে না পারায় কারণ ঘোষণা হয়নি।

দশম নির্বাচন থেকেই রওশন ‘বড় নাম’

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালে মহাজোট করে ভোটে অংশ নেওয়ার পর রওশন এরশাদের ছেড়ে দেওয়া রংপুর-৩ আসনে সংসদ সদস্য হন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে পরের নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে যায় বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে জাতীয় পার্টির দ্যোদুল্যমান অবস্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন রওশন।

সেই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রার্থিতা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন দলে রওশনকে ঘিরে তৈরি হয় আরও একটি বলয়। তারা জানান, ভোট করবেন।

জি এম কাদের সে সময় তার ভাইয়ের নির্দেশ মেনে ভোট থেকে দূরে ছিলেন। তবে এরশাদের মনোনয়নপত্র ঢাকা থেকে প্রত্যাহার হলেও রংপুর-৩ ও লালমনিরহাট-১ আসনে থেকে যায়।

সেই নির্বাচনে রওশন এরশাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ময়মনসিংহ-৪ আসন থেকে।

ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে সেই নির্বাচনে এরশাদকে রংপুর থেকে জয়ী ঘোষণা করা হয়, পরাজিত দেখানো হয় লালমনিরহাটে।

এরশাদ প্রথমে বলেন, তিনি শপথ নেবেন না। তবে তার আগেই জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সংসদ সদস্যের বেশিরভাগের পছন্দে রওশন এরশাদ সংসদীয় দলের নেতা-নির্বাচিত হন এবং তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করা হয়।

পরে এরশাদ অভিমান ভুলে একেবারে শেষ দিনে শপথ নিয়ে সংসদ সদস্য হন। তাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়।

নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সেবার বিরোধী দলে থাকলেও দলের কয়েকজন মন্ত্রিত্ব নেন। দলটির দ্বিমুখী ওই ভূমিকা সমালোচনার মুখে পড়ে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে আবার জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দল নিয়ে হয় মহাজোট।

নির্বাচনের পর জোট ভেঙে দেওয়া হলে জাতীয় পার্টি বসে বিরোধী দলে। ফের বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন।

এবারও নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি যখন সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দিচ্ছিল না, সে সময় গত ১৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে রওশন এরশাদ জানান, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে এবং মহাজোটের প্রতীক ব্যবহার করবে।

তবে চুন্নু আরেক চিঠিতে জানান, জাতীয় পার্টির মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন জি এম কাদের।

এরশাদ নেই, ক্ষণে ক্ষণে চাঙা বিভেদ

একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাস ছয়েক পর এরশাদের মৃত্যু হয়; জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয় বিভেদ। একদিকে রওশন এরশাদ এবং অন্যদিকে জি এম কাদের। শেষ পর্যন্ত কাদেরপন্থিরাই ‘লড়াইয়ে’ জেতেন। জি এম কাদের হন চেয়ারম্যান, প্রধান পৃষ্ঠপোষক হন রওশন।

রওশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক বেশ ভালো। তবে জি এম কাদের নানা সময় সরকারের কট্টর সমালোচনা করেছিলেন, এমনকি ভোটে আসা নিয়েও তার অন্য চিন্তা ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।

তিন বছর পর থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদের নামে গত ২০২২ সালের ৩০ অগাস্ট আকস্মিকভাবে দলের কাউন্সিল ডাকা হয়। এর পাল্টায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরাও রওশনকে বাদ দিয়ে কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে সেপ্টেম্বরের শুরুতে চিঠি দেন স্পিকারকে।

দলে বিবাদের মধ্যে গত ১৪ সেপ্টেম্বর কোনো কারণ উল্লেখ না করে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁকে দলের সভাপতিমণ্ডলীসহ সব পদ থেকে অব্যাহতি দেয় জাতীয় পার্টি।

প্রায় দুই মাস পার হলেও জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার প্রশ্নে স্পিকারের কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় ৩০ অক্টোবর দলটি সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত জানায়।

বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে গেজেট প্রকাশ না করা পর্যন্ত তারা সংসদে যোগ দেবেন না বললেও পরদিনই সংসদ অধিবেশনে তাদের দেখা যায়।

দীর্ঘ পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে নভেম্বরের শেষে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফেরেন রওশান এরশাদ। সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন, দ্বন্দ্ব দূর করতে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।

এরপর ২৯ নভেম্বর জি এম কাদের ওয়েস্টিনে গেলে লম্বা সময় বৈঠক হয় দেবর-ভাবির।

এর মধ্যে ২০২২ সালের গত ৪ অক্টোবর বহিষ্কৃত নেতা জিয়াউল হক মৃধা পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মারা যান। এরপর হাই কোর্টে একটি রিট মামলা বিচারাধীন থাকার পরও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর কাউন্সিল করে জিএম কাদের নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন।

ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ মাসুদুল হক গত বছরের ৩০ অক্টোবর এক আদেশে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসাবে জিএম কাদেরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দায়িত্ব পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। পরে ওই আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে জিএম কাদেরের করা আবেদন ১৬ নভেম্বর একই আদালত খারিজ করে দেয়।

বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজের একক হাই কোর্ট বেঞ্চ গত ৫ ফেব্রুয়ারি জিএম কাদেরের দায়িত্ব পালনের ওপর জজ আদালতের দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে। এরপর মামলাটি নিয়ে আর অগ্রগতি নেই।

চলতি বছরের অগাস্টের তৃতীয় সপ্তাহে তিন দিনের জন্য ভারত সফরে যান জি এক কাদের। তিনি ফেরার আগের দিন ২২ অগাস্ট গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি আসে, সেখানে বলা হয়, জিএম কাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন।

এ নিয়ে দিনভর নাটকীয়তার পর রওশনপন্থি নেতা গোলাম মসীহ দাবি করেন, এই বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে রওশন কিছু জানেনই না।  

মসীহ বলেন, “এটা অ্যাকচুয়ালি চক্রান্ত হয়েছে, কন্সপিরেসি হয়েছে।”

কারা করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পার্টির কিছু অতি উৎসাহী লোক থাকে না? কে করেছে, আমরা এটা বের করার চেষ্টা করছি।”

ভারত থেকে ফিরে জি এম কাদের বলেন, “আমি উনাকে মায়ের মতো দেখেছি ছোটবেলা থেকে। উনার সঙ্গে আমার কোনো সময় কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না, এখনও দ্বন্দ্ব নাই।”

লড়াইয়ে রওশনের পরাজয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধান পৃষ্ঠপোষকের দ্বন্দ্ব এখন আর মুখ্য বিষয় নয়। দলের নেতৃত্বে দূরত্ব নিয়েও বলার নেই। কারণ, দলটি এখন চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। রওশন এরশাদ কয়েকজনকে নিয়ে একঘরে হয়ে আছেন।”

জাতীয় পার্টি যদি সত্যি সত্যি একক শক্তিতে ভোটে অংশ নেয়, তাহলে কজন জিতে আসতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হারুনের।

তিনি বলেন, “ভোটের বিচারের তাদের অবস্থানও দুর্বল। এরশাদ বেঁচে থাকতে রংপুর, সিলেটে ভোট পেত। এখনও রংপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় কিছু ভোট পাবে।”

[ এ প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মঈনুল হক চৌধুরী ও কাজী মোবারক হোসেন।]

আরও পড়ুন

Also Read: জাতীয় পার্টি নিয়ে পুরনো অংকেই আওয়ামী লীগ

Also Read: রওশনের জন্য ময়মনসিংহ-৪ ফাঁকা রাখল জাতীয় পার্টি

Also Read: আওয়ামী লীগের ফাঁকা রাখা আসনে জাপার প্রার্থী সেলিম ওসমান

Also Read: ২৮৭ আসনে লাঙ্গলের প্রার্থী ঘোষণা

Also Read: স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন রাঙ্গা, জাতীয় পার্টিকে বললেন ‘পরগাছা’

Also Read: ৩ জনের জন্য ফরম ‘চেয়েছেন’ রওশন, বাসায় নিয়ে যাবেন চুন্নু

Also Read: সিঙ্গাপুরে বিএনপি-জাপার ‘বৈঠকের’ খবর দিলেন ওবায়দুল কাদের

Also Read: ভারত সফর ও রওশন নিয়ে যা বললেন জিএম কাদের

Also Read: জি এম কাদেরকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে ‘চেয়ার’ নিলেন রওশন

Also Read: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রওশনের সাক্ষাৎ