Published : 30 Dec 2025, 12:57 AM
তিন দশক পর আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যাক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নিবন্ধনও স্থগিত হয়েছে, ফলে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মত দেশের অন্যতম প্রাচীন এ দলটিকে ছাড়াই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তাদের ১৪ দলীয় জোটের দুই শরিক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
তবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ ‘অধিকাংশ দল’ নির্বাচনে থাকায় এবং এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষে সোমবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সার্বিক পরিস্থিতি ভালো। কোথাও কোনো ঝামেলা হয়নি, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও আসেনি। অনেকটাই শান্তিপূর্ণ হয়েছে মনোনয়ন জমা। সাধারণত ছোটোখাটো ঝামেলা হয়, মারামারি হয় দুই পক্ষের, শোডাউন হয়–এবার সেসব দেখা যায়নি।”
মনোনয়নপত্র জমার সময় আর বাড়ানো হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, “অনেক প্রার্থীর আগ্রহ দেখা গেছে, অনেক পার্টি ইনভল্ভ হয়েছে, সেদিক দেখে ভালো। ইটস আ গুড সাইন ফর ইলেকশন। যেভাবে শান্তিপূর্ণভাবে, আচরণবিধি মেনে সব দল অংশ নিয়েছে, ভোটের দিন পর্যন্ত এমন পরিবেশ বজায় রাখবে, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে।”

ভোটের এই পরিবেশ আগামীতেও ধরে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, “বাছাই পর্ব শেষে আপিল-নিষ্পত্তির বিষয় রয়েছে। সামনে প্রচারের বিষয় রয়েছে। এরপর দলগুলোর অনেকে বলছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। দলগুলোকে আস্থায় আনতে হবে, মাঠটা যেন সমতল করতে পারে।”
নির্বাচনি ট্রেন এভাবে চললে নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা দেখছেন না আব্দুল আলীম; তবে তার অন্য আশঙ্কা রয়েছে।
“কেউ ইলেকশনকে ব্যাহত করার চেষ্টা করবে না–এটার গ্যারান্টি নেই, করতেই পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো ফোর্স সাকসেসফুল না হয়। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। দলগুলোকে নমনীয় হয়ে আইন-বিধি অনুসরণ করে কাজ করতে হবে, ঐকমত্যে থাকতে হবে-নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”
আসনপ্রতি ৮টির বেশি মনোনয়নপত্র
ইসি সচিবালয়ের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক ও এনআইডি উইং এর মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীর জানান, ৩০০ আসনে ৩ হাজার ৪০৭টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৮২টি।
সে হিসাবে আসনপ্রতি ৮টির বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
|
অঞ্চলের নাম |
জেলা |
নির্বাচনি এলাকা |
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ |
মনোনয়নপত্র জমারকারী সংখ্যা |
|
রংপুর |
৮ |
৩৩ |
৩৩৮ |
২৭৯ |
|
রাজশাহী |
৮ |
৩৯ |
৩২৯ |
২৬০ |
|
খুলনা |
১০ |
৩৬ |
৩৫৮ |
২৭৬ |
|
বরিশাল |
৬ |
২১ |
২১২ |
১৬৬ |
|
ফরিদপুর |
৫ |
১৫ |
১৬৫ |
১৪২ |
|
ঢাকা |
৬ |
৪১ |
৬৩৮ |
৪৪৪ |
|
ময়মনসিংহ |
৬ |
৩৮ |
৪০২ |
৩১১ |
|
সিলেট |
৪ |
১৯ |
১৭৬ |
১৪৬ |
|
কুমিল্লা |
৬ |
৩৫ |
৪৯৬ |
৩৬৫ |
|
চট্টগ্রাম |
৫ |
২৩ |
২৯৩ |
১৯৪ |
|
মোট |
৬৪ |
৩০০ |
৩৪০৭ |
২৫৮২ |
নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত দল রয়েছে ৫৯টি; এরমধ্যে কটি দল অংশ নিচ্ছে-সেই একীভূত তথ্য সোমবার রাতে দিতে পারেনি ইসি। স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীর সংখ্যাও পরে জানাবে ইসি সচিবালয়।
এবার জমা পড়া মনোনয়নপত্র সংখ্যা গত দুই নির্বাচনের চেয়ে কম। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে বর্জনের মধ্যে ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২ হাজার ৭৪১ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন।
তার আগে ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ ৩৯টি নিবন্ধিত দল অংশ নেয়। সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৪৯৮টি এবং দলীয় প্রার্থীদের ২ হাজার ৫৬৭টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।

নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন। আবার এক আসনে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
একজন প্রার্থী এক স্থানে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিলে সেক্ষেত্রে প্রথমে একটি পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে; পরেরগুলোতে বন্ধনী দিয়ে ক, খ অথবা ১, ২ ইত্যাদি দেওয়া হবে। সব ঠিক থাকলে বাছাইয়ে একটি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তিন আসনে (বগুড়া-৩, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩) মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন; তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব আসনে বিকল্প প্রার্থীও রেখেছে তার দল।
আবার কোনো কোনো আসনে প্রার্থী হিসেবে দলীয়ভাবে একাধিক ব্যক্তির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাছাইয়ে বৈধ হলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগেই একজনকে চূড়ান্ত করতে হবে সংশ্লিষ্ট দলকে।
কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একটি নির্বাচনি এলাকায় একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে সংশ্লিষ্ট দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত লিখিত পত্রের মাধ্যমে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ আগামী ২০ জানুয়ারি বিকাল ৫টার মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে।
একটি আসনে একদলের একাধিক প্রার্থী থাকলে একজন চূড়ান্ত হওয়ার পর দলের মনোনীত অন্যান্য প্রার্থী আর প্রার্থী হিসেবে গণ্য হবেন না। চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী দলের প্রতীক পাবেন।
আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকা জমা দিতে হয়। তবে সাবেক সংসদ সদস্য হলে তার দরকার হবে না।

ইসির সতর্কবার্তা
আরপিও সংশোধনের ফলে এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, একক প্রার্থী থাকলে সংশ্লিষ্ট আসনে ‘না’ ভোট যুক্ত হবে। এর ফলে সব আসনে মনোনয়নপত্রও বেড়েছে।
ভোটে অনিয়মের কারণে শুধু কেন্দ্র নয়, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটও বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে ইসির।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের যেসব অভিযোগ তারা এ পর্যন্ত পেয়েছেন, তা “ধর্তব্যের মধ্যে না আনলেও চলে।”
সেজন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
“আমাদের বার্তা হচ্ছে, যা কিছু হবে, তা হবে নিয়মতান্ত্রিক, সবার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে; নিয়মের বাইরে গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “আমার তো মনে হয়, ভালো কম্পিটিশন হতে যাচ্ছে নির্বাচনে। কোথাও কোথাও ত্রুটি বিচ্যুতি হলেও সবখানে কঠোরভাবে বলে দিয়েছি আমরা-আচরণবিধি ভঙ্গ হলেই শোকজ করতে, ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটিকে নিরপেক্ষভাবে দেখে রিপোর্ট দিতে বলেছি।
“কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। প্রভাবিত করতে চাইলে বিপদে পড়বে; খারাপ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
জোটের হিসাব-নিকাশ
বড় একটা সময় বাংলাদেশে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অথবা তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিএনপি ও সমমনারা দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় ওই দুই নির্বাচন হয়ে গিয়েছিল একতরফা।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার তারা ভোটে নেই। আওয়ামী লীগের জোট শরিকরাও মাঠে নেই। তবে তাতে একতরফা ভোটের মত পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপি ও জামায়াত আলাদা দুটো ‘সমঝোতা জোট’ গঠন করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট-বড় অনেক রাজনৈতিক দল এখন এই দুই প্রধান শক্তির বলয়ে বিভক্ত।
বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম,নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ইসলামী ঐক্যে জোট, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এনপিপি ও গণঅধিকার পরিষদ।
বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নেতা–কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদও দল ছেড়ে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কয়েক মাস আগে থেকেই ধর্মভিত্তিক আরো সাতটি দল নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল।
আট দলের এই জোটে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
সর্বশেষ তরুণদের দল এনসিপি, অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) জামায়াতের এই জোটের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে।
শেষ সময়ে জামায়াতের জোটে যাওয়ায় এনসিপি ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা, তাদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। কেউ আবার মনোনয়নপত্র নিয়েও জমা দেননি।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া শেষ পর্যন্ত এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তবে তিনি নির্বাচন করবেন না।
সম্প্রতি তথ্য উপদেষ্টার পদ ছেড়ে আসা মাহফুজ আলম ও মনোনয়নপত্র জমা দেননি। তবে তিনি এনপিসিতেও যাননি।
মনোনয়নপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ‘উৎসবমুখর’ পরিবেশে ভোটের যাত্রা শুরু হল বলে মনে করেন রাজনীতির বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান।
তবে তরুণদের দল এনসিপির সামনে বিকল্প তৃতীয় শক্তি হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, জামায়াতে ইসলামীর জোটে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার ‘কবর’ রচিত হয়েছে।
তাতে আগের মতই বিভাজিত রাজনীতির বয়ান তৈরি এবং পারস্পরিক বাদানুবাদের দিকেই ঝোঁকার শঙ্কা দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও নাগরিক কোয়ালিশনের সদস্য শাহান।
তিনি বলেন, “আমি একটু ভয়ে আছি, যখন নির্বাচন শুরু হবে, তখন উনারা আসলে কী মেসেজ নিয়ে আসবেন। যদি মেসেজটা হয় যে আমরা (একদল) এভাবে কাজ করব আর উনারা (অন্যদল) ওভাবে কাজ করবে–এটা হচ্ছে আমাদের মধ্যে পার্থক্য, তাহলে আমার ধারণা উৎসবটা ভালো হবে।
“আর যদি জিনিসটা পরস্পরকে গালিগালাজের মধ্যে চলে যায়, তাহলে একটু ভয়ের ব্যাপার আছে যে আবার কনফ্রন্টেশন শুরু হয় কি না।”
জাতীয় পার্টি নির্বাচনে এলেও তাদের শক্ত প্রতিযোগী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এই অধ্যাপক। এক্ষেত্রে তিনি সাম্প্রতিক হওয়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন জরিপের ওপর আস্থা রাখতে চান।
শাহান বলেন, “এরকম কোনো ইনডিকেশন কোথাও দেখিনি যে আওয়ামী লীগের ভোটাররা এদিকে (জাতীয় পার্টি) ভোট দেবে। বরং ইনোভিশনের (ইনোভিশন কনসাল্টিং পরিচালিত 'জনগণের নির্বাচন ভাবনা') সার্ভে যেটা দেখিয়েছে যে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপি-জামায়াতের মধ্য থেকেই কোনো একটাকে বেছে নেবেন।”
|
কোন নির্বাচনে কত প্রার্থী |
|
সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে বর্জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ২৮টি দল অংশ নেয়। বিএনপিসহ ১৪টি দল ভোটের বাইরে ছিল। দলীয় ও স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হতে ২ হাজার ৭৪১ জন মনোনয়নপত্র জমা দেয়। |
|
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৪৯৮টি এবং দলীয় প্রার্থীদের ২ হাজার ৫৬৭টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ওই সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি নিবন্ধিত দল অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৬১ জন। তাদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১৭৩৩ জন; বাকি ১২৮ জন স্বতন্ত্র। |
|
২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে ১২টি দল অংশ নিয়েছিল। মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল ১ হাজার ১০৭টি, বাছাইয়ের পর টিকে ছিলেন ৮৭৭ জন। ১৫৩টি আসনে একক প্রার্থী ছিল বলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। |
|
দল নিবন্ধনের পদ্ধতি চালুর পর ২০০৮ সালের নবম সংসদ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ২৮টি দল; প্রার্থী ছিলেন ১৫৬৭ জন। |
|
নিবন্ধন চালু হওয়ার আগে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৫৫টি দল অংশ নেয়, প্রার্থী ছিলেন ১৯৩৯ জন। |
|
১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৮১টি দল অংশ নেয়, প্রার্থী ছিলেন ২৫৭২ জন। |
|
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ১৪৫০ জন প্রার্থী ছিলেন, দল ছিল ৪২টি। |
|
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ২৭৮৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, দল ছিল ৭৫টি। |
|
১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৮টি দল অংশ নিয়েছিল, প্রার্থী ছিলেন ৯৭৭ জন। |
|
১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫২৭ জন প্রার্থী ছিলেন, দল ছিল ২৮টি। |
|
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯টি দল অংশ নেয়, প্রার্থী ছিলেন ২১২৫ জন। |
|
১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নেয়, ১০৯১ জন প্রার্থী ছিলেন। |
সবার চাওয়া ‘সমান সুযোগ’
সোমবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত দেশজুড়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন প্রার্থীরা।
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর কাছে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্বাচনী এজেন্ট সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, “আমরা জনগণের কাছে দোয়া চাই। এ নির্বাচনী এলাকা থেকে দলমত নির্বিশেষে সবার ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়ে আগামী দিনে বাংলাদেশে সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশের সঙ্কট উত্তরণে সচেষ্ট হবেন।”
তিনি জানান, তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে আগেও ভোটার ছিলেন, বাসা তখন ক্যান্টনমেন্টে ছিল।
“এ এলাকার প্রতি আলাদা একটা টান রয়েছে। শেষ মুহূর্তে সবার অনুরোধে প্রার্থী হয়েছেন। আশা করি এলাকার ভোটাররা তাকে নির্বাচিত করবেন।”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বলেন, “দীর্ঘদিন পরে দেশের মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।”

জামায়াত ইসলামী আমির শফিকুর রহমান নির্বাচন করছেন ঢাকা ১৫ আসনে। সোমবার আগারগাঁও নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে (ইটিআই) আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে তার মনোনয়নপত্র জমা দেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইনসহ ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল।
পরে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন যাতে উপহার পারি সেই প্রত্যাশা করছি।”
ভোটের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “১০ দলের মধ্যে আসন সমঝোতার মাধ্যমে এবার নির্বাচন করছি আমরা। আশা করব, সরকার ও ইসি, সবাই মিলে যাতে আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারি। এটা নিয়ে আরও কাজ করার আছে। আমরা আশা করছি নির্বাচন কমিশন এটা নিয়ে কাজ করবে।”
ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ, যিনি এনডিএম চেয়ারম্যান ছিলেন।
সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, “কৌশলগত কারণে নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি। জোটে ছিলাম, আছি। কৌশলগত কারণে আমরা এক মার্কায় নির্বাচন করব। আরপিওতে নিশিরাতে বদল আনা হয়েছে ষড়যন্ত্র করে। আমাদের নির্বাচনি মার্কা ধানের শীষ।”
ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আশা করছি এই আসনের বাসিন্দারা নিরাপদে থাকবে। নারীরা নিরাপদে থাকবে। আমরা আশা করি ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন।”
একই আসনে জামায়াতের আমিরও প্রার্থী হয়েছেন। সেজন্য লড়াইয়ের চাপ অনুভব করছেন কিনা জানতে চাইলে মিল্টন বলেন, “আমি বিএনপির পক্ষ থেকে লড়ছি। জামায়াতের আমিরের বিপক্ষে লড়ে আমি কোনো চাপ বোধ করছি না। আমি মিরপুরের সন্তান। আমি আশা করছি এলাকাবাসী তাদের এলাকার সন্তানকে ভোট দেবেন। আশা করি নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যবস্থা করবে।”

ঢাকা-১৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের জয়েন্ট সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মুরাদ হোসেন মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আশা করছি যথাসময় নির্বাচন হবে। কিন্তু সারা বাংলাদেশের জনগণই নিরাপত্তার হুমকিতে রয়েছে।
“আমরা যারা প্রার্থী রয়েছি তারাও এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আশা করব সরকার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অতি দ্রুত আমাদের সামনে দৃশ্যমান করবেন এবং মানুষের নিরাপত্তাও তারা নিশ্চিত করবেন।”
ঢাকা-১২ আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, “দেশের মানুষ একটি আতঙ্কিত পরিবেশের মধ্যে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এখনো অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার কর হয়নি। ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের বিভিন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, “থানায় জিডি করার পর শরীফ ওসমান হাদিকে খুন হতে হয়েছে। এখনো খুনিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাই শুধু প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিলে হবে না, ১৮ কোটি মানুষকে নিরাপত্তা দিতে হবে।”
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইরান বলেন, “কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। বড় দলগুলোকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে। তফসিল ঘোষণা হলেও বড় দলগুলো প্ল্যাকার্ড পোস্টার বিলবোর্ড এখনো নামায়নি, সেগুলো ঝুলছে। নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখনও পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি।”
শেষ দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন প্রার্থীরা। তবে প্রার্থীদের কেউ কেউ আচরণবিধি মানেননি। তারা দলবল নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেছেন।
ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব যখন মনোনয়ন জমা দিতে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এলেন, তখন তার সঙ্গে বহু নেতাকর্মী ছিলেন। অবশ্য পরে তিনি কয়েকজনকে নিয়ে রিটার্নি কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
তার সঙ্গে আসা মুগদা থানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুমা খান আরও বেশ কয়েকজন নেত্রীকে নিয়ে প্রার্থীর অপেক্ষায় ছিলেন। সুমা খান বলেন, “আমরা হাবিবুর রহমান হাবিব ভাইয়ের পক্ষে এসেছি। উনারা জমা দিতে গেছেন।”
এতজন একসঙ্গে আসায় আচরণ বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি-না প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “উনি আমাদের নিয়ে আসেননি। আমরা উনাকে ভালোবাসি তাই ভালোবাসা থেকে এসেছি।”
ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মমতাজী, ঢাকা ১৪ আসনের প্রার্থী আবু ইউসুফ, ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। দুপুরে দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কক্ষের সামনে জড়ো হয়ে থাকতে দেখা যায়। যদিও তারা কার সঙ্গে এসেছেন সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
পুরনো খবর
দলবেঁধে মনোনয়নপত্র জমা দিচ্ছেন চট্টগ্রামের প্রার্থীরা
ভোট: বেশিরভাগ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেবেন সোমবার
বগুড়া-ফেনীতে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা, 'বিকল্পও' আছে
শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমার হিড়িক, ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ প্রত্যাশা