Published : 09 Aug 2025, 11:50 AM
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদের ভাই জি এম কাদেরকে সরিয়ে রেখেই জাতীয় সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন দলটির নেতারা।
কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর গুলশানের ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে দলের দশম সম্মেলন শুরু হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো নেতাকর্মী মিলনায়তন প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। ব্যান্ড পার্টির বাদ্যের তালে তারা সম্মেলনস্থলে যোগ দেন।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন প্রবীণ নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত আছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, দলের কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, রওশনপন্থি জাতীয় পার্টির নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশিদ।
‘ঐক্যের ডাক’ দিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শুক্রবার বলেছিলেন, “এখানে (সম্মেলনে) ভাগাভাগির কোনো প্রশ্ন নাই। এটা এরশাদ সাহেবের ১২ নম্বর নিবন্ধিত জাতীয় পার্টির লাঙ্গল মার্কার সম্মেলন।”
গত ৭ জুলাই সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুসহ দলের ১০ নেতাকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
পরে অব্যাহতি পাওয়া নেতারা আদালতের দ্বারস্থ হলে ৩১ জুলাই জি এম কাদের এবং যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলমের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত।

গত মঙ্গলবার জি এম কাদেরের অব্যাহতি দেওয়া দপ্তর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পার্টির কো চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার কথা বলা হয়।
এর তিন দিনের মাথায় শুক্রবার গুলশান অ্যাভেনিউয়ের হাওলাদার টাওয়ারের হলরুমে সাংবাদিকদের সামনে এক মঞ্চে এসে জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণা দেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মুজিবুল হক চুন্নু।
সেখানে বলা হয়, তারা আদালতের নির্দেশে দলের পদে বহাল হয়েছেন এবং তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া জি এম কাদের দলীয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন।
চুন্নু সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বলেছিলেন, দলকে সাংগঠনিক স্থবিরতা থেকে ‘মুক্ত করতে’ মঙ্গলবার প্রেসিডিয়াম সভায় অতি দ্রুত এই জাতীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যে জাতীয় পার্টি নিয়ে সম্প্রতি ‘বিভ্রান্তি’ তৈরি হয়েছিল, সেই দল সম্মেলনের মাধ্যমে ‘দায়িত্বশীলতা, শৃঙ্খলা ও ঐক্যের’ বার্তা নিয়ে দেশবাসীর সামনে ‘নতুন করে আত্মপ্রকাশ করছে’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
চুন্নুর ভাষ্য, তাদের এ সম্মেলন হবে ‘আত্মশুদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পুনর্গঠনের’ সম্মেলন।

ইতোমধ্যে রওশন এরশাদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছিলেন, তারাও কাউন্সিলে থাকবেন।
“আশা করি কাউন্সিলের পরে আমরা মিলিত হয়ে যাব। আরও দুই-তিনটা বিভেদ আছে ছোট ছোট, তাদেরকেও আমরা একীভূত করছি। বিভক্তি শেষ করে দিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টি করতে চাই।”
এর আগে ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির সম্মেলন হয়েছিল।
পূর্বাপর
সাবেক সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দলটি গতবছর আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর থেকেই বেকায়দায় আছে।
জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যের ‘পাপ’ থেকে দলকে মুক্ত করতে সম্প্রতি জি এম কাদেরকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর উদ্যোগ নিলে জাতীয় পার্টি ফের ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।

২৮ জুন চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় সম্মেলন দিন ঠিক করেছিলেন জি এম কাদের নেতৃত্বাধীন দলটি। কিন্তু শেষমেষ সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়, ওই তারিখে প্রধান উপদেষ্টার কর্মসূচি থাকায় অনুমতি দেওয়া যাবে না। এরপর জি এম কাদের সম্মেলন স্থগিত করে দেন।
এর আগেই জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জেলা পর্যায়ে নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। মহাসচিব চুন্নুও ছিলেন তাদের সঙ্গে।
বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে যেসব দল গঠিত হয়েছে, তাদের শীর্ষ নেতাদেরও এক মঞ্চে এনে ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তারা। সেজন্য এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন অংশের নেতাদের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করেন।
বিরোধীদের সম্মেলনের পাল্টায় নিজের শক্তির জানান দিতে ২৮ জুন দলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়ে বসেন জি এম কাদের।
তবে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই পিছু হটে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্মেলন বা মহাসমাবেশ কোনোটিই হয়নি। এরপরই তিন নেতাকে অব্যাহতি এবং তাদের আদালতে দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে।

পার্টির কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে একটি চালু ধারণা হল, বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনাতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জি এম কাদেরের ভূমিকা নিয়ে যেহেতু নানা প্রশ্ন রয়েছে, সেজন্য পার্টির ভেতরে যৌথ নেতৃত্ব সৃষ্টি করে পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। সেজন্য পুরনো ও নিষ্ক্রিয় নেতাদেরকে যুক্ত করতে হবে।
মূলত ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ তকমা থেকে জাতীয় পার্টিকে বের করে আনার জন্য কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজনে জোর দিচ্ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এ বি এম রুহুল আমিন তালুকদাররা।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সে সময় স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, জি এম কাদের ‘একাই সবকিছু’ করতে চান। এর পরিবর্তন চান তারা।
“মেইন জিনিস হচ্ছে একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র। আমরা পার্টি থেকে সেটা সরাতে চাই। পার্টিতে যদি স্বৈরতন্ত্র থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের কথা বলে তো লাভ নাই,” বলেছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
জি এম কাদেরকে বাদ দিয়ে জাতীয় পার্টির নতুন নেতৃত্ব গঠনের একটি প্রক্রিয়া যে শুরু হয়েছে, সেটা তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন।
গত ২০ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেছিলেন, “জাতীয় পার্টিকে বাদ দিতে পারছে না। কাজেই জি এম কাদের মাইনাস হয়ে জাতীয় পার্টি– সেটা হল সরকারের পলিসি টু কাম কামিং ইলেকশন।
“বিএনপি-জামায়াত ওরা আওয়ামী লীগকে থাকতে দেবে না। আর জাতীয় পার্টিকেও বাদ দিতে চাচ্ছিল, কিন্তু যেহেতু পারছে না, সেহেতু জি এম কাদের মাইনাস, সেটা তারা চায়। কাউন্সিল করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিলে লাঙ্গলও পাবে, এটা তারা বলে বেড়াচ্ছে।”

নব্বইয়ের গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর প্রথমবারের মতো শামসুল হুদা চৌধুরী ও এম এ মতিনের নেতৃত্বে ভাঙন ধরে জাতীয় পার্টিতে। আলাদা হয়ে যাওয়া অংশটি এখন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন) নামে সক্রিয়।
১৯৯৭ সালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফা ভাঙন হয়। তাদের নেতৃত্বাধীন দলটির নাম জাতীয় পার্টি (জেপি)।
২০০১ সালে নাজিউর রহমানের নেতৃত্বে তৃতীয় দফা ভাঙন, তখন মতিন তার সঙ্গে যোগ দেন। তবে পরে মতিন আলাদা হয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন) নামে সক্রিয় হন।
অন্যদিকে নাজির রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বে আছে তার ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থ।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্বে জাপায় চতুর্থবারের মত ভাঙে জাতীয় পার্টি।
এরশাদ মারা যাওয়ার পর ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে সবশেষ জাতীয় পার্টির একটি অংশ ভাগ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
'ঐক্যের ডাক' দিয়ে সম্মেলনের ঘোষণা আনিসুল-হাওলাদার-চুন্নুর
জাপায় জি এম কাদেরের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা, পদে ফিরছেন আনিসুল, চুন
জাতীয় পার্টির 'অস্তিত্ব রক্ষায়' ঐক্যের আহ্বান মামুনূর রশিদের