Published : 16 Aug 2025, 10:08 PM
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এর খসড়া চূড়ান্ত করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলার মধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
বিদ্যমান সংবিধান বাতিলের দাবি জানিয়ে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতিগুলো চলছে, আমরা এনসিপি জনগণকে সংগঠিত করে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নতুন একটি সংবিধানের জন্য মাঠে নামছি এবং বাংলাদেশে যদি কোনো নির্বাচন হয়, আগে গণপরিষদ নির্বাচন হতে হবে।”
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলের নেতারা এই দাবি তুলে ধরেন।
এদিনই জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করে তা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানোর কথা জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এতে এ সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণপরিষদ নির্বাচন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেনও বক্তব্য রাখেন।
আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারির এই নেতারা নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি তুলে ধরেন।
গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতারা প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে মূল ধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
এরপর তাদের নেতৃত্বে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি আত্মপ্রকাশ ঘটে, সেদিন নতুন সংবিধান প্রণয়ন, ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরে দলটি।
সে লক্ষ্য ধরে নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচন দাবি করে আসছে এনসিপি।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে গেল ৫ অগাস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন।
পরদিন প্রধান উদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ভোটের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।
এ সপ্তাহেই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
এমন প্রেক্ষাপটে শনিবারের আলোচনা সভায় গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি তুলে ধরে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “গণঅভ্যত্থানে যারা শহীদ হয়েছিল, যারা আহত হয়েছিল, তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য আমাদের একটি নতুন সংবিধান প্রয়োজন৷
“এখন ঘোষণাপত্র হয়েছে, ঘোষণাপত্র লন্ডনে গিয়েছে। এই যে আমাদের নোবেল লরিয়েট ইউনূস স্যার, বাংলাদেশের মানুষ ওনার চোখে পড়ে না, ওনার লন্ডন যেতে হয়। লন্ডনে গিয়ে সিজদা দিয়েছেন। সিজদা দিয়ে ওহির মাধ্যমে আদেশ পেয়েছেন৷ সেটা একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে হবে। কোন নির্বাচন? এ সংবিধানের অধীনে।
“তো আপনার সিজদাটা ঠিক হয় নাই। আপনার সিজদা দিতে হবে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি। কারণ, জনগণ আপনাকে বসিয়েছেন, সে সিজদার মাধ্যমে আপনি সঠিক দিকনির্দেশনা পাবেন।”
এর আগে ১২ অগাস্ট ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না বলে মন্তব্য করেন এনসিপির এই নেতা।

এর ব্যাখ্যায় সেদিন তিনি বলেছিলেন, “যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়, আমার যে ভাইয়েরা শহীদ হয়েছিল, রক্ত দিয়েছিল সংস্কারের জন্য, তাহলে কবরে গিয়ে তার লাশটা ফেরত দিতে হবে এই সরকারকে।
“আমার যে ভাইয়ের হাতটা চলে গিয়েছিল, যদি সংস্কার কাজ শেষ না করে নির্বাচন হয়, তাহলে এই সরকারকে আমার ভাইয়ের হাতটা ফিরিয়ে দিতে হবে৷ যে মায়ের বুক খালি হয়েছিল, ওই মায়ের বুকের সন্তানকে ফেরত দিতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নতুন করে সংবিধান লেখার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাসীরুদ্দীন বলেন, “দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার নামে ওই সময় সরকার গঠন হয়েছিল। দেশ যদি এখন স্থিতিশীল হয়, আপনি যদি মনে করেন নির্বাচন দেবেন। তাহলে আমরাও যদি মনে করি, দেশ যদি স্থিতিশীল হয়, তাহলে আমাদেরও একটি সংবিধান আপনি দিয়ে দেন।
“যদি দিয়ে দিতে না পারেন, তাহলে আপনারও বৈধতা থাকবে না। কারণ আপনি যেই সংবিধানের ১০৬ এর মাধ্যমে আছেন, আপনার বৈধতা খুঁজে পেতে আপনার অনেক কষ্ট হবে।”
ঐকমত্য কমিশনের সময় বাড়ানোর দরকার নেই দাবি করে এ এনসিপি নেতা বলেন, “আমাদের কাছে সমাধান আছে। জুলাই সনদের যে প্রস্তাব এসেছে তা বাস্তবায়ন করে গণপরিষদ নির্বাচন হোক। ইউনুস সরকার জনগণকে নিয়ে জুলাই সনদ না দেওয়ার মাধ্যমে গাদ্দারি, বেঈমানি করেছে।”
নতুন করে সংবিধান লেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশে কখনও বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চা হয়নি মন্তব্য করে নাসীরুদ্দীন।
তিনি বলেন, “এক একটি রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় যায় তখন এই সংবিধানের অধীনে জনগণের উপরে যত ধরনের অত্যাচার করা প্রয়োজন সেই অত্যাচার করে। যখন জনগণ সংগ্রাম করে তারা পালিয়ে যায়, দেশে বিরোধী দলের কোনো স্পেস থাকে না।
“বাংলাদেশের যে সরকারই এসেছে এবং এই সংবিধানের অধীনে দেশ চালিয়েছে, তারা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কেউ দিল্লিতে পালিয়েছেন, কেউ লন্ডনে পালিয়েছেন, কেউ ইউএসএ পালিয়েছেন। এগুলোর ইতিহাস তো আমরা যা আপনারা জানেন, নতুন কোনো কিছু না।”
‘ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নির্বাচনে যেতে হবে’
অনুষ্ঠানে আগের ব্যবস্থার নানা নেতিবাচক দিক তুলে ধরে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “এখন আপনারা যদি বলেন এই ব্যবস্থা পরিবর্তন না করে আমরা আবার একটা নির্বাচনের দিকে যাব, সেটা অসম্ভব।”
নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে আমার সমস্যা নাই। নির্বাচন নভেম্বর হোক, ডিসেম্বরে হোক, জানুয়ারিতে হোক, কিচ্ছু আসে যায় না, ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচন যত দ্রুত হোক আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু অবশ্যই সেটা গণপরিষদ নির্বাচন হতে হবে।”
বর্তমান সংবিধানকে ‘ফ্যাসিবাদের পাঠ্যবই’ আখ্যায়িত করে তা ফাংশন করেনি বলে দাবি করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, “আসন দিয়ে আমাদের কিনতে পারবেন না। আসন দিয়ে কেনা সম্ভব না, আমরা বিক্রি হতে আসি নাই। চরিত্র হনন করেও আমাদের কিনতে পারবে না।”
সভায় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জহুরুল ইসলাম, আরিফ সোহেল ও ফরিদুল হকও বক্তব্য দেন।