Published : 28 Sep 2025, 01:39 AM
বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা দেশের বাইরে গেলেই ছুটে আসেন বিদেশ শাখার নেতাকর্মীরা। ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল বা জোটে থাকা শীর্ষ নেতাদের যেমন স্বাগত জানাতে দেখা যায়, তেমনই বিক্ষোভের চিত্রও থাকে।
সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হয়ে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা নিউ ইয়র্কে পৌঁছালে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নিবন্ধিত দলের দেশের বাইরে শাখা, কমিটি পরিচালনার সুযোগই নেই।
২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা চালুর হলেও প্রবাসী শাখা পরিচালনার বিষয়টি তদারকির কোনো উদ্যোগ নেয়নি নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলছেন, “আরপিও-তে ২০০৮ সালে বিধানটি যুক্ত করার পর থেকে এর কোনো বাস্তবায়ন নেই। বিদেশ শাখা রয়েছে কি না- মনিটরিংয়ের কাজটা কঠিন।
“বিধান রাখলে তদারকি করতে হবে, বাস্তবায়ন করা না গেলে (বিধান) বাদ দিতে হবে। দলগুলোর সাথে আলোচনা করে ঐকমত্য হওয়া দরকার।”
এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত দল রয়েছে অর্ধশতাধিক। এসব দল ‘নিবন্ধন শর্ত’ যথাযথভাবে পালন করছে কি না সেটা যাচাইয়ের সুযোগই পায়নি বর্তমান ইসি; বরং নতুন দল নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সারতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বুধবার বলেন, “আমরা নির্বাচনের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছি….এ মুহূর্তে এ নিয়ে (বিদেশ শাখা) মন্তব্য না করি। বিষয়টি নজরে এলে আমরা দেখব।
“সামনে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে, সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কমিশন আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।”
>>আরপিও অনুযায়ী, নিবন্ধিত হতে হলে স্বাধীনতার পর একটি আসন লাগবে অথবা ৫% ভোট পেতে হবে অথবা কেন্দ্রীয়, দেশের এক তৃতীয়াংশ জেলা, ন্যূনতম একশ উপজেলা কমিটি, অফিসসহ দুইশ করে ভোটারের সমর্থন তালিকা লাগবে।
>>এর বাইরে দলীয় গঠনতন্ত্রে নির্বাচিত কমিটির পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সব স্তরে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব পূরণের প্রতিশ্রতি দিতে হবে।
>>শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিয়ে, বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী-শ্রমিকদের বা অন্য কোনো পেশার সদস্যদের নিয়ে সহযোগী বা অঙ্গসংগঠনে করার প্রশ্নে দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
>>দল নিবন্ধনে অযোগ্যতার মধ্যে গঠনতন্ত্র সংবিধান পরিপন্থি, দল নিষিদ্ধসহ সাতটি বিষয় রয়েছে। আরপিও’র ৯০ গ (১) (ঙ)-এ বলা হয়েছে- গঠনতন্ত্রে দেশের ভৌগলিক সীমার বাইরে কোনো অফিস, শাখা বা কমিটি গঠন বা পরিচালনার বিধান থাকলে নিবন্ধন অযোগ্য হবে।
নিবন্ধন প্রথা চালুর পর দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা, ছাত্র সংগঠন না রাখা, মাঠ পর্যায়ের অফিস-কমিটি যাচাই, ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব অগ্রগতি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য চাইলেও প্রবাসী শাখার বিষয়ে কোনো ইসিই সরব হয়নি।


এবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য চালু হচ্ছে প্রযুক্তি সহায়ক পোস্টাল ভোটিং। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণঅয় প্রবাসী কমিউনিটিসহ দল ও প্রবাসীদের সহায়তা চাইছে ইসি। প্রথমবারের মতো আচরণবিধিতে প্রবাসীদেরকে প্রার্থীর ভোটের প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।
একদিকে প্রবাসে ভোটিং সুবিধা চালু রাখা, অন্যদিকে দলের শাখা রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ- এই দুই সিদ্ধান্তকে সাংঘর্ষিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে ইসির তদারকিহীন বিধান আইনে রাখাও অর্থহীন বলে মনে করছেন তারা।
‘প্রবাসে শাখা চালায় সব দলই’
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির রয়েছে ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স। নিবন্ধন প্রত্যাশী দলটি বেশ কয়েকটি দেশে তাদের শাখা কমিটি ঘোষণা করেছে।
জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, “আরপিও’র প্রভিশনগুলো আমরা দেখেছি। নির্বাচনি আইনে বলা রয়েছে- গঠনতন্ত্রে প্রবাসী শাখা, কমিটির পরিচালনার বিধান রাখতে পারবে না বলা হয়েছে।
“এখানে একটু টেকনিকালিটি রয়েছে। কোনো দলের গঠনতন্ত্রে প্রবাসী শাখা নেই, থাকলে নিবন্ধন চলে যেতো। কিন্তু প্রবাসে ব্রাঞ্চ সব দলই চালায়।”
গঠনতন্ত্রে না থাকলেও ‘আন-অফিসিয়ালি’ সব দল প্রবাসে কমিটিগুলো করে থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সদস্য সচিব আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, “এক্ষেত্রে সরাসরি আইনের ব্যত্যয় বলে অ্যাকিউজ করাটা মুশকিল। আরপিও’র বিধানে রয়েছে, গঠনতন্ত্রে থাকতে পারবে না প্রবাস শাখা। প্রবাস শাখা, কমিটি রাখা এ বিধানটার সাথে সাংঘর্ষিক বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।”
তিনি বলেন, দলের অনুদান দিয়ে থাকে প্রবাস শাখার অনেকেই। প্রবাস শাখা নিয়ে আরপিও’র বিধানটির যৌক্তিকতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে উপস্থাপন করা হবে।
“ইসির সংলাপে আমরা এসব তুলব। এখন মূল ফোকাস আমাদের নিবন্ধন নিয়ে। নিবন্ধনের পর ইসির সংলাপে যাব আমরা এবং সব আইন-বিধি নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হবে।”
‘তদারকি কঠিন, অর্থহীন বিধান’
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, বিদেশ শাখার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এর কার্যকারিতা নেই। বিদেশ শাখা রয়েছে কি না তা মনিটরিং করা কঠিন। বিধান রাখলে তদারকি করতে হবে, বাস্তবায়ন করা না গেলে বাদ দিতে হবে। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্য হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ দলগুলোর প্রধানরা বা জ্যেষ্ঠ কোনো নেতা যুক্তরাষ্ট্র বা কোন দেশে গেলে, তখন দলের বিদেশ শাখার নেতারা স্বাগত জানিয়েছেন, মিছিল করেছেন। আবার বিরোধী যারা, তারা বিপক্ষে মানববন্ধন, মিছিল, সমাবেশ করেছেন।
“এসব বাংলাদেশি কালচার। প্রবাসে আমরা (দলের শাখার লোকজন) মারামারি করি, ডিম নিক্ষেপ করি, জুতা নিক্ষেপ করি; দেশের সুনামটা নষ্ট হয়।”
আব্দুল আলীম বলেন, “বাংলাদেশে কোনো ইউরোপিয়ান দলের শাখা নেই। প্রবাসে ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কার লোকজন থাকে; সেখানে তো তাদের দলের কোনো শাখা নেই।”
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এ সদস্য বলেন, “কিন্তু এসব কমিটি থাকার বিষয়ে ইলেকশন কমিশন সেই ২০০৮ সাল থেকেই কোনো রকম মনিটরিং, কোনো রকম পদক্ষেপ, কোনোরকম স্টেপ, অ্যাকশন কোনো কিছুই নেয়নি।
“এটা একটা আইনের কাগুজে ধারায় পরিণত হয়েছে। ফলে এটা অর্থহীন। একটা আইনের মধ্যে যদি কিছু একটা থাকে, সেটা যদি কোনো এনফোর্সমেন্ট না হয়- ওটার ভায়োলেশনের ক্ষেত্রে এবং কোনো কোনো মেজারস নে্রয়া না হয়, ওইটা একেবারে অর্থহীন। আরপিও এই ধারাটার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।”
আইনি ফাঁক গলে নতুন-পুরনো সব সবদলই বিদেশ শাখা না রাখার বিষয়টি উপেক্ষা করেছে বলে মনে করেন আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, “আজকে নতুন তা নয়। নতুন দলের যেমন এসব শাখা আছে, তেমনই পুরনো পলিটিক্যাল পার্টির তো আছেই। ইলেকশন কমিশনের এটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
“…প্রবাস শাখা মনিটরিংয়ের কাজটাও কঠিন। ইসিকে তো পত্রপত্রিকা দেখে করতে হবে, অন্তত পক্ষে সতর্ক করতে পারতো।”
তবে প্রবাসে আচরণবিধি কিংবা কোনো বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি না তা তদারকি যে কঠিন তা মানছেন আব্দুল আলীম।
“এটা খুব কঠিন একটা কাজ। কারণ দেশের বাইরে তো ইলেকশন কমিশন নেই, ইসির পর্যবেক্ষক নেই নির্বাচন দেখার জন্য। কাজেই এটা তো আসলে অসম্ভব। কোড অব কন্ডাক্টের মধ্যে থাকা মানে একটা জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট থাকবে; আমরা বাইরে কোনো ঝামেলা করব না।”
আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচন কমিশন এবার আচরণবিধি অনুসরণে প্রার্থী ও দলগুলোর কাছে অঙ্গীকারনামাও নেবে। প্রবাসে পোস্টাল ভোটিং চালু হচ্ছে, তারা ভোট দেবে; আবার প্রবাসে দলের শাখাও রাখা যাবে না— এটা যে সাংঘর্ষিক তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
“এখন এটাকে হয় ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে; যদি মনিটরিং করতে না পারি তা হলে বাদ দিতে হবে। সামনে ইসির সঙ্গে দলের ডায়ালগ হবে, সেখানে আলোচনা করে ঐকমত্যে আসতে হবে বিধানটি রাখবে নাকি রাখবে না। এ বিধানটির বিষয়টি ইসির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা উচিত।”
করণীয় নিয়ে আলোচনা করবে ইসি
একদিকে আরপিও বিধি উপেক্ষা করে নিবন্ধিত দলের বিদেশ শাখার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে; অন্যদিকে প্রার্থীর পক্ষে প্রবাসীদের প্রচারে আচরণবিধিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরমধ্যে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হচ্ছে।
পোস্টাল ভোটিং ও এনআইডি সেবা চালুর করতে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারা বিদেশে যাচ্ছেন। মত বিনিময় সভায় প্রবাসী কমিউনিটি প্রতিনিধিরা থাকছেন। আর সেই কমিউনিটির অংশ হিসেবে দলীয় লোকজনও থাকছেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করা এক বিষয়। আর ইনডিভিজুয়াল ভোট দেওয়া বা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া আলাদা বিষয়।”
নিবন্ধিত দলের প্রবাসে কোনো শাখা থাকা যাবে না বলে যে বিধান রয়েছে, তা তদারকি না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এ মুহূর্তে এ নিয়ে মন্তব্য না করি। বিষয়টি নজরে এলে আমরা দেখব।
সামনে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে, সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কমিশন আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।”
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, অননুমোদিত অঙ্গ সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন বা আরপিও লঙ্ঘন বা দল গঠনতন্ত্র অনুসরণ করছে কি না—এসব বিষয়ে নির্বাচনের আগে কোনো পদক্ষেপে যেতে চায় না ইসি। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। ইসি সব সময় দলগুলোকে সহায়তা করতে চায়।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “আমরা পুরোদমে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং প্রস্তুত।…আইন, বিধি সংস্কার হচ্ছে এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী আমরা।”
আরও পড়ুন:
নিউ ইয়র্কে নেমে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে ফখরুলরা, আখতার
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কমিটি পেল আওয়ামী লীগের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল
নিউ ইয়র্কের পশ্চিমাঞ্চলে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি
ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফর: একদিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি, আরেক
নিবন্ধন: দলের কমিটি ও অফিসের খোঁজে মাঠে নামছে ইসি
ইসিতে গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে জাতীয় পার্টি
বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধন 'সাংঘর্ষিক'