মঈনুল হক চৌধুরী
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক
ঢাকা, জানুয়ারি ২৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)---বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক রয়ে গেছে জানিয়ে তা সংশোধনের জন্যে দলটিকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা কমিটির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে বলা হলেও জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র এখনো সংবিধান পরিপন্থিই রয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, "গত বছর ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগেই যেসব ধারা সংশোধন করতে জামায়াতকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সেসব বহাল রেখে ২০০৯ সালে সম্মেলন করে ২৩ জুলাই ইসিতে স্থায়ী গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে তারা।"
নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ইতোমধ্যে ৩৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের স্থায়ী গঠনতন্ত্র পেয়েছি আমরা। এগুলো পর্যালোচনা চলছে। যাদের গঠনতন্ত্র সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে-তাদের তা সংশোধনের জন্য অনুরোধ জানানো হবে।"
তিনি জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তা গৃহীত হবে না। একই সঙ্গে স্থায়ী গঠনতন্ত্র গৃহীত হলেই সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে 'ধন্যবাদ জ্ঞাপন' করে চিঠিও দেওয়া হচ্ছে।
রোববার স্থায়ী গঠনতন্ত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত ৩৮টি দল স্থায়ী গঠনতন্ত্র জমা দিলেও ফ্রিডম পার্টি তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল হচ্ছে দলটির নিবন্ধন।
রোববার জামায়াতসহ আরো ৮টি দলকে গঠনতন্ত্রে ছোটখাটো ত্র"টি দূর করতে বলে ইসি সচিবালয়ের আইন শাখা চিঠি পাঠায়।
ইসি সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি সচিব সাবেদ-উর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, রোববার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) কে গঠনতন্ত্র গৃহীত হওয়ায় ধন্যবাদপত্র দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও বিকল্পধারাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে নিবন্ধন আইনের পরিপন্থী ত্র"টি সংশোধনের জন্য।
এর আগে আওয়ামী লীগকেও ছাত্র-প্রবাসী সংগঠনের বিষয়ে গণতন্ত্র সংশোধনে চিঠি দেয় ইসি। পরে সংশোধিত গঠনতন্ত্র গৃহীত হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলটিকে এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকেও ধন্যবাদ পত্র দেয় ইসি।
দলের সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিব বরাবর এসব চিঠি পাঠানো হয়।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রে যত আপত্তি
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, জামায়াতের সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ২ ধারার ৫ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, 'আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, ... কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না ... আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারো আসলেই নেই।'
ইসির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা কমিটির মতে, এ ধারার মাধ্যমে জনগণের রায়ে নির্বাচিত সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।
গঠনতন্ত্রের ৫ ধারার ৩ উপধারায় জামায়াতের দাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে, '... বাংলাদেশে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।'
কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশ গণতান্ত্রিক রীতিতে পরিচালিত হবে; এখানে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসনব্যবস্থা কায়েমের কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করে ইসি কমিটি।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, জামায়াতের গঠনতন্ত্রে অন্তত সাতটি ধারা রয়েছে-যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে বাকি দলগুলোর অধিকাংশেরই ২০২০ সালের মধ্যে কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে ছোটোখাটো ত্র"টি রয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তে বলা হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমূহ সংবিধানের পরিপন্থি হতে পারবে না। এছাড়া ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গ ভেদে কোনো বৈষম্য থাকতে পারবে না।
গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ইসির সঙ্গে জামায়াতের সংলাপে দলটি এ দুটি ধারাই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ থেকে বাতিল করার দাবি জানায়।
২০০৮ সালের ১৯ অক্টোবর ইসিতে নিবন্ধন আবেদন সংগ্রহ করতে গিয়ে জামায়াত নেতা এ্যাডভোকেট জসীমউদ্দিন সরকার বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান-সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে না জামায়াত।
তিনি বলেন, তাদের গঠনতন্ত্রে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিষয়টি 'ডিনাই' করা হয়নি। এটা বিশ্বাসের বিষয়। মুসলিম হিসাবে সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। রিজিওনাল সার্বভৌমত্বও এখানে রয়েছে। এটা কোনো সাংঘর্ষিক নয়।
এসময় নিবন্ধন পেতে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসরণে প্রয়োজনীয় সব সংশোধন সম্পন্ন করেছে বলে জানান তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএইচসি/জিএনএ/২৩০০ ঘ.