Published : 15 Jul 2026, 12:17 AM
জুলাই অভ্যুত্থান দমাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে।
বিরোধী দলের সদস্যরা বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, নতুন তদন্ত, প্রসিকিউশন দলের সক্ষমতা ও দেশজুড়ে হওয়া মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জবাবে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তদন্ত ও বিচার এগোচ্ছে; প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন, তদন্ত দল ও প্রয়োজনীয় জনবল আরও বাড়ানো হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ ধারা অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনায় এসব বক্তব্য আসে। রংপুর-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের নোটিসের ভিত্তিতে এ আলোচনা হয়।
নোটিসে সমর্থন দিয়েছিলেন নোয়াখালী-৬ আসনের আব্দুল হান্নান মাসউদ, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আব্দুল্লাহ আল আমিন, কুমিল্লা-৪ আসনের মো. আবুল হাসনাত, সংরক্ষিত নারী আসনের মাহমুদা আলম মিতু এবং নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি।
আলোচনায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি করেন। এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন আখতার হোসেন, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরসহ অন্য বক্তারা।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সংগঠন’ হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের তদন্ত চলছে এবং সরকার তা এগিয়ে নেবে।
‘নতুন তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই’
আলোচনা শুরু করে আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল তার প্রজন্মের দেখা ‘সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী’ ঘটনা।
আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ ও ওয়াসিমসহ নিহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, অনেক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন এবং বহু পরিবার এখনও স্বজন হারানোর যন্ত্রণা বহন করছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের কথা এসেছে দাবি করে আখতার বলেন, “আওয়ামী লীগ ঘটনাগুলো অস্বীকার করলেও ওই প্রতিবেদনকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে না।”
এনসিপির এই এমপি বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রসিকিউশন দল নতুন কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করতে পারেনি বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে ২৩ জন তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রায় ২০ জন প্রসিকিউটর থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শত শত অভিযোগের তুলনায় এ জনবল অপ্রতুল। বিচার দ্রুত করতে ট্রাইব্যুনাল, আদালত, তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
হাসানুল হক ইনুর একটি মামলায় তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও সাজা একইসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তা ১০ বছরে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে হতাশা প্রকাশ করেন আখতার। সরকারকে আপিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে বলেন তিনি।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি জানিয়ে আখতার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগে তদন্তের কথা বললেও তা ‘দৃশ্যমানভাবে এগোয়নি’। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
দেশের বিভিন্ন থানায় জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযোগপত্র না দেওয়ার অভিযোগ তুলে এনসিপির এই নেতা বলেন, তদন্ত শেষ করা এবং অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা উচিত।
জুলাই শহীদের মায়ের আবেদন
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেন, তিনি জুলাই আন্দোলনে নিহত জাবির ইব্রাহিমের মা। সন্তান হারানোর কষ্টে নিমজ্জিত থাকলেও সব শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধার জন্য কথা বলতে তিনি সংসদে দাঁড়িয়েছেন।
তার ভাষায়, “সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য নতুন প্রমাণের প্রয়োজন নেই; রাস্তায় থাকা মানুষ নিজের চোখে যা দেখেছেন, সেটিই যথেষ্ট।”
রোকেয়া বেগম প্রধানমন্ত্রীকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, হত্যার বিচার এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আরও ট্রাইব্যুনাল ও সাক্ষী সুরক্ষা চান মীর আহমদ বিন কাসেম
ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের কারণেই সংসদ আবার গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু শহীদদের প্রধান দাবি যে বিচার, তা ‘প্রত্যাশিত গতিতে’ এগোয়নি।
তার অভিযোগ, তদন্ত সংস্থা, ট্রাইব্যুনাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অর্থ ও জনবল সংকটে রয়েছে। শত শত অভিযোগ, হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি এবং বহু ঘণ্টার ভিডিও-অডিও বর্তমান সক্ষমতায় পর্যালোচনা করতে গেলে বিচার শেষ হতে ১০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
তিনি অন্তত দুটি নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন, দক্ষ প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, বিশেষ বরাদ্দ এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি কার্যদিবসে মামলা পরিচালনার কথা থাকলেও কোনো কোনো মামলার তারিখ এক থেকে দেড় মাস পরপর পড়ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানোর পাশাপাশি মীর আহমদ জুলাই জাদুঘরের ‘ইতিহাস বিকৃতির’ অভিযোগ তুলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং দ্রুত জাদুঘর খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব সংসদে দিতে বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ বিচার চান নুর
পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, “১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো শক্তি যেন ক্ষমতায় এসে গুম, খুন ও গণবিরোধী দমন-পীড়ন চালাতে না পারে, সে জন্য আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দরকার।”
তিনি বলেন, বিচারে যারা দোষী হবেন, তাদের সম্পদ ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত।
শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের আন্দোলন নয়, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদেরও রাষ্ট্রীয় তালিকা ও সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানান নুর।
জুলাইয়ে আহতদের অনেকে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় সুস্থ হতে পারেননি দাবি করে তিনি এর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও নিতে বলেন।
আওয়ামী লীগের বিচার এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ‘নীতিগত ঐকমত্যের’ আহ্বান জানান গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর।
নাহিদের দাবি, দল হিসেবেই বিচার করতে হবে
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, তরুণ, সাংবাদিক, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব অংশীজনকে স্মরণ করতে হবে।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেদিন রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ সারা দেশের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসে।
নাহিদের ভাষায়, ওই রাত থেকেই জুলাই আন্দোলন একটি রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৪ জুলাই ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন করা হয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বর্তমান সরকারকেও দিনটি স্মরণ করার আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘ডিজাইন’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনার অভিযোগ তুলে তিনি সরকারদলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের নিন্দা জানান।
নাহিদ বলেন, “যারা আন্দোলনের মাঠে ছিলেন না, তারা জানেন না কে কীভাবে আন্দোলনে এসেছেন, কে কখন নিহত হয়েছেন বা কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। যারা জানেন, তাদের কাছ থেকে ঘটনা জেনে নেওয়া উচিত।”
সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য টেলিভিশন আলোচনায় জুলাইয়ে নিহতদের সঙ্গে নিহত পুলিশ সদস্যদের তুলনা করছেন অভিযোগ করে নাহিদ বলেন, এটি “আওয়ামী লীগের বয়ান।”
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে বিরোধ বা তুলনা তৈরির ‘রাজনীতি হচ্ছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ৫ অগাস্টের পর ১ হাজার ৪৯৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি মামলা পর্যালোচনা করে ১৪টির বাদীর বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তার ভাষ্য, ২১টি মামলার আগে বা পরে আসামির কাছে অর্থ দাবি বা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বাকি ১৯টিতে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, পেশাগত কিংবা পারিবারিক বিরোধে মানুষকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, অনেক মামলায় প্রকৃত হত্যাকারীর পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ থাকা সাধারণ ব্যক্তি ও বিএনপি নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব মামলা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল জানিয়ে নাহিদ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এর অগ্রগতি জানতে চান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে বর্তমান সরকার কেন সরিয়েছে, ‘তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি’ বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকটি মামলার রায় এলেও সেগুলোর প্রক্রিয়ার বড় অংশ আগের প্রসিকিউশন দল সম্পন্ন করেছিল। নতুন করে তিনটি মামলায় অভিযোগ গঠন হলেও সেগুলোর তদন্ত আগের দল শেষ করেছিল।
বর্তমান প্রসিকিউশন দল নতুন কোনো মামলার তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, তা আইনমন্ত্রীর কাছে জানতে চান নাহিদ।
“আমি যদি ভুল হয়ে থাকি, আমি খুশি হব। যদি দ্রুততার সঙ্গে এগোয়, এটা আমাদের সবার জন্যই সুখবর হবে,” বলেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো, দক্ষ বিচারক ও প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার পরিকল্পনা সংসদে জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জুলাই শহীদ ও আহতদের ভাতা, জাদুঘর এবং ট্রাইব্যুনালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার সেগুলো অব্যাহত রাখায় ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে উদ্যোগগুলো পর্যাপ্ত নয়।”
নাহিদ বলেন, “আমরা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার চাই। যে দল ইতিহাসে দুই দুইবার সুযোগ পেয়ে এ দেশে গণহত্যা করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে ও লুটপাট করেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সেই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে।”
শেখ হাসিনার মামলায় নিজে সাক্ষী হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি রায় কার্যকর করতে দিল্লির সঙ্গে দ্রুত কার্যকর যোগাযোগের আহ্বান জানান।
আইনমন্ত্রীর পাল্টা তথ্য
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এবং সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি মাইলফলক।
বিচার কার্যক্রম নিয়ে ‘ভুল ও অসত্য তথ্য’ দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬টি তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১২টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে এবং চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত তিনটি মামলার রায় হওয়ার তথ্য দিয়ে এর মধ্যে আবু সাঈদ হত্যা এবং হাসানুল হক ইনুর মামলার কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
শাপলা চত্বরের ‘হত্যাকাণ্ড’ এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদের সংগঠন’ হিসেবে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। জুলাইয়ে সারা দেশের জেলাগুলোতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়েও তদন্ত করার পরিকল্পনার কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মোট ৫৯০টি অভিযোগ জমা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসিকিউশন দল সেখান থেকে ১০৯টি মামলা বাছাই করেছিল।
এর মধ্যে ৪৩টি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে, ছয়টির বিচার শেষ হয়েছে, ২৬টি বিচারাধীন এবং চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে তিনি তথ্য্য দেন।
তার দেওয়া হিসাবে, এসব মামলায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। একজন রাজসাক্ষী খালাস পেয়েছেন।
দেশের বাইরে থেকে আত্মসমর্পণের কথা বলা দণ্ডিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, “তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই; বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার করা হবে।”
‘গড়িমসি মেনে নেবে না জাতি’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাই ছিল সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলনের ফল। তাই শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিন নয়, এর আগের সময়ে গুম, খুন, পঙ্গুত্ব ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরও ভুলে গেলে চলবে না।”
বর্তমানে অনেক আহত জুলাই যোদ্ধা চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন দাবি করে তিনি সরকারকে তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
জুলাই জাদুঘরের কিছু কাজ বাকি থাকলেও তা খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, সংস্কার ও সংযোজন পরে চলতে পারে। জুলাই ফাউন্ডেশনকেও আরও কার্যকর করতে হবে।
“বিচারের ব্যাপারে কোনো গড়িমসি এই জাতি সহ্য করবে না। বিচার হতেই হবে। তবে কারও ওপর যেন অবিচার না হয়; বিচারটা যেন ন্যায়বিচারই হয়।”
১৭ বছরের আন্দোলনে ত্যাগ স্বীকারকারী জুলাই শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিতে প্রয়োজনে সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর প্রস্তাব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শাফিকুর।
দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য দিতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশের প্রসঙ্গও তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
গণভোটে সংস্কারের পক্ষে দেওয়া মানুষের রায়কে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জনগণ তাদের ভোটের মূল্যায়ন দেখতে না পেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা ছাত্রসংগঠনের কৃতিত্ব নয়; বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটি সংঘটিত করেছে।
তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র, জুলাই জাতীয় সনদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আইনগত দায়মুক্তি, মৌলিক অধিকার, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেটি আইনে পরিণত করা হয়েছে।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আইন সংশোধনের প্রস্তাব উঠলেও তখন তা পাস হয়নি।
পরে আন্দোলন এবং রাজনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আইন সংশোধন করা হয় দাবি করে তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি তোলা হয়েছিল।
সরকারদলীয় কোনো সদস্য সংসদে জুলাই শহীদদের সঙ্গে নিহত পুলিশ সদস্যদের তুলনা করেননি দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদের বাইরে দেওয়া কোনো বক্তব্য সংসদের আলোচনায় আনা প্রাসঙ্গিক নয়।
তিনি বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। গণভোটের রায় কার্যকর করতে হলে সংসদীয় প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
৫ অগাস্ট খুলবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ৫ অগাস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেটি উদ্বোধন করবেন।
তিনি বলেন, প্রত্যেক জুলাই শহীদের পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিন শ্রেণিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের ৫ লাখ, মধ্যম পর্যায়ের আহতদের ৩ লাখ এবং অন্য শ্রেণির আহতদের ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
শহীদ পরিবার ও গুরুতর আহতদের মাসিক ২০ হাজার টাকা, অন্য দুই শ্রেণির আহতদের যথাক্রমে ১৫ হাজার ও ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী ভাতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আহত জুলাই যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠানো হবে এবং জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বজায় রেখে আরও বিস্তৃত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার পর্যন্ত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাগাদা দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে গ্রেপ্তার হবেন এবং আদালতের প্রক্রিয়া অনুযায়ী রায় কার্যকর হবে।”
সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরানোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হলে সরকার তিন দিনের মধ্যে তা পাঠিয়েছে বলেও তথ্য দেন মন্ত্রী।
আরেক মামলার তিনজন পলাতক আসামিকে প্রতিবেশী দেশ থেকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।
প্রয়োজনে বাড়বে ট্রাইব্যুনাল
ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবির জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি ট্রাইব্যুনাল থেকে দুটি করতে রাজনৈতিকভাবে চাপ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজন হলে এখন ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন, তদন্ত দল ও প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল আরও বাড়ানো হবে।
জুলাইয়ে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার জাতিসংঘের তথ্যে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের সবার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার ৮৪৩ জন শহীদকে গেজেটভুক্ত করেছে। শহীদসহ বিভিন্ন শ্রেণির আহত মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার ২১২ জনের তালিকা রয়েছে।
শহীদদের মধ্যে ৮২৯ জনের ঘটনায় থানায় ৭৫১টি মামলা, একটি অপমৃত্যুর মামলা, ৩৩টি সিআর মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪৮টি মামলা রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দল হিসেবে বিচারের তদন্ত চলমান রয়েছে। জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের করা মামলাসহ সরকারপক্ষের সব মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।