দুই পক্ষই অনড়, আসছে ‘গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহ'

ভোটের প্রস্তুতি জানাতে রাষ্ট্রপতির কাছে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এরপর তফসিল নিয়ে সিদ্ধান্ত।

বিশেষ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Nov 2023, 07:53 PM
Updated : 4 Nov 2023, 07:53 PM

এক দিনের হরতালের পর তিন দিনের অবরোধ; সেই রেশ না কাটতেই সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিন পর আবার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ। কর্মসূচি আরও বাড়িয়ে চলার ইঙ্গিত সরকারবিরোধীদের।

এর মধ্যেই ফিরে এসেছে এক দশক আগের স্মৃতি। সহিংসতাময় সেই সময়ে নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত দেশের মানুষের কাটত উদ্বেগ- উৎকণ্ঠায়।

এবারও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে সংঘাতের দামামা; জীবন জীবিকার কী হবে, স্কুলে সমাপনী পরীক্ষা কীভাবে চলবে, নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে কি না- এ নিয়ে জনমনে প্রশ্নের নেই শেষ। কিন্তু দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এক চুল ছাড় দিচ্ছে না, সমঝোতার আহ্বানে নেই কোনো সাড়া।

এর মধ্যেই শনিবার ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংলাপে বসেছে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। আগের মতই সাড়া দেয়নি সরকার পতনের ‘এক দফা’ আন্দোলনে থাকা বিএনপি ও সমমনা দলগুলো।

নির্বাচন ঘিরে পরস্পরবিরোধী দলগুলোর এমন দৃশ্যমান দূরত্বের মধ্যেই কমিশন তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় গুটিয়ে এনেছে। মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই জানা যেতে পারে ভোটের তারিখ। এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী সপ্তাহ; যার আগে রোববার থেকে আবারও অবরোধের মুখে পড়ছে দেশ। 

তবে এখনও রাজনৈতিক সমঝোতার আশায় ইসি। কিন্তু দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এ বিভেদ মিটিয়ে আনার নেই ন্যূনতম ইঙ্গিত। সহিংস রাজনীতির শেষ কোথায়- অফিস, গণপরিবহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চায়ের আড্ডা সব জায়গায় একই প্রশ্ন।

বিএনপিসহ সমমনা জোটগুলো টানা তিন দিন অবরোধ কর্মসূচি শেষ করে রোববার থেকে আবার ৪৮ ঘণ্টার কর্মসূচি দিয়েছে। নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটি বাড়তে পারে আরও।

হরতাল ও অবরোধে প্রতিদিনই আগুনে পুড়েছে যানবাহন, হয়েছে প্রাণহানি; জীবনযাত্রা হয়েছে ব্যাহত, ‘ভাটার টানের মধ্যে’ থমকাতে শুরু করেছে অর্থনীতির চাকা।

Also Read: বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচন করতে হবে, সংবিধানে কোথাও লেখা নেই: আওয়ামী লীগ

Also Read: ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে ইসির আলোচনা শুরু, প্রথম ধাপে নেই ৯ দল

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “এক দফা দাবি বিএনপির শুধু নয়, জনগণের দাবি… দেশের মানুষ গত দুইটি নির্বাচনে ভোটদানের সুযোগ পায়নি, তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সে কারণে এবার সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি এক হয়েছে যে, আগামী নির্বাচন কোনোভাবেই ‘সাজানো’ নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।”

গত এক বছরের বেশি সময় ধরে রাজপথে সক্রিয় থেকে বিএনপি ‘চূড়ান্ত আন্দোলন’ শুরুর ঘোষণা দিচ্ছিল বারবার। সেই আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, বলছেন রিজভী।

তিনি বলেন, “এজন্য দেশের মানুষ এখন রাজপথে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরে যাবে না।… কঠোর কর্মসূচির টানা চলবে।”

তবে আগের মতই পাত্তা দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। তাদের বক্তব্য হল, বিএনপি ২০১৩ সালে পারেনি, ২০১৫ সালেও পারেনি। এবারও তাদের আন্দোলন সফল হওয়ার কোনো ‘কারণ নেই’।

এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যেও ‘সমাধান’ নির্বাচনেই বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আলাপ-আলোচনায় সমঝোতার সুযোগ কম বলেই ভাষ্য তার। তার মতে, নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে ‘সংঘাত শেষ হয়ে যাবে’।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ অবশ্য মনে করেন শর্তহীন সংলাপে একটা সমাধান হলেও হতে পারে।

সমাবেশ ঘিরে সহিংসতায় ফিরল অবরোধ

গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশের দিন সংঘর্ষের পর কঠোর অবস্থানে পুলিশও। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীক, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বহু নেতাকে। তৃণমূলেও চলছে অভিযান।

অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তায় দলের কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছেন রিজভী। ২০১৮ সালের আগেও এভাবে বিএনপির নানা ঘোষণা আসত। সে সময় অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তা দিতেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, যিনি পরে উধাও হয়ে যান এবং তার দেখা মেলে ভারতে।

বিএনপির অবরোধের কর্মসূচির মধ্যে রাজপথে সক্রিয় থাকছে আওয়ামী লীগও। বিএনপির তুলনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান। বিএনপির নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার-মামলায় আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছে বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিতেও আদালত পাড়া থাকে সরগরম।

Also Read: আলোচনায় যায়নি বিএনপি, পরে চাইলেও রাজি ইসি

Also Read: ভোট প্রস্তুতি: ইসি বঙ্গভবনে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার

বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের শুরুটা অবশ্য এক যুগ আগে। উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণার পর ২০১১ সালে এ ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ফিরে আসে নির্বাচিত সরকারের ব্যবস্থা। তখন থেকেই এর বিরোধিতা করা বিএনপি-জামায়াত জোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে দেয় হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি।

এবারের তুলনায় সেসময় সহিংসতার মাত্রা ছিল আরও বেশি। প্রায় প্রতি রাতে যাত্রীসমেত বাসে পেট্রল বোমায় ঝলসে যায় অগুণিত মানুষ। সরকারি বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলাও ছিল নিয়মিত চিত্র। পুলিশের প্রতিক্রিয়াও ছিল ব্যাপক। ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান, হামলা পাল্টা হামলার মধ্যে হয় ভোট।

সেই নির্বাচনে দেড়শর বেশি আসনে প্রার্থীরা নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি আসনের সবগুলোতে ভোট শেষ করা যায়নি ৫ জানুয়ারি। তবে তাতে সংসদের কোরামে সমস্যা হয়নি।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপি-জামায়াত জোট দেয় আন্দোলনের হুমকি। তবে পরে ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন একটি জোট করে ভোটে যায় তারা।

সেই ভোটে একতরফা ফলাফলের পর নির্বাচনে ‘রাতে ভোট চুরির’ অভিযোগে তা প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়ে তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে ফিরে যায় বিএনপি। দলটির নেতারা বলতে থাকেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পারলেও সরকার এবার আর ‘একতরফা’ নির্বাচন করতে পারবে না।

এরই মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ গণনা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধাবস্থা ছাড়া আর অধিবেশনে বসছে না। ফলে বিএনপির দাবি মেনে সংসদের সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক ফেরানোর সুযোগ আর নেই।

তফসিলের প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশনে

দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতার তথ্য জেনে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগামী সপ্তাহটি তাদের যাবে নানা ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। তফসিল কবে ঘোষণা হবে, সেই সিদ্ধান্তটাও হয়ে যেতে পারে এই সময়ে।

নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শনিবার আলোচনায় বসে ইসি। ডাকলেও আলোচনায় যায়নি বিএনপি ও সমমনা জোটের দলগুলো। তবুও কমিশন আশায় রয়েছে, বিএনপি আবার সময় দিলে তারা আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক।

এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার ভোটের প্রস্তুতির বিষয়ে অবহিত করতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাবে। প্রতি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে এই আনুষ্ঠানিকতা হয়। এ সাক্ষাতের পরপরই হবে কমিশন সভা; সেখানেই তফসিল নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ৯০ দিনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে প্রস্তুতিমূলক সব কাজ প্রায় শেষ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; সবাই আমাদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।”

রাজনৈতিক দুই পক্ষ বিপরীত মেরুতে থাকলেও সমঝোতার আশা ছাড়ছেন না এই নির্বাচন কমিশনার।

তিনি বলেন, “দলগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে মতভেদ, মতানৈক্য নিরসন করে আসুন। সম্মানিত ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়ে আসছি এবং ইনশাহআল্লাহ সুন্দর একটা নির্বাচন উপহার দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।”

সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে এ নির্বাচন শেষ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার জানুয়ারির প্রথম প্রান্তিকে ভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন।

নির্বাচন হলে সংঘাত থামবে?

আওয়ামী লীগের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন মনে করেন, যে যাই বলুক, ‘সমাধান’ নির্বাচনেই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত হচ্ছে। আর এই সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার পথ আমি দেখছি না। আলাপ আলোচনার মধ্যে যে সমঝোতা হওয়া যায়, সেটার সুযোগও দেখছি না।

‘‘এখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে সংঘাত শেষ হয়ে যাবে। তখন আবার সুন্দর পরিবেশ ফিরে আসবে, এর আগে সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া কঠিন।”

Also Read: নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আছি: এবার বললেন জি এম কাদের

Also Read: দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ অবশ্য মনে করেন শর্তহীন সংলাপে একটা সমাধান হলেও হতে পারে।

দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের কথা উড়িয়ে দিলেও জাফরউল্লাহ বলেন, “আমরা সব সময়ই ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করি। সংঘাতময় পরিস্থিতি হোক সেটা তো আমরা চাই না। আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে নির্বাচনে সবাইকে আহ্বান করেছি। এখানে যারা সন্ত্রাস করছে, তারা শর্ত না দিয়ে আলোচনায় আসুক।”

সংঘাত-সহিংসতার দায় পুরোটাই বিএনপির কাঁধে চাপিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা। বলেন, “আপনি দেখুন, বিএনপি যেভাবে সন্ত্রাস করছে, আমরা সেই পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ রাখার চেষ্টা করছি। আমরা শান্তি সমাবেশ করছি। আমরা চাই সকল দল একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাই। কিন্তু তারা সেটা শুনছে না।”

অবশ্য সংসদের শেষ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী সাফ বলে দিয়েছেন, আলোচনায় তিনি রাজি নন। তার ভাষাটা ছিল এমন, “জানোয়ারদের সঙ্গে সংলাপ কী?”

সংলাপে ‘না’ বিরোধীদেরও

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো বিএনপিরও সংলাপে আগ্রহ নেই। আত্মগোপনে থাকা স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাদের অধীনে নির্বাচনের জন্য সংলাপে কেন আমরা যাব? সরকারের অবস্থাটা এ রকম যে, ‘সব মানি, কিন্তু তালগাছ আমার’। এটা তো হতে পারে না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তো বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপ গিয়েছিল। সংলাপের ফলাফল কী, তা দেশবাসী, বিশ্ববাসী দেখেছে।

“আর নির্বাচন এই সরকারের অধীনে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না, সেটা ২০১৪ ও ১৮ সালে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। আমরা শুধু নয়, বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও বলছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তারা অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। সে জন্যই তো আমাদের এক দফা দাবি।”

Also Read: কাকরাইলে সংঘর্ষ, বিএনপির সমাবেশ পণ্ড

বিএনপির ‘এক দফা’ দাবির মধ্যে আছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ইত্যাদি।

বিএনপির সঙ্গে এই আন্দোলনে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করছে গণতন্ত্র মঞ্চ, সাবেক ২০ দলীয় জোটের কিছু শরিকের গড়ে তোলা ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, এলডিপি, এনডিএমও।

২০ দলীয় জোটে বিএনপির প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দূরত্বও আপাত দৃষ্টিতে ‘ঘুঁচেছে’। বিএনপির সঙ্গে মিল রেখে তারাও এখন একই কর্মসূচি দিচ্ছে।

বিরোধী নেতাদের মত তাদের দলের কর্মীরাও এবার কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছেন। গত ২৮ অক্টোবর ঢাকার মহাসমাবেশে যোগ দিতে রাজশাহী থেকে ৫২ বছর বয়সী কর্মী ফয়জুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার ভেবেছে ১৪ ও ১৮ সালের মতো নির্বাচন করবে। এ রকম অবস্থায় সমাধানে পথ কোথায়? সরকারই সংকট তৈরি জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়…. এটা আর মেনে নেওয়া যায় না।”

সাধারণেরা যাবে কোথায়?

দুই পক্ষের অনড় অবস্থানে সংঘাত সহিংসতা আর অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তার শেষ নেই। শুধু যাতায়াতে নিরাপত্তার সমস্যা নয়, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হওয়ায় যারা নিত্য আয় করে সংসার চালায়, তাদের আয়ের সুযোগ এখন সীমিত।

বছরের শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষাকেন্দ্রিক যে ব্যস্ততা থাকার কথা ছিল, সেটিও এখন অনিশ্চয়তায়। সন্তানের শিক্ষার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টি আরও নাড়া দিচ্ছে অভিভাবক আর শিক্ষকদের।

মালিবাগের গুলবাগের একটি কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের শিক্ষিকা আফরোজ খানম বলেন, “মানুষের জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক যাতে থাকে সেদিকটাও দেখতে হবে। এখন ফাইনাল পরীক্ষার টাইম। এই সময়ে টানা হরতাল বা অবরোধের মত কর্মসূচি অগ্রহণযোগ্য। এতে শিক্ষার্থীদেরকে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা বলেন, “বছরের শেষে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব ক্ষেত্রেই ফাইনাল বা কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সেই দিকটা খেয়াল রাখা দরকার।

“আমি মনে করি, বছরের শেষ সময়ে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি না দিয়ে সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভের মত কর্মসূচি দেওয়া উচিত ছিল। এতে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের পরীক্ষাগুলো সেরে নিতে পারত।”