Published : 06 Oct 2025, 03:08 PM
নির্বাচন কমিশনে এ মুহূর্তে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫২। এর মধ্যে ৭টি দল নিবন্ধন পেয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ আরও কিছু দল নিবন্ধন পাওয়ার শর্ত পূরণ করেছে। কিন্তু এর মধ্যে এনসিপির প্রতীক নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তারা যে কোনো মূল্যে দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা চায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে, এনসিপি তো বটেই, কোনো দলকেই শাপলা দেওয়া হবে না। কিন্তু কেন?
কথা উঠছে বিএনপির ধানের শীষ এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল নিয়েও। কেননা, এই দুটি দলের প্রতীকও একসময় অন্য দলের ছিল। ধানের শীষ নিয়ে আবার এনসিপির দাবি, যদি জাতীয় প্রতীক হওয়ার কারণে তারা শাপলা না পায়, তাহলে জাতীয় প্রতীকের অংশ হওয়ায় বিএনপির ধানের শীষও বাতিল হওয়া উচিত।
প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলের প্রতীক কতটা গুরুত্বপূর্ণ? ধরা যাক ধানের শীষ। এটা বিএনপির প্রতীক। কিন্তু বিএনপির প্রতীক যদি ধানের শীষ না হয়ে গোলাপ ফুল হতো, তাহলে কি তারা কম ভোট পেত বা দল হিসেবে বিএনপি কম জনপ্রিয় হত?
জাকের পার্টির মার্কা হচ্ছে গোলাপ ফুল। কিন্তু এত সুন্দর প্রতীকের দলটি এ পর্যন্ত যে ছয়টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সেখানে তাদের ভোট পাওয়ার হার গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১ শতাংশ ভোটও পায়নি গোলাপ ফুলের মতো সুন্দর প্রতীকসমৃদ্ধ আটরশি পীরের এই দলটি।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য দলীয় প্রতীক হিসেবে চায় শাপলা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের প্রতীকের তালিকায় শাপলা নেই। সুতরাং এনসিপিকে নির্বাচন কমিশনের তালিকায় থাকা এমন কোনো প্রতীক চেয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছে, যে প্রতীক কোনো নিবন্ধিত দলের নেই।
এনসিপি, শাপলা ও জাতীয় প্রতীক
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘প্রজাতন্ত্রের জাতীয় প্রতীক হইতেছে উভয় পার্শ্বে ধান্যশীর্ষবেষ্টিত, পানিতে ভাসমান জাতীয় পুষ্প শাপলা, তাহার শীর্ষদেশে পাটগাছের তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত পত্র, তাহার উভয় পার্শ্বে দুইটি করিয়া তারকা।’
অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের মূল বিষয় হচ্ছে শাপলা। তাকে ঘিরে থাকা ধানের শীষ, পাটগাছের পাতা ও তারকা হচ্ছে নকশার অংশ। সেই হিসেবে দূর বা কাছ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকের দিকে তাকালে মনে হবে শাপলাই জাতীয় প্রতীক। অর্থাৎ শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল এবং জাতীয় প্রতীকের মূল অংশ হওয়ায় এটি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হতে পারে না—এমন যুক্তি প্রবল।
যদিও এনসিপি বলছে, তাদের শাপলাই চাই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) যদি তাদের শাপলা না দেয় তাহলে আন্দোলন গড়ে তোলা এমনকি ইসি ঘেরাও করে কমিশনকে পদত্যাগে বাধ্য করার হুমকিও দিয়েছে। দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, কীভাবে প্রতীক আদায় করতে হয় সেটি তারা জানেন।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘যেদিন এনসিপি প্রথম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে সেদিনই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল এনসিপি শাপলা মার্কা চায়। তাহলে ওই তালিকায় শাপলা মার্কা যুক্ত করা কাদের কাজ ছিল? এতদিন কি তারা নির্বাচন কমিশনে বসে বসে নাটক দেখেছে? নাকি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে বসে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান, দল বা এজেন্সির কথামতো উঠবস করেছে? সকল ধরনের ভন্ডামিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা হবে। যেহেতু কোন আইনগত বাধা নেই তাই এনসিপির মার্কা শাপলাই হতে হবে। অন্য কোন অপশন নাই। নাহলে কোন নির্বাচন কিভাবে হয় আর কে কিভাবে ক্ষমতায় গিয়ে মধু খাওয়ার স্বপ্ন দেখে সেটা আমরাও দেখে নিব।’ প্রশ্ন হলো, এনসিপির কেন শাপলাই চাই? কেন অন্য কোনো প্রতীক তাদের পছন্দ নয়? জাতীয় প্রতীকের অংশ ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক বলেই কি এনসিপি শাপলা চায়?
গত ২২ জুন ইসিতে নিবন্ধনের আবেদন জমা দেয় এনসিপি। তখন তারা দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা, কলম ও মোবাইল প্রতীক চেয়েছিল। কিন্তু ৩ অগাস্ট ইসি সচিব বরাবর আরেক আবেদনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পছন্দের প্রতীকে সংশোধনী এনে শাপলা, সাদা শাপলা অথবা লাল শাপলা চান।
সবশেষ এনসিপির পক্ষ থেকে ইসি সচিবের ই–মেইলে পাঠানো আবেদনে বলা হয়েছে, ‘শাপলাকে প্রতীক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করার ক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্ত কোনো আইনি ভিত্তি দ্বারা গঠিত নয়, বরং এনসিপির প্রতি বিরূপ মনোভাব ও স্বেচ্ছাচারী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। ইসির এমন একরোখা কার্যকলাপে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন ও সব দলের ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরির ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’
লাঙ্গল নিয়েও ক্যাচাল
ক্যাচাল তৈরি হয়েছে লাঙ্গল প্রতীক নিয়েও। জাতীয় পার্টির মূল অংশের প্রতীক হচ্ছে লাঙ্গল। ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর এই প্রতীকেই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয় জাতীয় পার্টি। ১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন যখন দলটি গঠন করেন, তখন থেকেই জাতীয় পার্টির প্রতীক হচ্ছে লাঙ্গল। কিন্তু এখন ‘বাংলাদেশ জাতীয় লীগ’ নামে একটি পুরোনো দল, যারা নতুন করে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে যাচ্ছে, তারা দাবি করছে, লাঙ্গলের মালিকানা তাদের।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে অবিভক্ত ভারতের কৃষক প্রজা পার্টির প্রতীক ছিল লাঙ্গল। পরে লাঙ্গলের হাল ধরেন জাতীয় লীগের নেতা আতাউর রহমান খান। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৯ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন লাঙ্গল প্রতীক নিয়েই। সুতরাং জাতীয় লীগ এখন তাদের লাঙ্গল প্রতীক ফেরত পাওয়ার দাবি তুলছে।
ধানের শীষ কার প্রতীক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। দলটির প্রতীক ধানের শীষ। কিন্তু শুরুতে ধানের শীষ প্রতীক তাদের ছিল না। স্বাধীনতার আগে ধানের শীষ ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ ভাসানী অংশের প্রতীক। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেন, তখন ভাসানী ন্যাপের অধিকাংশ কর্মী দলটিতে যোগ দেন। বলা চলে তখন ভাসানীর ন্যাপ জিয়ার বিএনপিতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। দল গঠনের পর থেকেই ধানের শীষ প্রতীকটি বিএনপি ব্যবহার করতে শুরু করে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, এই ধানের শীষ বিএনপির না, এটা মওলানা ভাসানীর ন্যাপের প্রতীক।
দলীয় প্রতীক নিয়ে যখন রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত, তখন এনসিপির কোনো কোনো নেতা মন্তব্য করেছেন, ধানের শীষও বিএনপির প্রতীক নয়। এনসিপি নেতারা বলছেন, জাতীয় প্রতীকের অজুহাতে যদি শাপলাকে তাদের দলীয় প্রতীক দেওয়া না হয় তাহলে জাতীয় প্রতীকে থাকার কারণে ধানের শীষও বিএনপির প্রতীক হতে পারে না। অর্থাৎ এনসিপি শাপলা না পেলে বিএনপির ধানের শীষ প্রত্যাহারের দাবি দলটির নেতাদের।
ইসি চাইলেই প্রতীক বাদ দিতে পারে?
সম্প্রতি নিবন্ধন পাওয়া বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রতীক হচ্ছে আনারস। কিন্তু ১৯৭৯ সালে আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ইউনাইটেড রিপাবলিকান পার্টি। একই প্রতীক নিয়ে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতীয় জনতা পার্টি। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আনারস প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করে জাতীয় মানবাধিকার দল। তার মানে আনারস প্রতীক এ পর্যন্ত অন্তত চারটি দলকে দেওয়া হয়েছে।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বাংলাদেশ গণফ্রন্ট। কিন্তু বর্তমানে বাইসাইকেল হচ্ছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি-জেপির প্রতীক।
যে গোলাপ ফুল এখন জাকের পার্টির প্রতীক, ১৯৭৯ সালে এই প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপের আরেকটি অংশ। কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে এই গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে জাকের পার্টি।
প্রশ্ন হলো, একটি দলের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার পরে সেই প্রতীক কি নির্বাচন কমিশন চাইলেই প্রত্যাহার করতে পারে বা অন্য একটি দলকে ওই প্রতীক দিয়ে দিতে পারে? কেননা একবার কোনো দলকে প্রতীক দেওয়া হলে সেটি ওই দলের রিজার্ভড প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে কোনো একটি প্রতীকে নিবন্ধিত হওয়ার পরে ওই প্রতীক অন্য কোনো দলকে দেওয়ার সুযোগ নেই।
২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন নির্বাচনে গোলাপ ফুল, আনারস, বাইসাইকেল এমনকি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অন্য দলগুলো নির্বাচন করতে পেরেছে কারণ তখনও নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের নিয়ম ছিল না। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধিত হওয়ার বিধান চালু করা হয়। নিবন্ধনের সময় দলকে যে প্রতীক দেওয়া হয়, সেটি ওই দলের পরিচিতি। সুতরাং নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে যে প্রতীকে নিবন্ধিত করবে, সেটি অন্য দলকে দেওয়ার আইনত সুযোগ নেই। তবে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতীক স্থগিত করতে পারে। যেমন এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রতীক স্থগিত। কেননা সরকার তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কার্যক্রম স্থগিত হলেই বা দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেলেও নির্বাচন কমিশন নৌকা প্রতীক অন্য কোনো দলকে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত এক বছরে ৭টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে এবি পার্টি (ঈগল), গণঅধিকার পরিষদ (ট্রাক), নাগরিক ঐক্য (কেটলি), গণসংহতি আন্দোলন (মাথাল), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ফুলকপি), বাংলাদেশ মাইনরিটি পার্টি (রকেট) এবং সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর আদালতের আদেশে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ লেবার পার্টি (আনারস)। কিন্তু এর আগে কোনো দলের প্রতীক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়নি বা কোনো দল কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতীকের ব্যাপারে অনড় থাকেনি। কিন্তু এনসিপি শাপলা প্রতীকের ব্যাপারে আপসহীন। অনেকের মনে প্রশ্ন আছে, এনসিপি কি বিশেষ কোনো দল যে তাদের পছন্দের প্রতীক দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের তালিকা সংশোধন করতে হবে?
পরিশেষে, প্রতীক হচ্ছে দলের পরিচিতি। কিন্তু এটিই সবকিছু নয়। বরং একটি দলের প্রতীক কী, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওই দলের কর্মসূচি এবং দলের নেতৃত্বে থাকা লোকজনকে সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা কতটা গ্রহণ করছে। সুতরাং, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী তরুণদের দল হিসেবে এনসিপিকে মানুষ কতটা গ্রহণ করবে, সেটি নির্ভর করছে তাদের কর্মসূচির ওপর। শাপলা প্রতীক পেলেই তারা অনেক জনপ্রিয় হবে বা তাদের ভোট বাড়বে, আর কলম বা মোবাইল ফোন কিংবা অন্য কোনো প্রতীক পেলে তারা ভোট কম পাবে, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তারপরও এনসিপি শাপলা প্রতীকের ব্যাপারে যে অনড় অবস্থানে আছে, সেটি যে আগামী দিনের রাজনীতিতে আরও বেশি উত্তেজনা তৈরি করবে, সেই ধারণা করাই যায়।