১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

গাদ্দাফি পুত্র কি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বলি?

তিনি গাদ্দাফির পুত্র ছিলেন—কিন্তু সেটা তার অপরাধ নয়। অপরাধ ছিল, তিনি লিবিয়ার এমন এক ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন, যা সাম্রাজ্যবাদীরা সহ্য করতে পারছিল না।

গাদ্দাফি পুত্র কি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বলি?
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি—যার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়েছে বুলেট দিয়ে, যাকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত লিবিয়ায় অনেকেই জাতীয় ঐক্যের সম্ভাব্য প্রতীক হিসেবে দেখতেন। ছবি: রয়টার্স

মঞ্জুরে খোদা মঞ্জুরে খোদা

Published : 05 Feb 2026, 07:15 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:52 PM

মুয়াম্মার গাদ্দাফির দ্বিতীয় পুত্র সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে হত্যার মধ্য লিবিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আরেকটি নির্মম নাটক শেষ পর্বে পৌঁছেছে। তার মৃত্যুতে লিবিয়িা এক শক্তিশালী ভবিষ্যৎ নেতাকে হারাল, যিনি সম্ভবত দেশটিকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার সামর্থ্য রাখতেন। এই হত্যাকাণ্ড শুধু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তির নিয়োগ করা ঘাতকচক্র।

সাইফকে শুধু একজন স্বৈরশাসকের সন্তান বা ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা ভুল হবে। তিনি এমন এক দেশে ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেছিলেন— যে দেশটিকে দুই ভিন্ন শক্তি ভাগ করে রেখেছে। তাই প্রশ্ন রয়ে গেছে, গাদ্দাফির পুত্র কি সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বলি, তাকে হত্যা করে কি তারা লিবিয়ার সম্ভাব্য পুনর্গঠনের পথ বন্ধ করেছে?

গত ৩ ফেব্রুয়ারি মুখোশধারী চারজন ঘাতক প্রথমে সাইফ গাদ্দাফির বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় করে, তারপর বাড়িতে ঢুকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ঘটনার সময় তার বাড়ির খুব কাছাকাছি উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

এই হত্যার ঘটনায় লিবিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ আল-মেনফি এবং ভাইস-চেয়ারম্যান মুসা আল-কুনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব পক্ষকে ধৈর্য ও সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এখনো পর্যন্ত ত্রিপোলির অন্তর্বর্তী সরকার বা পূর্বাঞ্চলভিত্তিক প্রশাসন কোনো পক্ষই এই হত্যার দায় স্বীকার করেনি। তবে যারা এই ঘটনাকে শুধু অভ্যন্তরীণ সহিংসতা বা গৃহযুদ্ধের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, তারা বিষয়টিকে মারাত্মকভাবে সরলীকরণ করছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, এর পেছনে রয়েছে গভীর সাম্রাজ্যবাদী ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।

গাদ্দাফির শাসনামলে সাইফ আল-ইসলাম তার বাবার পরে লিবিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকলেও দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় তিনি তার বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, যাকে ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। ওই সময় থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ও পরিচিত ছিলেন। লিবিয়াকে আন্তর্জাতিক একঘরে অবস্থা থেকে বের করে আনতে তিনি পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেছিলেন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইংরেজিতে সাবলীল হওয়ায় পশ্চিমা সরকারগুলোর সঙ্গে তার সহজ যোগাযোগ ছিল। তিনি মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলতেন এবং নিজেকে সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তার এই গুণাবলি ও চরিত্র বিভক্ত ও বিবাদমান লিবিয়াকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার পথ তৈরি করছিল। আর ওই সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতাই তার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

২০১১ সালে আরব বসন্তের নামে লিবিয়ায় যা ঘটেছিল, তাকে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান বলে সরলীকরণের সুযোগ নেই। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থনপুষ্ট বিরোধী একটি গোষ্ঠীর হাতে আটক হন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর তাকে হত্যা করা হয় মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল লিবিয়াকে দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে ইউরোপের দেশগুলো লিবিয়ার তেলসম্পদকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে পারে। এজন্য লিবিয়াকে টুকরো টুকরো করে প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ও গ্রুপগুলোর মধ্যে স্থায়ী দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখতে হবে। তাই করা হয়েছে, যার ফলে একসময়ের সমৃদ্ধ এই দেশ আজ মানবপাচার, মাদক ও অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

২০১১ সালে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে সাইফ তার বাবার পক্ষে অবস্থান নেন এবং বিদ্রোহ দমনে কঠোর ভূমিকা পালন করেন। গাদ্দাফির পতনের পর সাইফ আল-ইসলাম প্রতিবেশী নাইজারে পালানোর চেষ্টা করলে জিনতান শহরের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে আটক হয়ে প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২০১১ সালে বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকার কারণে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করতে চেয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এমনকি ত্রিপোলি শহরের একটি আদালত ২০১৫ সালে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পূর্বাঞ্চলীয় শহর টোব্রুকের মিলিশিয়ারা তাকে সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় মুক্তি দেয়। এরপর থেকে নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজ এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন।

২০২১ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার প্রার্থিতা নিয়ে ব্যাপক আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। লিবিয়ার নির্বাচন বারবার পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তার চেয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের অভিযোগ অনেক বেশি প্রবল।

২০২১ সাল থেকে ত্রিপোলিভিত্তিক অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দবেইবা ক্ষমতায় রয়েছেন এবং এখনো কোনো নির্বাচন হয়নি। ফলে দেশটি একদিকে যুদ্ধবাজ খলিফা হাফতারের পরিবার, অন্যদিকে জাতিসংঘ-স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারে বিভক্ত। সাইফ গাদ্দাফি ছিলেন এই দুই বলয়ের ঐক্যের প্রতীক ও সম্ভাব্য হুমকি।

এই সময়ে সাইফ তার রাজনৈতিক দল পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব লিবিয়া (পিএফএলএল) সংগঠিত করে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন এবং ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে তাকে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অনেকের মতে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে কোনো বিবেচনায় তিনিই সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী ছিলেন। ২০১১ সালে তার বাবার বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছিল, ওই গোত্রগুলোও তাকে সমর্থন করেছিল। পূর্ব ও পশ্চিমের দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের বিরুদ্ধে তিনি নিজেকে জনপ্রিয় বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য ব্যাপক সাড়া ফেলে। তিনি বলেন, “আমাদের কোনো অর্থ নেই, নিরাপত্তা নেই, এখানে কোনো জীবন নেই। গ্যাস স্টেশনে যান—ডিজেল নেই। আমরা ইতালিতে তেল-গ্যাস রপ্তানি করি—ইতালির অর্ধেক আলোকিত করি—আর এখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, এটা সম্পূর্ণ বিপর্যয়।” এ কারণে সাইফ আল-ইসলামকে স্বৈরাচারের সন্তান বলে অবজ্ঞা করার সুযোগ ছিল না। তার বাবার ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ লিবিয়াবাসীদের কাছে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। দ্য গার্ডিয়ানকে এক লিবিয়াবাসী বলেন, “লিবিয়ার ভেতরে একটি বড় জনগোষ্ঠী সাইফকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সমর্থন করে। যদি নির্বাচন হতো, তবে সম্ভবত তিনি দবেইবা ও হাফতারের চেয়ে ভালো ফল করতেন।”

লিবিয়ার মাঠপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, তাদের সন্দেহ বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা স্থানীয় প্রক্সি ব্যবহার করে সাইফকে হত্যা করেছে। তারা বলছেন, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে, লিবিয়াকে পুনরেকত্রিত করতে হলে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গাদ্দাফি-পুত্র সাইফই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এ কাজ করতে পারতেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চায় না লিবিয়া ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হোক। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কেউ মাথা তুলে দাঁড়াক। সাম্রাজ্যবাদ স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, মোল্লাতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্রকে সমর্থন করে, টিকিয়ে রাখে—কিন্তু স্বাধীনচেতা শাসককে কোনোভাবেই সহ্য করে না।

উল্লেখযোগ্য যে, গত সপ্তাহে ডনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকা বিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বুলোসের মধ্যস্থতায় প্যারিসে লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শিবির নির্বাচন নিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান নেওয়ার আলোচনায় মিলিত হয়েছিল। দুই পক্ষের মধ্যে যে কোনো জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতেন সাইফ গাদ্দাফির তৃতীয় শক্তি। ধারণা করা হয়, সেটাই ছিল তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে দেড় দশক আগে ন্যাটো তার বাবাকে হত্যা করে দেশটাকে বিভক্ত করে ধ্বংস করল, আর তার সন্তান যখন দেশটাকে পুনর্গঠন করতে কাজ করছিলেন, তখন তাকেও হত্যা করা হলো?

লিবিয়ায় ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদি গভীর স্বার্থ রয়েছে। উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী ফ্রান্স লিবিয়ার উৎপাদিত তেলের বড় অংশ দাবি করেছিল। ওই সময়ের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি লিবিয়ার তেলের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন। মুয়াম্মার গাদ্দাফির প্যান-আফ্রিকান স্বর্ণদিনার মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা ও আফ্রিকান ঐক্যের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের জন্য আতঙ্ক ছিল। কারণ তা হলে ডলার ও ইউরোর জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ হতো। তার উত্তরাধিকারী হিসেবে সাইফ আল-ইসলামও ওই স্বপ্ন ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এসব পশ্চিমা শক্তির পছন্দ হয়নি, কারণ তারা সেখানে দ্বন্দ্ব-বিভক্তি ও শোষণের নীতি নিয়েছিল।

বহু বছর ধরে লিবিয়ার জাতীয় নির্বাচন আটকে রাখা হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো নির্বাচন এগিয়ে নিতে তৎপর হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক দশকেও তা করতে পারেনি বা চায়নি। যিনি লিবিয়াকে একত্র করতে চেয়েছিলেন এবং তেলসম্পদের ঔপনিবেশিক লুটপাট থেকে দেশকে রক্ষার শপথ নিয়ে কাজ করছিলেন, তার বুকেই নেমে এল ঘাতকের বুলেট। অভ্যুত্থানের সময় যে বিদ্রোহীরা তাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও হত্যা করেনি, অথচ মুক্ত অবস্থায় সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়োগ করা ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলেন সাইফ গাদ্দাফি!