Published : 26 May 2026, 01:55 PM
দোকান থেকে চিপস কিনতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় শিশু নিশাত। এটি গত ১৫ এপ্রিলের ঘটনা। ছয় বছরের নিশাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের একটি স্থানীয় স্কুলের নার্সারিতে পড়ত। প্রতিবেশী ইসহাক মিয়ার সঙ্গে বিরোধ ছিল নিশাতের বাবার। সেই বিরোধের প্রতিশোধ নিতেই ইসহাক নিশাতকে হত্যা করে বলে মনে করা হয়েছিল শুরুতে। পরে অবশ্য পুলিশ বলেছে, ইসহাক ধর্ষণ করতে চেয়েছিল ছোট্ট মেয়েটিকে। নিশাত ওর মাকে জানিয়ে দেবে বলে হুমকি দেওয়ার পর ওকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করে ইসহাক। নিখোঁজের দুদিন পর, ১৭ এপ্রিল দুপুরে বাড়ির পাশের একটি খোলা জায়গা থেকে নিশাতের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পল্লবীর দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন নিশাতের বাবা আবু সাদিক মিয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, “দেড় মাস হলো বাচ্চাটা মারা গেছে, আমার ঘুম আসে না। ফেইসবুকে যখন রামিসার ঘটনা দেখলাম, তখন ভাবলাম বাচ্চাটার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। আমার মেয়েটাকে শ্বাসরোধ করে, হাত-পা ভেঙে, নির্যাতন করে মারা হয়েছে। মামলা করার পরও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজ প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল, এখনো চার্জশিট দেয়নি।” শুধু দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন; ভিন্ন এক জেলা থেকে এক হতভাগ্য শিশুর বাবা ছুটে এসেছেন ঢাকায় রামিসার বাবাকে সান্ত্বনা দেবেন বলে, একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতে।

২.
এবার আমরা এক বছর তিন মাস আগে ফিরে যাই। এই ঘটনা আমরা সবাই জানি। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে বড় বোন ফাতেমার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। পরে তাকে অচেতন অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়। টানা আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকার সিএমএইচে মারা যায় শিশুটি। সেই ঘটনায় সারা দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আছিয়ার জন্য কেঁদেছিল পুরো দেশ। বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার মানুষ।
সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করা হবে। কিন্তু বিচারিক আদালতে প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের আপিল পর্যায়ে আইনের মারপ্যাঁচে ঝুলে আছে।
রামিসাকে হত্যার নিষ্ঠুরতা সামনে আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে আছিয়ার ঘটনা। কয়েকটি গণমাধ্যম আছিয়ার পরিবারের খোঁজ নিয়েছে। আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন জানিয়েছেন, “আমার মেয়েকে হত্যার পর অনেকেই এসেছিল, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। আমরা কেমন আছি, কীভাবে বেঁচে আছি, সেটাও কেউ জানতে চায় না। আসামি জেলে বসে সরকারি খাবার খাচ্ছে, আর আমরা বিচার পাওয়ার আশায় দিন গুনছি।”

তিনি বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, এত দিনেও রায় কার্যকর হচ্ছে না কেন? “আমার ভয় হয়, বেশি দেরি হলে হিটু শেখও খালাস পেয়ে যাবে। মেয়েটা মারা গেছে এক বছরের বেশি হলো। বিচারে আসামির ফাঁসি হয়েছে, সেটাও এক বছর হয়ে গেল। এখনো অপেক্ষায় আছি, কবে আমার আছিয়ার খুনির ফাঁসি হবে।”
৩.
এবার আমরা এক মাস পেছনে ফিরে নেত্রকোনার মদন উপজেলায় যাব। স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় পড়া ১১ বছরের এক শিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত হয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি বাবা-মায়ের চোখে পড়ে। জিজ্ঞেস করলে শিশুটি জানায়, তার “পেটে কী যেন নড়ে।” হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, শিশুটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। একটি শিশুর পেটে বড় হচ্ছে আরেকটি শিশু।
অপরাধী হিসেবে শিশুটির মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আমানউল্লাহ সাগরের নাম আসে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ওই শিক্ষক মাদ্রাসায় তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র আলোড়ন। আত্মগোপনে থেকেও অভিযুক্ত শিক্ষক ভিডিও বার্তা দিচ্ছিল। সেই সূত্র ধরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাকে জেলে পাঠানো হয়। মাত্র এক মাসের মাথায় আরও অসংখ্য ইস্যুর চাপে পড়ে ভাইরাল হওয়া সেই শিশু হারিয়ে গেছে।
৪.
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নির্মমভাবে নির্যাতিত ও নিহত চারটি শিশুর ঘটনা স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, গত ২০ মাসে দেশে অন্তত ৬৪৩ জন শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। বাকি তিন শিশু তাদের ছোট্ট জীবন ব্যাপক চর্চার ভেতর দিয়ে শেষ করতে পারলেও, নিশাতের দুর্ভাগ্য যে সে ভাইরাল হতে পারেনি। ফলে তার নামটা খুব বেশি মানুষ জানেনা।
এর মধ্যে রামিসা একটু বেশি ‘ভাগ্যবান’। তার মৃত্যু মানুষকে গভীরভাবে কাঁদিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী গিয়ে রামিসার পরিবারে সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার করবেন। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও জনগণের চাপে পড়ে আইনমন্ত্রীও বলেছেন যে, ১ জুন থেকে রামিসার খুনিদের বিচারের কাজ শুরু হবে।

কিন্তু গত ২০ মাসে যে আরও ৬৪২ জন শিশুকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচারের কী হবে? তাদের খুনিদের বিচার কে করবে ও কবে করা হবে? আদৌ কি বিচার হবে? যদি না হয় তবে তাদের অপরাধ কি শুধু এই যে, তারা রামিসার মতো ভাইরাল হতে পারেনি? আবার ভাইরাল হলেও যে বিচার পাবে তেমনটি নয়। এক বছর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আছিয়ার খুনির শাস্তিতো কার্যকর হয়নি?
৫.
রামিসা মানুষের মনোযোগ কাড়তে পেরেছে কয়েকটি কারণে। তার বয়স, হত্যার ধরন, তার ওপর চালানো নৃশংসতা এবং মেয়েটির মায়াময় মুখ ও চাহনি মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। ফলে কেউ কেউ অপরাধীর প্রকাশ্য শাস্তি বা সরাসরি ফাঁসির দাবি করেছে। কেউ বলেছে, অপরাধীকে পিটিয়ে মারা উচিত। অনেকেই ডিএনএ টেস্ট বা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও যেতে রাজি নয়। তারা নিজেরাই অপরাধীকে হত্যা করতে চায়। বিশাল এক জনগোষ্ঠী দাবি তুলেছে, কোনো আইনজীবী যেন আসামির পক্ষে না দাঁড়ায়। ফলে আইনজীবীরাও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। আবার ’ইসলামপন্থিরা’ এই সুযোগে দেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবি তুলে বসে আছে। ফলে এটা আন্দাজ করা যাচ্ছে যে, জনতার এই অস্থিরতা, আবেগ ও স্বার্থকেন্দ্রিক চাপের মুখে পড়ে সরকার এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার শেষ করতে চায়।
কিন্তু জনচাপের কারণে কি আসামি সোহেলের দুই মাস আগে গ্রাম থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে ঢাকায় পালিয়ে আসা, ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে সেই সংসার ভাঙা কিংবা ইয়াবা চক্রের সঙ্গে তার সংযোগ, এসব তদন্ত করে দেখার প্রয়োজন নেই? যে প্রক্রিয়ায় রামিসার মাথা বিচ্ছিন্ন করে রক্ত মুছে ফেলার জন্য বারবার পানিতে ডোবানো হয়েছে, তা থেকে অনুমান করা যায়, সে আরও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। সেগুলো কি তদন্ত হওয়া দরকার নয়? তার বিকৃত যৌনাচারের শিকার আরও কত নারী ও শিশু হয়েছে, সেটাও তো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার জন্য এক মাস কি যথেষ্ট সময়?
তবে এক মাসে না হলেও, উপরোল্লিখিত প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখেও আসামির দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বিস্ময়ের দিকটি হলো, কোনো এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে সেই শাস্তি আর কার্যকর হয় না। অন্তত গত কয়েক দশকেও আমরা এরকম একটি শাস্তির দৃষ্টান্তও মনে করতে পারিনা। মূলত এটিই জনক্ষোভের প্রধান কারণ।
৬.
অথচ জনতুষ্টিবাদের চাপে না পড়ে, বেছে বেছে ভাইরাল ঘটনার রেসপন্স না করে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর আওতায়ই প্রতিটি ঘটনার বিচার করা সম্ভব। উল্টো, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ওপর সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। ফলে গত বছর আছিয়া হত্যার পর এই আইনে সংশোধনী এনে দ্রুত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিধান যুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই সংশোধনী অনুমোদন করেছে।
তাহলে অপরাধের বিচার হচ্ছে না কেন? বিচার না হওয়ার প্রধান কারণ হলো আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং এসব মামলাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া। তারচেয়ে বরং কোথাও কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলে এবং সেটি ভাইরাল হলে জনগণকে খুশি করার জন্য কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে।
সরকারের উচিত ঠিক এই জায়গাটিতেই কাজ করা।