Published : 17 Jan 2026, 06:03 AM
গত শতকের আশির দশক। আমরা তখন স্কুলের ছাত্র। সেই সময় সিনেমাই ছিল আমাদের জীবনের প্রধান বিনোদন। মফস্বলে তখনও রঙিন টেলিভিশনের দেখা মেলেনি। কিছু সচ্ছল মানুষের ঘরে সাদাকালো টিভি ঢুকতে শুরু করেছে মাত্র। ভিসিবি–ভিসিআর তখন মফস্বলে দুর্লভ।
বিনোদন মানেই ছিল সিনেমা, আর সিনেমা মানেই হলে গিয়ে দেখা—যা আমাদের মতো কিশোরদের জন্য ছিল বেশ কঠিন। অভিভাবকদের নিষেধাজ্ঞা, টিকিট কেনার টাকার অভাব, সামাজিক পুলিশিং—সব মিলিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখাটা ছিল দুরূহ ব্যাপার। তারপরও আমরা লুকিয়ে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, প্রাইভেট পড়ার কথা বলে সিনেমা দেখেছি। ইত্তেফাকে সিনেমার বিজ্ঞাপন, চিত্রালী-পূবালীর মতো সিনে-পত্রিকা লুকিয়ে পড়া, কোনো কিছুই বাদ যেত না। সে সময় অধিকাংশ হলে চলত বাণিজ্যিক সিনেমা—গান, মারপিট আর অতিনাটকীয়তায় ভরপুর। আমরা সেই বয়সে অবশ্য সেগুলোই পছন্দ করতাম।
তবে আমরা ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ‘অকালপক্ক’ হয়ে উঠি বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে। বড়ভাইদের আঁতলামিতে প্রভাবিত হয়ে খুঁজতে শুরু করি ভালো গল্পের, সংযত অভিনয়ের সিনেমা—যেগুলোকে আজ আমরা আর্ট ফিল্ম বলি। আমরা যারা তখন ভিন্ন স্বাদের গল্প খুঁজতাম, তাদের আশ্রয় ছিল বিটিভি।
বিটিভির সেই সাদাকালো দিনের কথা এখন প্রায় রূপকথার মতো লাগে। ড্রয়িংরুমের এক কোণে রাখা বিশাল কাঠের বাক্সের ভেতর টেলিভিশন, ছাদের ওপর এন্টেনা ঘোরানোর কসরৎ আর ঝিরঝিরে পর্দার ফাঁক গলে ভেসে আসা ঝাপসা ছবি—সব মিলিয়ে সিনেমা দেখা তখন আমাদের জন্য ছিল এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।
সম্ভবত কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় এক বড় ভাইয়ের বাসায় বিটিভিতে দেখেছিলাম ‘রূপালী সৈকতে’। তখন বিটিভিতে সিনেমা দেখাটাই ছিল ধৈর্যের বড় পরীক্ষা। আটটার খবর শেষ হতে রাত পৌনে নয়টা বেজে যেত। তারপর লম্বা বিজ্ঞাপন। সিনেমা শুরু হলে মাঝেমধ্যেই আবার বিজ্ঞাপন, এগারটার বাংলা খবর, ইংরেজি খবর—সব মিলিয়ে নানারকম ‘নির্যাতন’। ফাঁকে ফাঁকে সিনেমা। শেষ হতে হতে রাত দেড়টা-দুইটা বেজে যেত।
তবু ‘রূপালী সৈকতে’ আমার মনে গভীর দাগ কেটে আছে। ততদিনে বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছি, রুচিতেও এসেছে এক ধরনের পরিবর্তন। সিনেমাটির গল্প, আবহ ও নির্মাণ ছিল আলাদা, কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে দাগ কেটেছিল নায়িকার উপস্থিতি। শান্ত, স্নিগ্ধ, অথচ ভেতরে ভেতরে দৃঢ়—জয়শ্রী কবির। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল, তিনি আর পাঁচজন রূপালি পর্দার নায়িকার মতো নন। চড়া মেকআপ বা অতি অভিনয় দিয়ে মন ভোলানোর চেষ্টা তার ছিল না। তার চোখের চাউনিতেই যেন কথা বলত অসংখ্য না বলা গল্প। ‘রূপালী সৈকতে’ দেখার পর প্রিয় অভিনেত্রীর তালিকা থেকে ববিতা বাদ পড়ে যান, সেখানে স্থান নেন জয়শ্রী কবির।
আমরা যে সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখতাম সেই রাজনীতির ছায়া দেখেছিলাম ‘রূপালী সৈকতে’ সিনেমার কাহিনিতে। রোমান্টিক বিপ্লবী রাজনীতি, গোপন সংগঠন, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টান আর অপূর্ণতার গল্প দিয়ে সাজানো এই সিনেমা খুব ভালো লেগেছিল। সাটামাটা কাহিনি, সাদামাটা অভিনয়। জয়শ্রী কবির এখানে সমকালীন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীর প্রতীক। তার চরিত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকে স্বপ্ন, হতাশা, ভালোবাসা আর এক ধরনের নিঃশব্দ ক্লান্তি।
এই ছবিতে জয়শ্রীর অভিনয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তগুলো আসে নীরব দৃশ্যে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকার দীর্ঘ শটগুলোয় তিনি কোনো কথা বলেন না, অথচ দর্শক বুঝে নেয়—এই চরিত্রের ভেতরে কত প্রশ্ন, কত অপূর্ণতা জমে আছে। তার চোখে থাকে বিষণ্ণতা, আবার একই সঙ্গে আত্মসম্মানের এক আলোকরেখা। আলমগীর কবিরের ক্যামেরা যেন জয়শ্রীর মুখের ভাষা পড়তে চায়, আর জয়শ্রী সেই সুযোগে চরিত্রটিকে আরও গভীর করে তোলেন।

জয়শ্রী কবির ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক বিশেষ সময়ের প্রতিনিধি। তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন, বরং সেই আধুনিক চেতনার প্রতিচ্ছবি, যা সমান্তরাল বা আর্ট ফিল্মকে বাংলাদেশি সিনেমায় মর্যাদাপূর্ণ জায়গা করে দিয়েছিল। তার অভিনীত ছবিগুলোতে আমরা দেখি মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা, নিঃসঙ্গতা আর নীরব প্রতিবাদের গল্প। ‘রূপালী সৈকতে’ ছবিতে তিনি যেন আমাদেরই কারও প্রতিনিধি—চেনা সংসার, চেনা দুঃখ, চেনা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা এক নারী। আলমগীর কবিরের সংবেদনশীল নির্মাণে তার অভিনয় ছিল পরিমিত, গভীর ও বিশ্বাসযোগ্য।
এরপর ‘সূর্যকন্যা’ সিনেমায় দেখেছিলাম জয়শ্রীর আরেক রূপ। সেই স্নিগ্ধ চাউনি আজও মনে পড়ে। তবে ‘সীমানা পেরিয়ে’ সিনেমায় তিনি একেবারে ভিন্ন এক রূপ নিয়ে হাজির হলেন। সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে নির্মিত এই ছবির কাহিনি মানুষ ও প্রকৃতির সংঘাত, সভ্যতা আর বন্যতার সীমারেখা নিয়ে। এখানে জয়শ্রী কবির অভিনয় করেন এক শিক্ষিত, অভিজাত নারীর চরিত্রে, যিনি শহুরে জীবন ছেড়ে এক অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এই চরিত্রে তার অভিনয়ের বড় দিক হলো দৃঢ়তা। তিনি ভীত নন, আবার অতিরঞ্জিত সাহসীও নন। তার চোখে থাকে পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা, আর ভেতরে ভেতরে টিকে থাকার সংকল্প। বুলবুল আহমেদের সঙ্গে তার রসায়ন ছবিটির বড় শক্তি। তাদের সম্পর্কের ভেতরে নেই চড়া রোমান্টিকতা, আছে ধীরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস। একটি দৃশ্য আজও মনে পড়ে—বনের ভেতর প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে জয়শ্রীর মুখে যে স্থির ভাব দেখা যায়, সেখানে ভয়কে ছাপিয়ে ওঠে আত্মসম্মান আর মানসিক দৃঢ়তা। ছবির গান—‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার মৌনতারই সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর’—আজও কোথাও বাজলে পর্দায় জয়শ্রী কবিরের সেই স্থির মুখখানা ভেসে ওঠে।
জয়শ্রী কবিরের জীবনপথও তার সিনেমার মতোই নীরব ও নাটকীয়। কলকাতার মেয়ে, ১৯৬৮ সালের মিস ক্যালকাটা—এই পরিচয়গুলো পরে জেনেছি। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ দিয়ে তার অভিনয় জীবনের সূচনা। সংলাপের চেয়ে চোখে-মুখে দ্বন্দ্ব আর সংশয়ের ছায়া ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাকে শুরুতেই আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’-এও তিনি বড় নায়কের ছায়ায় ঢাকা পড়েননি।
জয়শ্রী কবিরের অভিনয়ের মূল শক্তি ছিল তার স্টাইল—চিৎকার নয়, চোখের ভাষা; গ্ল্যামার নয়, নীরবতা। সাদাকালো পর্দায় তাঁতের শাড়ি, কপালে বড় টিপ, ধীরস্থির কণ্ঠে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির রুচিশীল আভিজাত্যের প্রতীক। তার অভিনয় দেখলে মনে হতো, তিনি অভিনয় করছেন না—চরিত্রের ভেতরেই বাস করছেন।
তবে জয়শ্রী কবিরকে সত্যিকার অর্থে আপন করে নিয়েছে বাংলাদেশি সিনেমা। আলমগীর কবিরের পরিচালনায় একের পর এক ছবিতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের প্রতিনিধি। ব্যক্তিজীবনে ১৯৭৫ সালে আলমগীর কবিরকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। এই সম্পর্কটি ছিল শিল্প আর জীবনের এক সংযোগ, যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিচ্ছেদের পর ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবু বাস্তবতার চাপে তিনি সরে গেলেন আলোর কেন্দ্র থেকে—প্রথমে কলকাতা, পরে লন্ডন।
লন্ডনে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন, একমাত্র সন্তান লেনিন সৌরভ কবিরকে নিয়ে গড়ে তোলেন এক ভিন্ন জীবন। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও শিল্পমন তাকে ছেড়ে যায়নি। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন প্রায় নিখোঁজ। বাংলাদেশি দর্শক শুধু জানত—তিনি কোথাও আছেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে। এই দীর্ঘ আড়াল যেন তার জীবনের আরেক অধ্যায়, যেখানে নীরবতাই ছিল মুখ্য।
শেষ পর্যন্ত সেই নীরবতার মধ্যেই আসে তার জীবনের পরিসমাপ্তি। গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনের রমফোর্ড নার্সিং হোমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জয়শ্রী কবির। তার মৃত্যুসংবাদ অনেকের কাছেই ছিল এক ধরনের শূন্যতার খবর—যেন আমাদের যৌবনের, আমাদের সাদাকালো দিনের এক টুকরো স্মৃতি চিরতরে হারিয়ে গেল। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন তার অভিনীত চরিত্র, দৃশ্য আর গানগুলো।
আজকের ঝলমলে, রঙিন সিনেমার যুগে ফিরে তাকালে সেই সাদাকালো দিনের জয়শ্রী কবিরকে বড় বেশি মনে পড়ে। তার দীর্ঘ আড়াল, নীরব প্রস্থান আর মৃত্যুর পরের শূন্যতা—সব মিলিয়ে তিনি যেন এক বিষণ্ণ, সুন্দর উপাখ্যান। তিনি রেখে গেছেন এমন কিছু চলচ্চিত্র, যা সময়ের ধুলোয় মলিন হবে না।