Published : 18 Oct 2025, 10:40 AM
ট্রাম্প প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বন্দী বিনিময়ের শর্তে হামাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী যেসব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দাবি করেছিল, তাদের মধ্যে একটি নাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মারওয়ান বারঘুতি। হামাসের মতে, তার মুক্তি এই চুক্তির কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু বারবারের মতো এবারও ইসরায়েল তার নামটিকে বাদ দিয়েছে। কেন? আর কে এই বারঘুতি?
মারওয়ান বারঘুতি ফিলিস্তিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। বিশ্বব্যাপী তিনি পরিচিত ‘ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা’ হিসেবে। ঠিক ম্যান্ডেলার মতোই বা তার চেয়েও কঠোর—তার জীবনের ইতিহাস। ৬৬ বছরের পূর্ণ জীবন তিনি উৎসর্গ করেছেন ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার সংগ্রামে। ২০০২ সাল থেকে তিনি ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী। ২০০৪ সালে ইসরায়েল তাকে ১৪০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তার হাতকড়া পরা উত্তোলিত হাতের ছবিতে ঢাকা ফিলিস্তিনের দেয়ালগুলো। অথচ তার মুক্তির প্রশ্নটি ইসরায়েল বারবার পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
কেবল তাই নয়, বারবার তাকে বর্বোরোচিত উপায়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর থেকে তাকে নির্জনকক্ষে একা বন্দী করে রাখা হয়েছে। একাধিকবার কারাগারে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি নির্যাতন ছিল তাকে হত্যা করার কিংবা তাকে ফিলিস্তিন রাজনীতিতে সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন করে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। তার ছেলে আরব বারঘুতি জানিয়েছেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর তার ওপর প্রহরীরা যে নির্যাতন করে তাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন ও তার পাঁজরের পাঁচটি হাড় ভেঙে যায়।
স্কুলজীবনেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে তিনি ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে বন্দী হন। কারাপ্রহরীরা তাকে উলঙ্গ করে তার যৌনাঙ্গে ক্রমাগত প্রহার করে ও উল্লাস করে বলে যে, তিনি কখনো সন্তানের বাবা হতে পারবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি আবারও ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে বন্দী হন ও ছয় মাস জেল খাটেন। জেলে তিনি হিব্রু ভাষা শেখেন ও ইসরায়েলি পত্রপত্রিকা পড়তে শুরু করেন। তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন একবার কারাগারের বাইরে, অরেকবার ভেতরে—এভাবে কাটে। কারাগারে নানা বিষয়ে বইপত্র পড়ে তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
১৯৮৭ সালে ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে জর্ডানে বিতাড়িত করে। তিনি স্ত্রী ও শিশুসন্তানদের নিয়ে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে চলে যান। ১৯৯৩ সালে ইয়াসির আরাফাত ও ইতজাক রাবিনের মধ্যে অসলো চুক্তির পর তিনি পশ্চিম তীরে ফিরে আসেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সেখানে ফাতাহর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি ফিলিস্তিন আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময়ে ইসরায়েলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তিনি হয়ে ওঠেন ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য পৃথক দুই রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থক। ইয়াসির আরাফাত তাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তিনি আরাফাতের পর ফিলিস্তিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন।
২০০০ সালে এরিয়েল শ্যারনের নেতৃত্বে ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক ভূমিকার কারণে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যেকার শান্তি প্রক্রিয়া আবার ভেঙে পড়ে। বারঘুতিকে হত্যা করার বিভিন্ন চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০২ সালে ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে আটক করে এবং কয়েকটি হত্যা মামলায় জড়ায়। তিনি অভিযোগ ও মামলা পরিচালনায় আদালতের বৈধতা অস্বীকার করেন। এই পুরো সময় তাকে একা একটি ছোট্ট কক্ষে আটক রাখা হয়।
দ্য ইকোনোমিস্ট (Marwan Barghouti, the world’s most important prisoner By Nicolas Pelham, ২২ জুলাই ২০২৪) লেখে, “২০০৫-এর পরের দিকে কর্তৃপক্ষ তাকে অন্য বন্দীদের সঙ্গে মিশতে দেয়, সম্ভবত হামাসের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বোঝানোর জন্য। নির্জনতা থেকে বেরিয়েই তিনি জেলখানাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেন, সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বক্তৃতা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। তিনি প্রহরীদের বলতেন, ‘তোমরা আমাদের দেহ দখল করেছো, মন দখল করতে পারবে না’।”
ইকোনোমিস্ট লেখে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে ১২০০ কারাবন্দী স্নাতক পাশ করেন। বারঘুতি নিজে জেলখানা থেকে ফিলিস্তিনে গণতন্ত্র বিষয়ে তার পিএইচডি গবেষণা শেষ করেন। তিনি বিভিন্ন বই, চীনের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ইসলামে ধর্মীয় সহনশীলতা ইত্যাদি নিয়ে বক্তৃতা করতেন ও অন্য বন্দীরা তাকে সেজন্য ’প্রফেসর’ বলত।
২০০৪ সালে আরাফাতের মৃত্যুর পর প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির নেতৃত্ব বর্তায় মাহমুদ আব্বাসের হাতে। কিন্তু দুর্বল নেতৃত্ব, দুর্নীতিপরায়ণতা, ইসরায়েলতোষণ, সংকীর্ণতা ইত্যাদি তাকে অজনপ্রিয় করে তুলেছে। তবু আব্বাস নেতৃত্ব ছাড়তে অনিচ্ছুক। অন্যদিকে, বারঘুতির বিপুল জনপ্রিয়তা সকল পক্ষের কাছেই ভয়ের। ইসরায়েলেরও ভয়—তার জনপ্রিয়তা এবং ফিলিস্তিন জুড়ে তার একক গ্রহণযোগ্যতা। তাদের দ্বিতীয় ভয় তার শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
ইকোনোমিস্ট পত্রিকার পেলহামকে তার স্ত্রী ফাদওয়া বলেন, “ইসরায়েল তাকেই পছন্দ করে যে বলে, আমরা ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করি না।” তাদের ছেলে আরব বারঘুতি অগাস্টে সিএনএন-এর বেকি অ্যান্ডারসনের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে একইভাবে বলেন, ইসরায়েল তার বাবাকে মুক্তি দেয় না কারণ “নেতানিয়াহু শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে কোনো সহযোগী পছন্দ করে না।”
জেটেও-তে মেহেদি হাসানের এক প্রশ্নের জবাবে আরব বারঘুতি বলেন, “কোনো ফিলিস্তিনি যে তার বাবার মুক্তি চায় না তাকে নিজের ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখতে হবে।” আমরা এ কথাটিকে প্রসারিত করে বলতে পারি, বিশ্বে যারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চায় না তাদেরও ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা উচিত।
সম্প্রতি ইসরায়েলি কারাগারে বারঘুতির ওপরে যেসব শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়েছে তাতে মেহেদি হাসানের আশঙ্কা হচ্ছে, তা মোকাবেলা করে তিনি আর কতদিন বেঁচে থাকতে বা ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থায় থাকতে পারবেন। তাকে শেষ করে বা শারীরিক-মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিতে পারলে ইসরায়েলের লাভ ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনের সম্ভাবনা নস্যাৎ করা। বারঘুতিই এখন ইসরাযেলের ও তার সমর্থক পশ্চিমা শক্তির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
ওই কারণে এখন বিশ্বের যে প্রান্তে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবি তোলা হয় সেখানেই মারওয়ান বারঘুতির মুক্তির দাবিও অপরিহার্য। কেননা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও ইসরায়েলের অমানবিক জেলখানা থেকে মারওয়ান বারঘুতির মুক্তি একসূত্রে গাঁথা। তার বিচারকালে বারঘুতি বলেছিলেন, তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয় দেশের জনগণের মুক্তি চান। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর পছন্দ সন্ত্রাসী, ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা বারঘুতিকে নয়। মারওয়ান বারঘুতির মুক্তি তাই এত জরুরি।