Published : 01 Oct 2025, 01:26 AM
মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় আরেকটি ‘শান্তি পরিকল্পনা’ সামনে আনা হল, এবার ২০ দফার। আগেরবারের ব্যর্থ কূটনীতির মতই এটি এসেছে ব্যর্থতার পূর্বাভাস নিয়ে।
গাজার ধ্বংসস্তূপ আর দশকের পর দশক ধরে চলা ব্যর্থ আলোচনার ভেতর থেকে আসা এই প্রস্তাবকে ‘স্থিতিশীলতার পথ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
কিন্তু একটু নজর বোলালেই বোঝা যায়, এটা শান্তির রূপরেখা নয়; বরং সংঘাতের মূলে থাকা অবিচারগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করার উপায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়ার আগে কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কেন যুক্তরাষ্ট্র, কেন জাতিসংঘ নয়?
এই পরিকল্পনার মূল ত্রুটি তার উৎসে।
যে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ও আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করে, সেই দেশ কী করে ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ হতে পারে? এটি মধ্যস্থতা নয়; চাপিয়ে দেওয়া।
সব দুর্বলতা নিয়েও জাতিসংঘ একটি বহুপক্ষীয় মঞ্চ, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক ঐকমত্যের প্রাধান্য থাকার কথা। সেই জাতিসংঘ কেন এ উদ্যোগ নেবে না?
অথচ যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ইতিহাস বহু পুরনো। এর মূল কারণ, ইসরায়েলকে কখনোই সেসব আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করা হয়নি, যেগুলো অন্যদের মানতে বলা হয়।
এই পরিকল্পনা নিরপেক্ষ কোনো দলিল নয়; এটা যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ফর্দ।
বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি কীভাবে সমীকরণ বদলে দিল?
জাতিসংঘের ১৪০টির বেশি সদস্য দেশ ফিলিস্তিনকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কোনো কোনো দেশ সেই স্বীকৃতি দিয়েছে বহু বছর আগে। মৌলিক এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মার্কিন পরিকল্পনায় উপেক্ষা করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে।
এই বৈশ্বিক ঐকমত্য ইসরায়েলকে—এবং তার প্রধান মদদদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছে এবং মরিয়া হয়ে ‘মুখ রক্ষার’ পথ খুঁজছে।
কিন্তু এই চাপের আরেকটি অর্থ হল, ফিলিস্তিনিদের সমান সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা না দিয়ে ভিখারির মত দেখাতে চাইলে কোনো পরিকল্পনাই টেকসই হবে না।
অভিভাবকসুলভ দয়া নয়, এখন সময়ের দাবি হল পারস্পরিক স্বীকৃতি।
অথচ রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে আবারও সেই সূচনারেখায় ফিরিয়ে নিতে চাওয়া হচ্ছে, যে রেখা তারা বহু আগেই অতিক্রম করে এসেছে বলে স্বীকার করে নিয়েছে বিশ্ব।
ইসরায়েলের এখন সাহায্য প্রয়োজন, সেটাই কি বলছে এ পরিকল্পনা?
সময়ই বলে দিচ্ছে, এটি মোটেও দৈবসংযোগ নয়। অতীতের নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের কারণে তীব্র আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং বিচারিক চাপের মুখে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বৈধতা এখন গভীর সংকটে।
সেই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ সত্যিকারের শান্তি প্রস্তাবের চেয়ে ইসরায়েলের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রক্ষাকবচের মতই দেখাচ্ছে। এ এমন এক চেষ্টা, অন্যায়গুলো মোকাবিলা না করে দায় চাপানো নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠাই যার মূল লক্ষ্য।
কিন্তু আগ্রাসন, অবিচার আর বৈষম্যের মত গভীর কাঠামোগত যে ক্ষতগুলো তৈরি হয়ে আছে, এই ধরনের রক্ষাকবচ তা ঢাকতে পারবে না।
এই পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে একঘরে হয়ে পড়া ইসরায়েলকে এই দফা উদ্ধার করা যায়, ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার দেওয়ার কোনো লক্ষ্য এ পরিকল্পনার নেই।
বাস্তবায়ন কোন সীমানা ধরে?
এ পরিকল্পনায় যে মূল বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত, তা হল ভূখণ্ড। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কী ১৯৬৭ সালের আগের সীমান্তের ভিত্তিতে হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত?
এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে অস্বীকার করাই আসলে এক ধরনের স্বীকারোক্তি।
এটা সেই চরম অস্পষ্টতার ধারাবাহিকতা, যা ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনকে অবিরাম সম্প্রসারণের সুযোগ করে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে কতগুলো বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে পরিণত করেছে।
১৯৬৭ সালের আগের সীমানার ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট, সার্বভৌম এবং সংযুক্ত ভূখণ্ড ছাড়া, ‘রাষ্ট্র’ সম্পর্কিত যে কোনো আলাপ হবে নিষ্ঠুর কল্পকাহিনীর নামান্তর।
সেই সন্দেহজনক চরিত্রগুলোর উপস্থিতির কী মানে?
এই পরিকল্পনার সঙ্গে টনি ব্লেয়ারের মত ব্যক্তিদের জড়িত থাকার যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা বস্তুত এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বুদ্ধিমত্তার প্রতি স্পষ্ট অবমাননা।
এই টনি ব্লেয়ারই ইরাকের বিপর্যয়কর পরিণতিকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য অবলিলায় ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা গল্প শুনিয়েছেন। এবং ধ্বংসযজ্ঞ সারা হলে তবেই ‘ভুল’ স্বীকার করেছেন। এরপর তার আর কোনো নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না।
তার সেই ভূমিকাই ইঙ্গিত করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এবারের পরিকল্পনা কোনো নৈতিক ভিত্তির ওপর তৈরি হয়নি বরং সেই মিথ্যার নীতিতে তৈরি হয়েছে, যা এই শতকের পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলো ঘটিয়েছে।
পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে কী হবে?
পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে কোনো কথা এই পরিকল্পনায় নেই। সেটা অসাবধানতায় বাদ পড়ে গেছে ভাবলে ভুল হবে। বরং এটাই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য কী।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমকে স্পষ্টভাবে ভবিষ্যতের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত না করে এই পরিকল্পনা ইসরায়েলের অবৈধ আগ্রাসনকেই সমর্থন দিচ্ছে।
জেরুজালেম নিয়ে বিরোধ মামুলি কোনো জমির মামলা নয়। জেরুজালেম হল ফিলিস্তিনের জাতীয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের হৃৎপিণ্ড।
কোনো পরিকল্পনায় যদি জেরুজালেম নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকে, তাহলে সেটাকে শান্তি পরিকল্পনা না বলে আত্মসমর্পণের দলিল বলা ভালো।
গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে কী ভাবনা
মার্কিন পরিকল্পনায় গাজার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, কিন্তু ফিলিস্তিন এই শহরটি যে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
গাজা কি তাহলে আগের মত সেই খোলা আকাশের নিচে এক বিশাল কারাগার হিসেবেই থেকে যাবে?
আর পরিকল্পনায় ‘পুরো পশ্চিম তীর’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? সেখান থেকে কি ইসরায়েলি বাহিনীকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে? সব অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করা হবে?
নাকি সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার ‘বানতুস্তান’ মডেলের বাস্তবায়ন হবে?
বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছে পরিকল্পনার বিস্তারিত অংশে। আর সেই বিস্তারিত অংশটিই পরিকল্পনায় অনুপস্থিত।
ব্যর্থতার ইতিহাস থেকে আদৌ কিছু শিখেছে যুক্তরাষ্ট্র?
১৯৯০-এর দশকে ক্লিনটন প্রশাসনের আলোচনা আর অসলো চুক্তি যে ভেস্তে গিয়েছিল, সেটা ফিলিস্তিনিদের সদিচ্ছার অভাবের কারণে নয়। কেন সেটা ঘটেছিল, নরম্যান ফিঙ্কেলস্টাইনের মত গবেষকরা সেটা বেশ স্পষ্ট করেই দেখিয়েছেন।
মার্কিন মধ্যস্থতার সেই শান্তি আলোচনা আদতে ছিল ইসরায়েলকে ভূমি দখল চালিয়ে যেতে দেওয়ার একটি আচ্ছাদন।
ফিলিস্তিনের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত তার অবস্থানে অনড় ছিলেন–এমনও নয়। তাকে এমন একটি বাজে চুক্তি মেনে নিতে বলা হচ্ছিল, যা আসলে ইসরায়েলি দখলকেই বৈধতা দিচ্ছিল।
বর্তমান পরিকল্পনাটি সেই ব্যর্থ কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে হচ্ছে। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো চেষ্টা এখানে দেখা যাচ্ছে না।
গাজার পুনর্গঠনে লাভ কার হবে?
গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনা শুরুতেই একটি সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
এটা ফিলিস্তিনি জনগণের ক্ষমতায়নের একটি প্রকল্প হবে?
নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা বোমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা গাজার পুনর্গঠনের নামে সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশল ও নির্মাণ কোম্পানিগুলোকেই বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেবার জন্য?
গাজার পুনর্গঠন অবশ্যই হতে হবে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তদারকিতে, মার্কিন সরকারের তত্ত্বাবধানে মার্কিন কোম্পানিকে দিয়ে নয়।
ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব দেবে কে? কী হবে তাদের ভবিষ্যত?
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
সেখানে কি এমন সরকার বসানো হবে, যারা ইসরায়েলি নিরাপত্তার ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে, যাতে করে তারা ফিলিস্তিনি জনগণ থেকে আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়?
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ফিলিস্তিনিদের জাতীয় আন্দোলন একসময় ছিল ধর্মনিরপেক্ষ একটি ধারা, যা আরাফাত এবং জর্জ হাবাশের মত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে এগিয়ে চলছিল।
এরপর কয়েক দশকের মধ্যে তা চরমপন্থি চেহারা নেয়। সেকুলার পিএলওকে দুর্বল করার জন্য এর পেছনে যে ইসরায়েলি ইন্ধন ছিল, তার যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা ঐতিহাসিক সেই অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি করে না। ফিলিস্তিনিদের কাঙ্ক্ষিত মর্যাদাপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিকাশের কোনো পথও দেখায় না।
এই মার্কিন পরিকল্পনা কোনো সমাধান নয়। এটি হল উত্তরহীন একগুচ্ছ প্রশ্নের একটি তালিকা, যা সাজানো হয়েছে সংঘাতকে জিইয়ে রাখার জন্য।
যতক্ষণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সততার সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে দেওয়া না হচ্ছে, ততক্ষণ এর পরিণতি অতীতের উদ্যোগগুলো থেকে আলাদা কিছু হবে না। ইতিহাসের আবর্জনার স্তূপই হবে এর ভবিষ্যৎ।
ফিলিস্তিনি জনগণ এসব প্রশ্নের উত্তর চায়, তারা মার্কিন হুকুম শুনতে চায় না।
[লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত। মূল পাঠ: Questions the US plan on Palestine does not answer ]