Published : 03 Mar 2026, 08:16 AM
প্রায় দেড়শ বছর আগে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কলকাতার মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে লিখেছিলেন, ‘রাতে মশা, দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতায় আছি।’ জমানা বদলেছে, শাসক বদলেছে, সাইনবোর্ড বদলেছে, এমনকি শহরের আকাশরেখাও বদলেছে। কলকাতা হয়তো কিছুটা ‘বাম’ ও ‘মশা’ মুক্ত হয়েছে, অন্তত সেখানে মশা নিয়ে কবিতা লিখে টিকে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু আমাদের তিলোত্তমা ঢাকা শহর এখন মশা আর মৌলবাদী রাজনীতির অভয়ারণ্য; একটি চোখে মতাদর্শের জ্বর, আরেক চোখে মশার কামড়ের চুলকানি। ঈশ্বরগুপ্ত বেঁচে থাকলে নির্ঘাৎ কবিতা বদলাতেন: ‘দিনে মশা রাতেও মশা/ঢাকার নাগরিকের করুণ দশা।’ হয়তো আরও একটি লাইন যোগ করতেন: ‘ঘুম নেই, শান্তি নেই, কেবল চুলকানিই ভাষা।’
রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব সব সীমা ছাড়িয়েছে। ঢাকার মশা এখন আর কেবল পতঙ্গ নয়, তারা রীতিমতো এক সংগঠিত বাহিনী, যেন আলাদা মন্ত্রণালয় খুলে ফেলেছে। নালা-নর্দমা থেকে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে যুদ্ধবিমান বা মিসাইলের মতো ধেয়ে আসে, আগে স্কাউট দল পাঠায়, পরে মূল বাহিনী। নালা-নর্দমায় ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছে। মহানগরের অনেক এলাকায় দিনে-দুপুরেও মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হয়, এ যেন রোদেলা দুপুরে কারফিউ। মশা মারার প্রধান দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর থেকে সিটি করপোরেশনগুলো যেন অবসরযাপনে ব্যস্ত, যেন সরকারি ছুটির ক্যালেন্ডার স্থায়ী করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। প্রশাসকরা আছেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান তৎপরতা কম; ফাইল চলে, কিন্তু ফগার চলে না। মাঝে মধ্যে দু-এক জায়গায় ওষুধ ছিটানো হয়, সেটাও অনেকটা ছবি তোলার উপযোগী সময় বেছে। তখন মশারা কাকের মতো অন্য পাড়ায় পালিয়ে যায়, যেন পূর্বনির্ধারিত মহড়া আছে। ওষুধের ঝাঁঝ কমলেই আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসে, পুরোনো ঠিকানায় ফিরে আসা উদ্বাস্তুদের মতো।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। প্রতি বছরই এই সময় একই চিত্র দেখা যায়—বিবৃতি বদলায়, বাস্তবতা বদলায় না। প্রজননস্থল পরিষ্কার করলেই উপদ্রব অনেকটা কমানো সম্ভব। প্রশ্ন হলো, সেটা হচ্ছে না কেন? কারণ দেশে আপাতত কোনো কার্যকর অভিভাবকত্ব নেই। সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে নর্দমা পরিষ্কার—সবকিছুই যেন ঠিকাদার আর থার্ড পার্টির হাতে সোপর্দ। কাজের চেয়ে টেন্ডারের খবর বেশি শোনা যায়। ফলে লাউ আর কদুর তফাৎ বোঝা যায় না, কেবল বিল আর বিলম্বের পার্থক্য বোঝা যায়। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, কামড়ের দাগে যেমন চামড়া ফুলে ওঠে, তেমনি ক্ষোভও ফুলে ওঠে। সিটি করপোরেশনের নির্বাচন কবে হবে, আদৌ হবে কি না—এ নিয়ে কারও মুখে কথা নেই। সবাই এখন মসনদ আর পদ ভাগাভাগির অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত; মশার কামড়ে অতিষ্ঠ আমজনতার কথা ভাবার সময় কারো নেই, যেন নাগরিক মানেই শুধু ভোটার, ভুক্তভোগী নয়।
ঢাকা শহরে এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে মশা নেই—উচ্চবিত্তের গুলশান থেকে নিম্নবিত্তের ঝুপড়ি, সর্বত্র সমতা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। গত চার দশকে এত প্রকট ও বিকট মশার উপদ্রব কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মব-ভায়োলেন্স কমলেও মশার হুল ফোটানো কমেনি; বরং হুলের গণতন্ত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সুবাতাস পেয়েই কিনা কে জানে, মশককুল যেন আরও সংগঠিত, আরও বেপরোয়া; যেন তাদেরও নিজস্ব ম্যানিফেস্টো আছে: ‘প্রতিটি রক্তবিন্দু আমাদের অধিকার।’
চড়থাপ্পড়, কয়েল, অ্যারোসল, গুডনাইট—কিছুতেই তাদের কাবু করা যাচ্ছে না। কয়েলের ধোঁয়ায় মানুষ কাশে, মশা নয়। আমেরিকা-ইরানের মিসাইল আর যুদ্ধজাহাজ ছাড়া এদের দমনের আর কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না! মনে হয় জাতিসংঘে প্রস্তাব উঠুক: ‘ঢাকা নগরীকে মশামুক্ত করতে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা হোক।’
মশা ক্ষুদ্র হলেও তুচ্ছ নয়। ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে নমরুদের কাহিনি আমরা জানি। মশার শক্তিকে অবহেলা করার ফলেই খোদাদ্রোহী নমরুদের পতন। একটি মশা তার নাক দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে গিয়ে তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে—অহংকারের প্রাসাদে ক্ষুদ্র এক ফাটল। যন্ত্রণায় সে নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করে, পরে সৈনিককে ডেকে আঘাত করায়। শেষ পর্যন্ত সেই আঘাতেই তার মৃত্যু। ক্ষুদ্র প্রাণী, কিন্তু পরিণাম ভয়ংকর—এ যেন ইতিহাসের উপদেশ: ছোট বিপদকে অবহেলা করলে বড় পরিণতি অবশ্যম্ভাবী।
বাংলাদেশ বারো রকম মানুষের দেশ। মশার প্রজাতি তার চেয়েও বেশি—তাদেরও যেন বৈচিত্র্যের উৎসব চলছে। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, দেশে প্রায় ১২৩ প্রজাতির মশা আছে। সবগুলো কামড়ায় না, তবে ১৬ প্রজাতির প্রকোপ বেশি। স্ত্রী কিউলেক্স ও স্ত্রী অ্যানোফিলিস বেশি রক্ত পান করে—পুরুষরা অনেকটা দর্শকের ভূমিকায়। একটি মশার ওজন গড়ে ২.৫ মিলিগ্রাম—ক্ষুদ্র, কিন্তু প্রভাব বিস্তারে বিশাল। এক থেকে তিন মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে, ঘণ্টায় প্রায় ২.৫ কিলোমিটার বেগে; অর্থাৎ আপনার বাসা বদলালেও সে ঠিকানা খুঁজে নিতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ থেকে ৩০০ বার পাখা নাড়ে—এত পরিশ্রম আমরা ভোটের সময়ও করি না। রক্তচোষা স্ত্রী মশা ১৩৫ থেকে ১৬০ ফুট দূর থেকেও খাবারের উপস্থিতি টের পায়—যেন সুগন্ধি রাডার আছে। রাজধানীসহ দেশে বছরজুড়ে যে মশা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার ৯৫ শতাংশের বেশি কিউলেক্স। আছে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা। এদের কামড়ে গোদ ও নানা চর্মরোগ, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া হয়—অর্থাৎ কামড় শুধু চুলকানিই নয়, সামাজিক স্বাস্থ্যব্যয়েরও কারণ।
মশার জীবনচক্র আর সন্ত্রাসীদের জীবনচক্রের মধ্যে অদ্ভুত মিল। সন্ত্রাসীদের যেমন অস্ত্র আর রাজনৈতিক আশ্রয় লাগে, মশার লাগে প্রোটিন—রক্তই তাদের পুঁজি। একটি স্ত্রী মশা তার স্বল্প জীবনে ১০ হাজার ডিম পাড়ে। অর্থাৎ যত বেশি মানুষের রক্ত, তত বেশি বংশবৃদ্ধি—একটি অদৃশ্য জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। সন্ত্রাসীদের আয়ু যেমন কম হয়, পুরুষ মশার আয়ুও তেমন—মাত্র ১০ থেকে ২০ দিন। কিন্তু এই অল্প সময়েই তারা আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে, রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, দিনের মনোযোগ নষ্ট করে। স্বল্পায়ু, কিন্তু কার্যক্ষম—এ যেন ‘কম সময়ে বেশি ক্ষতি’ তত্ত্বের জীবন্ত উদাহরণ।
মশা মারতে কয়েল, অ্যারোসল, বৈদ্যুতিক যন্ত্র—সবই চলছে। সকাল, সন্ধ্যা, রাত—অবস্থা একই; কেবল বিদ্যুতের বিল বাড়ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি গবেষক দল নিয়মিত জরিপ করে জানিয়েছে, মাসে মাসে মশার সংখ্যা বাড়ছে। এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে—আজ কামড়, কাল জ্বর, পরশু হাসপাতালের শয্যা।
কিন্তু কর্তৃপক্ষের তৎপরতা চোখে পড়ে না। সবাই দায় চাপায় অন্যের ঘাড়ে—যেন দায়ও মশার মতো উড়ে বেড়ায়। দেশে মশা খুব বড় ইস্যু নয়। আমাদের নজর থাকে বড় বড় বিষয়ে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কে খেলবে, কে খেলবে না; ইরান-মার্কিন যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে; ইসরায়েল-ভারত সম্পর্ক বিশ্বরাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে। টকশোতে উত্তাপ ও উপদেশ আছে, কিন্তু নর্দমা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেই। নিজের বাড়ির বারান্দায় জমে থাকা পানিটা যে আগামীকালের ডেঙ্গুর বীজ, সে নিয়ে ভাবি না; ভাবলেও দুই দিন পর ভুলে যাই।
গত বছর এডিস মশার বংশবিস্তার রাজধানীকে কী ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল, নগরবাসী তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে—হাসপাতালের বারান্দা পর্যন্ত ভর্তি ছিল। সামনে বর্ষা। ময়লা পানি জমবে, আর সেটাই হবে মশার প্রজননক্ষেত্র—প্রকৃতি তার কাজ করবে, আমরা কি আমাদের কাজ করব?
সন্ধ্যা নামলেই মশার পাল যেন যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে ধেয়ে আসে। কানের পাশে অদ্ভুত সুরে গান গেয়ে, নাক-মুখে ওড়ে—বিরক্তির শেষ নেই। হাত-পা চুলকাতে চুলকাতে গায়ের চামড়া লাল হয়ে যায়; আঁচড়াতে আঁচড়াতে যেন মানচিত্র এঁকে ফেলি শরীরে। তার ওপর ‘ডেঙ্গু’ নামক ঘরের শত্রু বিভীষণ তো আছেই—অদৃশ্য আতঙ্ক, দৃশ্যমান জ্বর।
এমতাবস্থায় সমাধান কী? সিটি করপোরেশন সক্রিয় হবে, এই আশা করা এখন বাতুলতা—আশা করতে দোষ নেই, ফল মেলে কম। তাই ‘নিজের মশা নিজে মারুন’ নীতিই শ্রেয়। সম্ভব হলে নভোচারীদের মতো স্পেস-স্যুট পরে রাস্তায় বের হন—হেলমেট, গ্লাভস, বুট সবকিছুসহ। রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে পুলিশের পোশাক যদি বারবার বদলানো যায়, তবে মশা থেকে বাঁচতে জনগণের জন্য বিশেষ বর্ম কেন দেওয়া হবে না—কমপক্ষে সরকারের আগামী ১০০ দিনের কর্মসূচিতে এটা রাখা যেতে পারে!
মশা যাতে কামড়ানোর মতো কোনো ফাঁক না পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শরীরে মশকনিধনের ওষুধ মেখে চলতে হবে—যেন চলমান রাসায়নিক প্রাচীর। পাড়া-মহল্লায় মশা মারা প্রশিক্ষণকেন্দ্র খোলা যেতে পারে। জিম যদি শরীর গঠনের জন্য থাকে, তাহলে শরীর রক্ষার জন্য মশা মারার ট্রেনিং সেন্টার থাকবে না কেন? এই ট্রেনিং সেন্টারে হাত দিয়ে, দাঁত দিয়ে, এমনকি নিঃশ্বাসের ঝাপটায় মশা মারার নানা কৌশল শেখানো হবে—‘মশা এলো, ঘায়েল হলো’ মন্ত্রে। দ্রুত প্রতিক্রিয়া, নিখুঁত থাপ্পড়, লক্ষ্যভেদ—সবই থাকবে সিলেবাসে।
আর যদি কিছুতেই কাজ না হয়, তবে শেষ উপায়—পুরো বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে বিছানায় শুয়ে আগুন ধরিয়ে দিন। মশাও পুড়বে, আপনিও পুড়বেন। তিলে তিলে মশার কামড়ে ধুঁকে মরার চেয়ে এই ‘অগ্নিস্নান’ অনেক বেশি বীরত্বের—প্রতিবাদের আগুনে পুড়ে যাক অসহায়তা। অন্তত কোনো এক তালিকায় নাম উঠলে আপনার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো ‘মশক-শহীদ’ কোটায় কিছু সরকারি ভাতা পেলেও পেতে পারে!
জয় হোক বঙ্গসন্তানের, জয় হোক মশককুলের—কারণ ঢাকা শহরে আপাতত দুপক্ষই সমানে লড়ছে।