Published : 07 Jul 2026, 09:25 PM
‘সমতা ও ন্যায্যতা’ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের মহাসচিব বাছাই প্রক্রিয়া পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
মহাসচিব পদে বাছাইয়ের একমাত্র ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রাখার পরিবর্তে সাধারণ পরিষদের ভূমিকা বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার ‘বিভক্ত বিশ্বে জাতিসংঘের নেতৃত্ব নিয়ে পুনর্ভাবনা: বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনায় এ বিষয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও সমতা ও ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এর পদ্ধতিতে বড় রকমের পরিবর্তন আনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা জানেন, এখনকার পদ্ধতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব হিসাবে কেবল একজন প্রার্থীকে ঠিক করে দিয়ে পরবর্তী ধাপে পাঠায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
“এটা ন্যায্য হতে পারে না এবং প্রতিনিধিত্ব ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়ায় এটা কোনো টেকসই ব্যবস্থাও হতে পারে না।”
হুমায়ুন কবির বলেন, “আমার মতে বাস্তববাদী ভবিষ্যৎ পথরেখা হতে পারে এরকম–জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে সংক্ষিপ্ত তালিকা করার এবং তারা সেটা সাধারণ পরিষদে পাঠাবে।
“এরপর সাধারণ পরিষদ এখনকার মত একমাত্র প্রার্থীকে অনুমোদন দিয়ে কাজ সারার পরিবর্তে প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার উপর ভোট দিতে পারবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সংক্ষিপ্ত তালিকা বা একাধিক নাম দিতে হবে, যাতে বাছাই করার সুযোগ থাকে।”
জাতিসংঘ মহাসচিবের পদে ‘স্বচ্ছ, অন্তর্ভূক্তিমূলক, মেধাভিত্তিক এবং লিঙ্গ সমতাভিত্তিক’ বাছাই প্রক্রিয়া নিশ্চিতের দাবিতে বিশ্বব্যাপী ‘ওয়ান ফর এইট বিলিয়ন’ প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে এ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাতিসংঘের ৮১ বছরের যাত্রায় কোনো নারী মহাসচিব না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এবার যেন একজন নারী মহাসচিব আসে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান আসে আলোচনা অনুষ্ঠান থেকে।
আলোচনা সভায় বলা হয়, পরবর্তী মহাসচিব পদে ছয় প্রার্থীর মধ্যে চারজন নারী থাকায় এবার একজন নারী মহাসচিব পাওয়ার সুযোগ দেখছেন অনেকে।
এ নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদ সর্বেসর্বা হওয়ার কারণে মহাসচিব পদের প্রার্থীরা আগেই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আপসে চলে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ভাঙতে চাইছে ‘ওয়ান ফর এইট বিলিয়ন’ প্রচারাভিযান।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন বলেন, “বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক হওয়াটাও সমানভাবে অত্যাবশ্যক। এই প্রক্রিয়া উন্মুক্ত, মেধা-ভিত্তিক, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক হলে এটা জাতিসংঘ মহাসচিব এবং প্রতিষ্ঠান হিসাবে জাতিসংঘের বৈধতাকে জোরদার করবে।
“সুশাসনের নীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সবসময় যে মূলনীতির কথা বলে থাকে, এই মূল্যবোধগুলো তার সঙ্গে জোরালোভাবে মেলে।”
তিনি বলেন, “জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন কেবল এক ব্যক্তিকে বাছাই করা নয়, বরং এটি হচ্ছে, ক্রমাগত অনিশ্চিত ও বিভক্ত বিশ্বের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নির্দেশনা দিকে সক্ষম একজন নেতাকে ঠিক করা।
“সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে আলোচনা যুক্ত হওয়ার মত প্রশ্নাতীত সততা, স্বাধীনতা, পেশাগত উৎকর্ষ, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং নৈতিক কর্তৃত্ব অবশ্যই পরবর্তী মহাসচিবে থাকতে হবে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, জাতিসংঘ সনদের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থেকে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে ঐক্য গড়তে পারেন–এমন একজন নেতা জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয়ে দরকার।”
বৈশ্বিক বিরোধ মেটানো এবং পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের কাজের ওপর জোর দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক বিভক্তির মধ্যে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন জাতিসংঘ মহাসচিবকে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে।
“তাকে অবশ্যই বৈশ্বিক বিষয়াবলিতে সামগ্রিক বোঝাপড়া নিয়ে সহযোগী হওয়ার যোগ্য, দরকষাকষি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হবে। জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সক্ষম হতে হবে।”
তার ভাষ্য, বর্তমান বাছাই প্রক্রিয়ায় মেধা-ভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘কিছুটা সীমাবদ্ধতা’ রয়েছে এবং বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নেতৃত্বের গঠন প্রক্রিয়ায় অনেক সময় রাজনৈতিক মতৈক্য বা রাজনৈতিক ভারসাম্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেটা অনেক সময় মেধা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ‘মারাত্মকভাবে আপসের দিকে’ নিয়ে যায়।
এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক পদে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টানেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
হুমায়ুন কবির বলেন, “সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা তার মেয়েকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক পদে নিয়ে আসার কাজ করেন। তার এমন কোনো যোগ্যতা ছিল না, যা তাকে এই পদে যোগ্য করতে পারে। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে।
“সুতরাং এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ভারসাম্যের বিষয়টি স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে চলতে পারে না। জাতিসংঘের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে এটা আমরা দেখেছি। অন্য কোথাও যাওয়ার যোগ্যতা না থাকা এবং ওই পদের জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য বা মেধা না থাকা স্বত্বেও কেবল সাবেক মন্ত্রী হওয়ার দরুণ ওই পদগুলোতে পাঠানো হয়ে থাকে।”
‘ওয়ান ফর এইট বিলিয়ন’ প্রচারাভিযানের উপদেষ্টা বেন ডনাল্ডসন বলেন, “মনোনয়ন পর্ব প্রায় শেষের দিকে ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের প্রভাবের কারণে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। চলতি মাসের শেষ দিকে নিরাপত্তা পরিষদের প্রার্থীদের উপরে ভোট হবে। তবে সেটা গোপন রাখার ঘোষণা এসেছে।”
জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগের ‘গোপন চুক্তিগুলো’ বৃহত্তর পরিসরে জাতিসংঘ নেতৃত্ব ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে ‘দুর্বল করে দেয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপান করেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী আফরিন মাহবুব।
অন্যদের মধ্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আমেনা মহসীন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার লিমা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।