Published : 05 Jun 2025, 11:32 AM
মানুষ হিসেবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি এই যে, উপহার বা দান হিসেবে পাওয়া জিনিসের প্রতি আমাদের মমত্ব কম। প্রাপ্ত জিনিসটি পছন্দের হলেও আমরা কয়েকদিন যত্ন করে ব্যবহারের পর তার আর কোনো খোঁজ রাখি না। অবহেলায় নষ্ট করে ফেলি। বিশ্বপ্রকৃতির ক্ষেত্রেও আমাদের আচরণ বোধ হয় একই রকম।
আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটি উপহারে ভরপুর। দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ, সবুজ মাঠ, ফসলের ক্ষেত, বিস্তীর্ণ বন, তাতে ময়ূরের নাচন, জোয়ার-ভাটা খেলা বহতা নদী, সীমাহীন সমুদ্র, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের কিরণের খেলা, ছয় ঋতুর বিচিত্র সমাহার, আকাশ-বাতাস-বন আরো কত কী! পৃথিবীর যেদিকে তাকানো যায়, শুধু বিশ্বপ্রকৃতির দুহাত ভরা উপহার ছড়িয়ে আছে। মানুষ যেহেতু এসব উপহার হিসেবে পেয়েছে, তাই বোধ হয় যত্ন করে, শ্রম দিয়ে তা রক্ষা করার চেয়ে ভোগ করার মানসিকতায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপব্যবহারে প্রতিদিন বিপন্ন করে তুলছে। অর্জিত সম্পদের প্রতি মমত্ব না থাকায় উপহারের কোনো জিনিসের ক্ষেত্রেও নিজেদের ভোগের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি তারা। ফলাফল হিসেবে বিশ্ব পরিবেশের অনেক কিছু আজ প্রান্তিক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ ভাবছে, ‘সবুজে ভরে উঠুন, পরিষ্কার শ্বাস নিন।’
এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব পরিবেশ ভাবনাকে পাশে সরিয়ে রেখে শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ভাবনার বাস্তব পরিবেশ পরিস্থিতি আছে কিনা? বিশ্ব পরিবেশের বিপর্যয়ে বাংলাদেশের অবদান নিচের দিকে থাকলেও ক্ষতির বিবেচনায় আমরা ওপরের দিকেই রয়েছি। অথচ আমরা প্রকৃত অর্থে দেশের পরিবেশ উন্নয়নে নিরাময়ের পথ না খুঁজে, প্রশমনের প্রলেপের সন্ধানে সময়ক্ষেপণ করছি।
আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ বলে গিয়েছেন, “কারণ না জানলে ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।” দেশের উন্নয়নের সকল প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে, কোনো ঘটনার কার্যকারণ জানার চেষ্টা কেউ করে, এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সর্বত্র আশু সমস্যার আশু সমাধান হিসেবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলমান। আমাদের দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা বুঝে গিয়েছে, কারণ জেনে কোনো লাভ নেই। বরং দেশের মানুষকে প্যারিস, সিঙ্গাপুর, ভেনিস শহরের স্বপ্ন দেখিয়ে উন্নয়ন করতে পারলেই সবাই খুশি।
দেশকে সবুজে ভরিয়ে তুলতে যে বনায়নের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন, তা না করে আমরা আজ বন ধ্বংসের মহোৎসবে মেতে আছি। এখনো কৃষি জমিতে কলকারখানা, সড়ক, ঘরবাড়ি, ইটভাটা তৈরির কাজ চলমান। ফলে সরকারি হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে এক শতাংশ হারে কৃষি জমির পরিমাণ কমছে। যদিও এই হিসেব অন্তত দশ বছর ধরে মানুষ শুনছে, কিন্তু তা রোধ করার কোনো পরিকল্পনা এ পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। দেশের বিত্তবানরাই শুধু নয়, সরকারের পক্ষ থেকে শ্রেণি বৈষম্য কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে অনেক সময় গৃহহীনরাও ঘরবাড়ি তৈরির জন্য প্লট পায়। পরিকল্পনাকারীরা একবারও চিন্তা করে না যে, ছোট এই দেশটির বিশাল জনসংখ্যা বিবেচনা করে প্লটের বদলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ করা হলে অনেক কৃষি জমি সাশ্রয় হতে পারে। জনগণের আবাস গড়ার জন্য কোনোভাবেই হরিজেন্টাল এক্সটেনশন নয়, ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন জরুরি।
ঘরবাড়ি নির্মাণে ইট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই বিবেচনায় ইটভাটার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। পরিবেশের ওপর ইটভাটার বিভিন্ন প্রভাবের কথা বাদ দিলেও ভুলে গেলে চলবে না, এখনো পর্যন্ত দেশের ইটভাটার প্রধান রসদ কাঠ। ইটের বদলে সিমেন্টের ব্লক ব্যবহারের যে নির্দেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে, তার হিসেব কারও কাছে আছে বলে মনে হয় না।
সড়ক সম্প্রসারণে ও নতুন নির্মাণে গাছ কাটার প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষ আন্দোলন করে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, এমন কোনো নজির দেশে খুব একটা নেই। ইতিহাস-ঐতিহ্য কিছুই গাছ খাদকদের রুখতে পারেনি। আমরা পারিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, পারিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর পিজি হাসপাতালের সামনের গাছ, ধানমন্ডির সড়ক বিভাজকের গাছ, রেডিও অফিসের সামনের গাছ, ডায়াবেটিক হাসপাতালের সামনের গাছ—কোনোটিই আমরা রক্ষা করতে পারিনি।

এর মধ্যে ৩০ মে ঢাকায় একটা অভিনব কাজ হয়েছে। মাঠ, পার্ক ও জলাধার আইন লঙ্ঘন করে এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ঠুকে দেওয়া অভিযোগ নিয়ে একটি গণ-আদালত বসে। ‘পান্থকুঞ্জ মোকদ্দমা’ শিরোনামের এই প্রতীকী মামলার গণশুনানি হয় ওইদিন বিকেলে ঢাকার পান্থকুঞ্জ উদ্যানে (সার্ক ফোয়ারা গেইট)। এর আয়োজক ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’।
গণ-আদালতে ‘বিচারক’ হিসেবে গণশুনানি গ্রহণ করেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য গীতি আরা নাসরীন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সামসি আরা জামান, সর্বজনকথার সম্পাদক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
গণশুনানির আয়োজকরা গণআদালতকে বলেন, এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত ‘প্রাণ-প্রকৃতি ও জনবিরোধী’ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পান্থকুঞ্জ পার্ক এবং হাতিরঝিল জলাধার রক্ষায় পান্থকুঞ্জ পার্কে অবস্থান নিয়ে ১৬৫ দিন ধরে আন্দোলন চলছে।
গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি পক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিলের ন্যায়বিচারের আর্জি নিয়ে বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন ‘পান্থকুঞ্জ মোকদ্দমা: জনগণ বনাম অন্তর্বর্তী সরকার’ শীর্ষক এই গণশুনানি আয়োজন করে।
সকল পক্ষের প্রমাণ ও প্রস্তাব সাপেক্ষে বিজ্ঞ নাগরিকদের মাধ্যমে গঠিত ‘জনতার আদালত পান্থকুঞ্জ মোকদ্দমার রায়’ ঘোষণা করে।
এই আদালত একটি প্রতীকী আদালত, রায়টিও প্রতীকী। ‘রায়ে’ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, পান্থকুঞ্জ উদ্যান জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ‘ঘোষণা’ করা হয় এবং বাদী পক্ষের অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বিবাদী পক্ষসহ অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পান্থকুঞ্জ উদ্যানে জনগণের অবাধ প্রবেশ ও আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ‘নির্দেশ’ দেওয়া হয়।
আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংযোগ সড়কের সকল প্রকার কার্যক্রম স্থগিত ‘ঘোষণা’ করা হয়।
শেষপর্যন্ত এই প্রতীকী রায়ের কি হবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। কখনও উন্নয়নের নামে, কখনও আবার লাভজনক বিবেচনায় গাছ কর্তনের প্রতিযোগিতা চলছে, জনগণের নিরাপত্তার বার্তাকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে। আর এখন আমরা চাইছি, আলাদিনের প্রদীপের আশ্চর্য পরশে এমন পরিবেশেও দেশ সবুজে ভরে উঠবে! সত্যি সেলুকাস!
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আমরা উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম। ওই বনকে আমরা কীভাবে ভোগ করেছি এবং এখনো করে চলেছি, তা বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। সুন্দরবনের নদী, জীববৈচিত্র্য, বিভিন্ন গাছ—সবই আজ বিপন্ন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের প্রতিবাদ ক্ষমতাসীনরা আমলে নেয়নি। নিজেদের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নির্মাণকে এগিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর এমন শিল্প স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে বনকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। সেখানে এখনো কলকারখানা নির্মাণ চলমান।
দেশের সব মানুষই জানে, এই সুন্দরবন আইলা-সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কীভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল। কিন্তু ওই যে, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রকৃতি প্রদত্ত উপহারের জিনিস, তা তো নিশ্চিতভাবেই ভোগের সামগ্রী। শুধু দুহাত দিয়ে ভোগ করে যাও। তাকে রক্ষা করার, লালন করার কোনো দায় মনের গহীনে রাখার প্রয়োজন নেই। এই যেহেতু আমাদের বাস্তবতা, সেখানে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে দাঁড়িয়ে আশার বাণী দিয়ে মাঠ গরম হবে কি, ‘সবুজে ভরে উঠুন, পরিষ্কার শ্বাস নিন।’ বিজ্ঞজনেরা একবার ভেবে দেখবেন।
একজন মানুষের জন্য পরিষ্কার শ্বাস গ্রহণে দূষণমুক্ত বায়ুমণ্ডলের প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের বায়ু দূষণের প্রথম সারির নগর হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বন না থাকা এবং অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার আমাদের পরিবেশকে আজ নিয়ন্ত্রণহীন করছে। দেশের ক্ষমতাসীনরা যদি সত্যিই চান দেশ সবুজে ভরে উঠুক, মানুষ পরিষ্কার শ্বাস নিক, তাহলে শুধু খণ্ডিত পরিকল্পনা নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে গেলে হবে না, চাই সম্মিলিত পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ। মনে রাখা প্রয়োজন, পরিবেশের প্রতিটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক।