Published : 05 Jun 2026, 10:50 AM
সাদু নামের এক যুবক ও তার মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীর জীবনসংগ্রামকে ঘিরে নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন নির্মাণ করেছেন 'রইদ' সিনেমায়; ঈদে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি।
এই সিনেমায় সাদু চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান।
সুমনের নির্মাণে সাদু চরিত্রে নিজেকে কতটা বিলীন করেছিলেন সেই গল্প গ্লিটজের সঙ্গে করেছেন ইমরান।
কীভাবে পর্দার সাদু চরিত্র হয়ে উঠেছেন, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা, সহশিল্পী নাজিফা তুষিকে নিয়ে তার মূল্যায়ন, আগামী কাজের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এই অভিনেতা।
গ্লিটজ: 'রইদ' সিনেমার প্রস্তাব যখন এল, গল্পের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল?
ইমরান: এই সিনেমাটা মেজবাউর রহমান সুমন বানাবেন এটাই ছিল প্রথম ট্রিগার পয়েন্ট। উনি এত বিশুদ্ধ শিল্পী। ওনার বোধ, ওনার জ্ঞান, শিল্পের সঙ্গে ওনার যে আত্মিক সম্পর্ক সেই মানুষটার সঙ্গে কাজ করতে পারাটা একটা বড় প্রাপ্তি, একটা সৌভাগ্য। সেখান থেকে শুরু করে পুরো জার্নিটা এখন পর্যন্ত আমার জীবনে এবং যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন এই জার্নিটা আমার স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। এত কাব্যিক আর আধ্যাত্মিক একটা যাত্রা ছিল।
গ্লিটজ: সিনেমার শুটিংয়ের জার্নিটা নিয়ে একটু বলুন
ইমরান: সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে সিনেমার শুটিং হয়েছিল, আমরা ওই জায়গায় গিয়ে আসলে মিশে গিয়েছিলাম। প্রকৃতির সঙ্গে, ওখানকার মানুষগুলোর সঙ্গে। তাদের একটা অংশ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। যে ঘরটা বানানো হয়েছিল, সেটাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলাম যে অন্য কেউ ঘরে ঢুকলেও বিরক্ত লাগত মনে হত, আমাদের ঘরে এত মানুষ কেন! লাইট-ক্যামেরার লোকজনকে বলতাম, তোমাদের জিনিসপত্র ঘর থেকে সরাও, এই ঘরের মধ্যে এত কিছু করছ কেন! ওই সময় আমাদের ভেতরে এই অনুভব ছিল, এটাই আমাদের ঘর।
ওখানকার প্রত্যেকটা মানুষ আমাদেরকে সাদু (রইদ সিনেমার ইমরানের করা চরিত্র) আর পাগলি (অভিনেত্রী নাজিফা তুষির করা চরিত্র) হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল আর তারা গ্রহণ করেছিল বলেই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে সেটা হয়ে উঠতে পেরেছিলাম।
ওখানে ৬০ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে, বাড়ি বানানো হয়েছে, ঘাট বানানো হয়েছে পুরো একটা স্বর্গ তৈরি হয়েছে। আমরা একটা 'ইডেন গার্ডেন' বানিয়েছিলাম ওখানে। কী অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে সময় কেটেছে! নৌকা নিয়ে এদিক ওদিকে চলে যাচ্ছি, ঘুম পেলে মাটির ওপর টুপ করে শুয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। এই যে সহজ, সহজ জায়গাটা আমরা সেখানে গিয়ে পেয়েছি।
পুরো শুটিংয়ে একদিনও স্যান্ডেল পরিনি, সবসময় খালি পায়ে। পাথরের রাস্তায় সেখানকার লোকেদের সঙ্গে মিশে থেকেছি।

গ্লিটজ: 'সাদু' চরিত্রের প্রস্তুতি কেমন ছিল? স্ক্রিপ্ট পড়া থেকে শেষ দিন পর্যন্ত?
ইমরান: শুরুর দিকে বিষয়টা ছিল থিওরিটিক্যাল, যখন প্র্যাকটিক্যালি লোকেশনে যাইনি। লোকেশনে যাওয়ার পর থেকেই মূল প্রস্তুতি শুরু। আমরা সেখানে চরিত্রের সঙ্গে যাপন করেছি, যাপন না করলে আসলে কাজ করা যায় না। ডায়লগ বলা তো সহজ জিনিস, বলে দিলাম। কিন্তু চরিত্রটা হয়ে ওঠা সেটা ওখানে গিয়ে ধীরে ধীরে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে। পরিচালক আমাদের সেই ইনপুটটা দিয়েছেন, চরিত্রের মনস্তত্ত্বটা উনি কীভাবে দেখেন, কীভাবে চান। সেগুলো মাথায় রেখে আমরা মিশে গেছি।
অনেকদিন এমন হয়েছে যে বাজারে গেছি, কেউ চিনতে পারেনি। বরং ওখানকার মানুষেরা ভেবেছে এরা সারাদিন অনেক কষ্ট করে, ভিক্ষাটিক্ষা করে খাচ্ছে।
এই গল্পে এত প্রেম আছে এত আত্মিক, এত বিশুদ্ধ প্রেম। সেই প্রেমটা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের মধ্যে ছিল।
চরিত্রের প্রস্তুতি বলতে তো শুধু শুধু অভিনয় নয়, গরু কীভাবে রাখতে হয়, কীভাবে চরাতে হয়, কীভাবে গোসল করাতে হয়, কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে নৌকা চালাতে হয়, কীভাবে মাছ ধরতে হয় এসব শিখেছি। ওখানে পা ফেললেই জোঁক ধরত, সারা গায়ে লাগত। এগুলো নিয়েই আমরা অভিনয় করেছি। এটা আবেগ। এটা একটা সোল জার্নি।

গ্লিটজ: শুটিং সেটে এমন কোনো মুহূর্ত ছিল যেটা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং?
ইমরান: সব। একটাও মুহূর্ত আপনার কাছে নন-চ্যালেঞ্জিং মনে হবে না। সিনেমাটা দেখলে পরতে পরতে মনে হবে এটা কীভাবে হল! অথবা মনে হবে আচ্ছা, এটা তাহলে এভাবে করল! মানুষের এই অনুভূতিগুলো হবে।
গ্লিটজ: মেজবাউর রহমান সুমনের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ইমরান: অসাধারণ মানুষ উনি, অসাধারণ শিল্পবোধ। সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকদের তালিকায় আমার পছন্দের জায়গায় একদম টপমোস্ট পজিশনে মেজবাউর রহমান সুমনের নাম থাকবে। উনি সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। ওনার সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ আমার আরও আরও বাড়বে। উনি ফিল্ম মেকিং কতটা দারুণ বোঝেন, আর উনি কী চান সেটা কতটা স্পষ্ট করে জানেন এই পুরো প্রসেসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। অনেক অনেক কিছু শিখেছি ওনার কাছ থেকে। উনি নিজেই একটা ইন্সটিটিউশন।
গ্লিটজ: নাজিফা তুষির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ইমরান: নাজিফা তুষি এই সময়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা, সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরমার। যেখানে নারী অভিনেত্রীদের মধ্যে একটা 'শোপিস অ্যাক্টর' হয়ে থাকার প্রবণতা আছে, সেখানে নাজিফা তুষি প্রতিটি গল্পে, প্রতিটি চরিত্রে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বারবার প্রমাণ করছে তার গভীরতা এবং তার সক্ষমতা।
আমার মনে হয় এই প্রজন্মের কাছে খুব দ্রুতই সে আইকন হয়ে উঠবে। অভিনেত্রী হতে হলে যেই পরিমাণ ডেডিকেশন দরকার, যেই পরিমাণ গভীরভাবে ভাবতে হয়, যে পরিমাণে চরিত্রকে যাপন করতে হয় সেটা তুষির আছে।

গ্লিটজ: দুই দশকের ক্যারিয়ারে বেশ কিছু চরিত্র করেছেন কোনটা সবচেয়ে স্মরণীয়? আর ভবিষ্যতে কোন চরিত্রগুলো করার ইচ্ছে আছে?
এখন পর্যন্ত সাদু এটাই সেরা, একদম টপমোস্ট। আর অনেক চরিত্র আছে যেগুলো বই পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এটা কখনো পর্দায় এলে করতে চাই। হয়তো একটু অদ্ভুত শোনাবে, কিন্তু সেলিম আল দীনের উপন্যাস 'স্বর্ণবোয়াল'-এর তিনমন চরিত্রটা আমার খুব পছন্দের। মিসির আলি চরিত্রটাও খুব পছন্দ। বাকের ভাই চরিত্রটাও। পছন্দের তালিকায় আরও অনেক কিছু আছে এগুলো কবে কে বানাবে বা আদৌ বানাবে কিনা জানি না, তবে এরকম অনেক চরিত্রের কথা বলতে পারব যা আমার করতে ইচ্ছে করে।
গ্লিটজ: চলতি বছর পরিচালনায় আপনাকে পাওয়া গেছে, সেটা প্রশংসিতও হয়েছে। পরিচালনা নিয়ে পরিকল্পনা কী?
ইমরান: পরিচালনায় আমার দ্বিতীয় কাজ চলছে। প্রথম শিডিউলের শুটিং শেষ, দ্বিতীয় শিডিউলে যাব। আশা করছি দর্শককে আবারও অদ্ভুত কিছু দেখাতে পারব।