Published : 06 Apr 2026, 05:09 PM
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে সংবিধান নিয়ে নতুন করে যে বিতর্কের উদ্ভব হয়েছে, তা কেবল একটি আইনি প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং নাগরিক অধিকারের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘সংবিধান পুনর্লিখন বনাম সংশোধন’—এই দ্বৈততার ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন; আমরা কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোন পথটি অধিকতর কার্যকর, টেকসই ও বাস্তবসম্মত?
একজন আইনজীবী হিসেবে, বিশেষত সুপ্রিম কোর্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; রাষ্ট্রের মৌলিক সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস, সীমা এবং নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হয়। ফলে এর পরিবর্তন বা সংস্কার—যে পথেই হোক—তা হতে হবে গভীর বিবেচনাপ্রসূত, অংশগ্রহণমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত।
প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—বর্তমান সংকটের প্রকৃতি কী? যদি সমস্যার মূল হয় সংবিধানের প্রয়োগ, তাহলে পুনর্লিখন নয়, বরং কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে প্রধান কাজ। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই সংবিধানের যে উচ্চমানের নীতিগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা—এসব ক্ষেত্রেই মূল চ্যালেঞ্জটি অধিকাংশ সময় কাঠামোর ভেতরে নয়, বরং প্রয়োগের স্তরে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের লিখিত সংবিধানে সব ভালো কথাই রয়েছে; বিপরীতে যুক্তরাজ্যের অলিখিত সংবিধানে বলতে গেলে খুব বেশি লিখিত কিছু নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লিখিত থাকলেই যদি গণতন্ত্র, আইনের শাসন আর নাগরিকের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশে কেন যুক্তরাজ্যের মতো শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য গণতন্ত্র, সত্যিকারের আইনের শাসন এবং নাগরিক ক্ষমতায়িত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি? আবার লিখিত না থাকলেই হবে, এমন তো নয়; যুক্তরাজ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। নাগরিকের ক্ষমতায়ন আর মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ করেছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে প্রয়োগে; পরিবর্তন করতে হবে জীর্ণ ও সংকীর্ণ মানসিকতার।
তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু মৌলিক কাঠামোগত প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, সংসদের কার্যকারিতা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের ভারসাম্য—এসব বিষয়ে যদি সংবিধান পর্যাপ্ত ভারসাম্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধুমাত্র আংশিক সংশোধন দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানেই আসে সংবিধান পুনর্লিখনের প্রশ্ন। পুনর্লিখন মানে শুধু কিছু ধারা পরিবর্তন নয়; বরং একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করা। এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা রাষ্ট্রকে নতুনভাবে কল্পনা করার সুযোগ দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পথও। কারণ, একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জাতীয় ঐকমত্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, এই শর্তগুলো কতটা বিদ্যমান? যদি রাজনৈতিক পরিবেশ বিভক্ত ও অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে, তাহলে পুনর্লিখনের উদ্যোগ সহজেই বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে। তখন এটি একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণের পরিবর্তে বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে সংবিধান সংশোধনের পথ তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যমান কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়। সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে—সংশোধন যেন খণ্ডিত বা প্রতিক্রিয়াশীল না হয়। বরং তা হতে হবে সুপরিকল্পিত এবং কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত।
আমাদের সংবিধান ইতিমধ্যে বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এসেছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণও হয়ে উঠেছে। তাই ভবিষ্যতের সংশোধনগুলোকে আরও সমন্বিত ও নীতিনির্ভর হতে হবে।
এখানে একটি মধ্যপন্থা বিবেচনা করা যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখা যায়। প্রথম ধাপে জরুরি ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর সংশোধন আনা—বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ও প্রতিনিধিত্বশীল সংবিধান পর্যালোচনা কমিশন গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং সময়সাপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের পথও উন্মুক্ত থাকবে। তবে সেটি হবে একটি প্রস্তুতিপর্বের পরিণতি, হঠাৎ কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সীমিত পরিসরে নেওয়া হয়েছে, যা পরে গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংবিধান যেহেতু জনগণের দলিল, তাই এর পরিবর্তনও হতে হবে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবিধান যতই উন্নত হোক না কেন, তা কার্যকর হবে তখনই, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ—এসব কেবল সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; লিখিত চিন্তার সংবিধানের পাশাপাশি অলিখিত মানবিক সংবিধানও অনুসরণ করতে হবে শাসক থেকে শাসিত জীবনের পরতে পরতে।
বাংলাদেশ আজ যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সংবিধানকে ঘিরে এই বিতর্ক একটি সুযোগও বটে। এটি আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এবং কোথায় যেতে চাই।
‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’—তাই কঠিন করেই বলি, ‘পুনর্লিখন না সংশোধন’—এই প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর নেই। এটি নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক ঐকমত্য এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যগুলোর ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, তা হতে হবে গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি কার্যকর, বিশ্বাসযোগ্য এবং ভবিষ্যতমুখী সংবিধান—যা কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করবে না, বরং নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে; প্রতিষ্ঠিত করবে একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি বাংলাদেশ।