Published : 23 Jul 2026, 01:32 PM
এক দশকের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অ্যান্ডি বার্নাম দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করার অঙ্গীকার করেছেন। ঘন ঘন সরকার ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের এ ধারায় কিয়ার স্টারমারের উত্তরসূরি যে ‘বিরক্ত’, তা তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
গত সোমবার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ দ্রুত বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন বার্নাম। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের আগেই চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিসহ স্টারমারের অনুগত বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন। সেই সঙ্গে বার্নাম সামনের সারিতে নিয়ে আসেন ঘনিষ্ঠ মিত্রদের, যারা স্টারমারের সঙ্গে মতবিরোধে আগের মন্ত্রিসভা ছেড়ে গিয়েছিলেন।
এই মিত্রদের মধ্যে বামপন্থি হিসেবে পরিচিত এড মিলিব্যান্ডকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ওয়েস স্ট্রিটিংকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া এই দুই নেতার অতীত অবস্থান ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে তাদের আগামী দিনের পদক্ষেপ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে।

এড মিলিব্যান্ড কে?
১৯৬৯ সালে পোলিশ-ইহুদি অভিবাসী পরিবারে জন্ম নেওয়া এড মিলিব্যান্ডের বাবা রালফ ছিলেন একজন মার্কসবাদী চিন্তাবিদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলজিয়াম থেকে পালিয়ে এসেছিলেন তিনি।
এড মিলিব্যান্ড ২০০৫ সাল থেকে ডনকাস্টার নর্থ আসনের এমপির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় এড মিলিব্যান্ডের পাশাপাশি তার ভাই ডেভিড মিলিব্যান্ডও দায়িত্ব পালন করেছেন; ডেভিড মিলিব্যান্ড তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
এড মিলিব্যান্ড ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লেবার পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি স্টারমার সরকারের জ্বালানি ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মিলিব্যান্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন ২০১৩ সালে। দামেস্কের কাছে ঘুটায় তখনকার সিরীয় শাসক বাশার আল-আসাদের বাহিনীর রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন মিলিব্যান্ড।
তার বিরোধিতার কারণে কনজারভেটিভ সরকারের বিমান হামলার পরিকল্পনা হাউজ অব কমন্সের ভোটাভুটিতে ভেস্তে যায়। আর এরপরই যুক্তরাষ্ট্রও বিমান হামলার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
সমালোচকরা এডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন, আসাদ যাতে আরও ‘যুদ্ধাপরাধ’ করতে না পারেন, সেজন্য নেওয়া উদ্যোগ তিনি ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
কঠিন কঠিন প্রশ্ন করার জন্য পরিচিত সাংবাদিক জেরেমি প্যাক্সম্যান ২০১৫ সালের মার্চে মিলিব্যান্ডের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মিলিব্যান্ডের ‘যথেষ্ট দৃঢ়তা’ আছে কি না।
জবাবে তিনি সিরিয়ায় বিমান হামলায় সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে উদাহরণ হিসেবে টেনে জবাব দিয়েছিলেন, “নিশ্চয়, আমি যথেষ্ট দৃঢ়চেতা।”
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য স্টারমারের ওপর মিলিব্যান্ড চাপ তৈরি করেছিলেন বলে খবর রয়েছে। তাছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে যখন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়, তাতে যুক্তরাজ্য যাতে না জড়ায়, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন মিলিব্যান্ড। যুক্তরাজ্য ওই যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
আল জাজিরা লিখেছে, ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব মিলিব্যান্ড কখনোই গোপন করেননি। তার এই অতীত অবস্থান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘বিশেষ কূটনৈতিক সম্পর্ক’ পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিলিব্যান্ড সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন পরিবেশ নিয়ে উদ্যোগের কারণে। ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে পরিবেশবান্ধব করার প্রশ্নে তিনি সরব ছিলেন।
এ পরিকল্পনায় দেশটির মোট বিদ্যুতের অন্তত ৯৫ শতাংশ বায়ু, সৌর ও পারমাণবিক শক্তির মত কার্বনশূন্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলিব্যান্ডের এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন নতুন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। তারা মনে করেন, বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর এ পরিকল্পনা আরও চাপ বাড়াবে এবং স্বল্পমেয়াদে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেবে।
এছাড়া মিলিব্যান্ড উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছিলেন।
সে সময় তার জ্বালানি নীতির কঠোর সমালোচনা করে ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করে যুক্তরাজ্য উত্তর সাগরের মত ‘সম্পদের ভাণ্ডারের’ অপচয় করছে।
ট্রাম্পের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট যুক্তরাজ্যের ২০৫০ সালের নেট জিরো লক্ষ্যকে ‘অমঙ্গলজনক লক্ষ্য’ ও ‘পাগলামি’ বলেছিলেন।

ওয়েস স্ট্রিটিং কে?
১৯৮৩ সালে জন্ম নেওয়া স্ট্রিটিং পূর্ব লন্ডনের স্টেপনির একটি কাউন্সিল ফ্ল্যাটে (স্থানীয় সরকারের আবাসন) বেড়ে ওঠেন। নিজের পরিবারের মধ্যে তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক করার পর তিনি ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের প্রেসিডেন্ট হন।
স্ট্রিটিং শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণে দাতব্য সংস্থায় কাজ করেছেন, রেডব্রিজ কাউন্সিলের ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০১৫ সালে লেবার পার্টির হয়ে ইলফোর্ড নর্থ আসন থেকে এমপি হয়েছেন। ছায়া মন্ত্রিসভার বিভিন্ন দায়িত্ব পার করে ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
প্রতিরক্ষা খাতে স্ট্রিটিংয়ের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। সাধারণ এমপি হিসেবেও তিনি প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি।
স্ট্রিটিংয়ের নতুন দায়িত্ব চূড়ান্ত হওয়ার আগের দিন যুক্তরাজ্যের সাবেক সেনাপ্রধান রিচার্ড ড্যানাট এলবিসি রেডিওকে বলেন, স্ট্রিটিং “প্রতিরক্ষা বিষয়ে বলতে গেলে কিছুই জানেন না।”
স্টারমারের সরকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ড্যান জারভিস। দায়িত্ব পাওয়ার ছয় সপ্তাহের মাথায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘পশ্চাৎযাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেন সাবেক সেনপ্রধান ড্যানাট।
‘লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল’ এর দুই দশকের বেশি সময়ের সদস্য স্ট্রিটিং ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের অভিযান শুরুর পর দলীয় নীতিই অনুসরণ করছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির দাবি সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলাটিকে ‘অনর্থক’ বলে বর্ণনা করেন।
তবে গাজায় হামলা যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, স্ট্রিটিংয়ের অবস্থানও তত পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের দিকে তিনি গাজায় ইসরায়েলের হামলাকে ‘অসহনীয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আর সেপ্টেম্বরে তিনি বলেন, ওই অভিযান ইসরায়েলকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করে ফেলেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তখনকার ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের কাছে পাঠানো স্ট্রিটিংয়ের কিছু বার্তা পরে প্রকাশ হয়ে যায়, সেখানে তাকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়।
তিনি লিখেছিলেন, ইসরায়েল “আমাদের চোখের সামনে” যুদ্ধাপরাধ করছে। ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ প্রশ্নেও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে তিনি ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করতে রাজি ছিলেন না।
স্ট্রিটিংকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে ‘লজ্জাজনক’ বলেছে ‘স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন’ এবং ‘ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট’ এর মত যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলো।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে ইসরায়েলবান্ধব কোম্পানি ‘পালানটির’ র অ্যালগরিদম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেও কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন স্ট্রিটিং। তবে নিজের সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে বরাবরই সাফাই গেয়ে এসেছেন সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী।