Published : 25 Oct 2025, 08:20 AM
জগৎকে ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্বে ভাগ করার ধারণাটি মূলত জরাথুস্ট্রীয় পারস্যে প্রথম দার্শনিক কাঠামো হিসেবে দেখা যায়। জরাথুস্ট্র বা জরোঅ্যাস্টার এমন এক বিশ্বচিন্তার জন্ম দেন যেখানে ‘আশা’ (Asha) ও ‘দ্রুজ’ (Druj) অর্থাৎ সত্য ও মিথ্যা, আলো ও অন্ধকার—একটি মৌলিক দ্বৈত কাঠামোতে মুখোমুখি অবস্থানে থাকে। সংস্কৃতভাষী আর্য ও ফারসিভাষী আর্যদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভেদ এই দৃষ্টিভঙ্গিটিকে আরও দৃঢ় করেছিল। ধর্মতাত্ত্বিক ক্যারেন আর্মস্ট্রং তার ‘এ হিস্ট্রি অব গড’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে এই দ্বৈতচিন্তাধারা পরবর্তীকালে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মবিশ্বাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ক্যারেন আর্মস্ট্রং তার বইয়ে দেখিয়েছেন যে, ফারসিভাষী আর্যরা ছিল মূলত নাগরিক বা নগরবাসী। অন্যদিকে, সংস্কৃতভাষী আর্যরা যাযাবর জীবন থেকে এসে পারস্যের নগরগুলোতে আক্রমণ ও লুটপাট করত। জরাথুস্ট্রের শিক্ষায় প্রভাবিত ফারসিভাষী আর্যরা নিজেদের আর্য নৈতিকতা এবং উৎকর্ষকে এমনভাবে ধারণ করত, যা সংস্কৃতভাষী আর্যদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল। আর্মস্ট্রং তার ‘ফিল্ডস অব গড’ বইয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন যে ফারসিভাষী আর্যরা নিজেদেরকে 'আশা' বা শৃঙ্খলা, সত্য ও সু-ব্যবস্থার অনুসারী বলে মনে করত, যা তাদের কাছে সভ্যতা ও উন্নত জীবনের ভিত্তি ছিল।
অন্যদিকে, সংস্কৃতভাষী আর্যদের ধর্মীয় রীতিনীতি, বিশেষত তাদের বহু দেবদেবীর ধারণা, ফারসিভাষী আর্যদের কাছে অসভ্য ও বিশৃঙ্খল মনে হয়েছিল। জরাথুস্ট্রবাদ একেশ্বরবাদের দিকে ঝুঁকছিল এবং বহু ঈশ্বরকে (যেমন, বৈদিক ধর্ম) তারা বিশৃঙ্খলা ও অন্ধকারের প্রতীক হিসেবে দেখত। জরাথুস্ট্রের নৈতিক দ্বৈততার ধারণা থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিয়েছিল, যেখানে ভালো (আহুরা মাজদা) এবং মন্দের (আংরা মাইনয়ু) মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল। ফারসিভাষী আর্যরা সংস্কৃতভাষী আর্যদেরকে ‘আংরা মাইনয়ু’-এর প্রভাবাধীন মনে করত, যারা বিশৃঙ্খলা এবং মিথ্যাকে প্রচার করছে। ফলে, তারা সংস্কৃতভাষী আর্যদেরকে কেবল ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নয়, বরং নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট এবং সভ্যতার অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করত। এই ধারণার ভিত্তিতে, ফারসিভাষী আর্যরা নিজেদেরকে সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং সংস্কৃতভাষী আর্যদেরকে নিজেদের চেয়ে নিচু ও বন্য হিসেবে চিত্রিত করে।
একইভাবে, বৈদিক আর্যরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে, তখন তারা স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের থেকে নিকৃষ্ট, অসভ্য এবং অপবিত্র বলে মনে করত। ঋগ্বেদসহ বৈদিক সাহিত্যে এই আদিবাসীদেরকে 'দাস' বা 'দস্যু' নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই শব্দগুলো সাধারণত তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হত, যারা আর্যদের রীতিনীতি, ভাষা এবং দেব-দেবীকে অনুসরণ করত না। তাদের শারীরিক বর্ণনার ক্ষেত্রেও আর্যদের থেকে ভিন্নতা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন 'নাসিকা-চ্যাপ্টা' বা 'কৃষ্ণবর্ণ' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, আর্যরা নিজেদেরকে 'আর্য' অর্থাৎ 'মহৎ' বা 'উন্নত' বলে মনে করত এবং বিশ্বাস করত যে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা শ্রেষ্ঠ। তারা আদিবাসীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং তাদের দেবদেবীকে 'অদেব' বা দেবতাহীন বলে মনে করত, যা তাদের অপবিত্রতার প্রমাণ। এমনকি, আর্যদের দেবতা ইন্দ্রকে দস্যুদের দুর্গ ধ্বংসকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা আর্য ও আদিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিজয়ের ইঙ্গিত দেয়। এই বর্ণনাগুলো বৈদিক আর্যদের আধিপত্যবাদী মনোভাব এবং আদিবাসীদের প্রতি তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে।
কিন্তু জগৎ আসলে এক জটিল, আন্তঃনির্ভরশীল ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মঞ্চ, যেখানে ঘটনা ও সত্তাগুলোতে দ্বৈততার বাইরেও অনেক ধরনের ধূসর অঞ্চল থাকে। ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা বা উন্নত-পশ্চাৎপদ-এর মতো দ্বৈতচিন্তা এই জটিলতাকে একটি সরল দৃষ্টিকোণে ফেলে দেয়, ফলে অনেক সম্পর্ক ও পরিস্থিতি ভুলভাবে মূল্যায়িত হয়। জটিলতা তত্ত্বের চিন্তক এডগার মোরাঁ দেখিয়েছেন কীভাবে সমবিকাশ, প্রতিক্রিয়া এবং আত্মসংগঠন প্রাকৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ফলে, একটি ঘটনা বা বস্তুকে ‘ভালো’ অথবা ‘মন্দ’ বলার আগে, সেটি যে কাঠামো, পরিস্থিতি ও ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে তা বিচার করা প্রয়োজন।
এই দ্বৈত দর্শনের সীমাবদ্ধতা বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। হিন্দু ধর্মে ‘ধর্ম’ কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক কোড নয়; বরং তা বয়স, শ্রেণি, পেশা ও সমাজের অবস্থান অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। শিব যেমন ধ্বংস ও সৃষ্টির যুগ্ম রূপ, তেমনি তিনি দ্বৈততাকে সমন্বিত করে ধারণ করেন। বৌদ্ধ দর্শনে দ্বৈততা একটি মায়া; আত্মা ও অনাত্মা, সত্য ও মিথ্যা—সবকিছুই পরস্পর নির্ভর ও অনিত্য। গৌতম বুদ্ধের মধ্যমার্গ দ্বৈততাকে অতিক্রম করারই আহ্বান জানায়।
অবশ্য, জরাথুস্ট্রীয় প্রভাব সবচেয়ে প্রবলভাবে ধরা পড়ে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামের চিন্তায়। খ্রিস্টীয় মতাদর্শে স্বর্গ ও নরক, ঈশ্বর ও শয়তান সবকিছু জরাথুস্ট্রীয় ‘শেষ বিচার’-এর চিন্তা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। ইসলাম ধর্মে একদিকে যেমন ন্যায়ের একরৈখিক ধারণা বিদ্যমান, অন্যদিকে ‘রহমত’ বা করুণা আল্লাহর প্রধান গুণ হিসেবে চিহ্নিত। তালাল আসাদ তার ‘ফরমেশনস অব দ্য সেকুলার’ বইয়ে দেখিয়েছেন, ইসলামী আইন ও নৈতিকতার দ্বৈত কাঠামো মূলত একটি ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল, যা পাশ্চাত্যের ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সংলাপে গঠিত হয়েছে।
আসাদ তার গ্রন্থে ইসলামী আইন (শরিয়াহ) ও নৈতিকতার (আখলাক) দ্বৈততা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, ইসলামে শরিয়াহ শুধু বিধিনিষেধের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক নৈতিক কাঠামো যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে পরিচালিত করে। আখলাক বা নৈতিকতা, শরিয়াহর অনুবর্তী হয়ে ব্যক্তির চরিত্র গঠন এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে প্রতিফলিত করে। এই অর্থে, আসাদ দেখান যে আইন ও নৈতিকতা বিচ্ছিন্ন ধারণা নয় বরং পরস্পরের পরিপূরক, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পশ্চিমা ধারণার বিপরীতে ইসলামের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। তিনি পশ্চিমা সেক্যুলার দ্বৈততাকে চ্যালেঞ্জ করে দেখান যে ইসলামী প্রেক্ষাপটে এই বিভাজন অর্থহীন।
চীনাদের দাওবাদ চিন্তায়, দ্বৈততা যেমন রয়েছে ('ইন' ও 'ইয়াং'), তেমনি তা বিরোধ নয় বরং সমন্বয়ের—প্রতিটি শক্তি অন্যটির পরিপূরক। 'ইন' ও 'ইয়াং' নৈতিক বিপরীত নয় বরং রূপান্তরের অবস্থা। আফ্রিকান ও আমেরিকান আদিবাসী দর্শনগুলোতেও জগৎ দ্বৈত নয় বরং আন্তঃসম্পর্কিত আত্মা ও বস্তু দিয়ে গঠিত এক জৈবসত্তা। এইসব ঐতিহ্যে দ্বন্দ্ব নয় বরং ভারসাম্য, পারস্পরিকতা ও পরিবর্তন মূল কাঠামো।
জেরেমি বেনথামের প্রস্তাবিত প্যানোপটিকন এমন একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার যেখান থেকে সকল বন্দিকে দেখা যায়, কিন্তু বন্দিরা জানতে পারে না কখন তাদের দেখা হচ্ছে। এটি শুধু একটি কারাগার-পরিকল্পনার ধারণা ছিল না বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একটি আদর্শ শাসনপ্রকল্প হয়ে ওঠে; যেখানে পর্যবেক্ষণ, শৃঙ্খলা ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ছিল উপনিবেশিক শাসনের মূল কৌশল। এই শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ছিল এক গভীর দ্বৈতবাদ সভ্য বনাম অসভ্য, উন্নত বনাম পশ্চাৎপদ, সাদা বনাম অ-সাদা, ন্যায় বনাম অন্যায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নিজেকে 'উন্নত' ও 'নৈতিক' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এই দ্বৈত কাঠামোর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শোষণকে বৈধতা দেয়। মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে এই প্যানোপটিক কাঠামো আধুনিক রাষ্ট্রশক্তির মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে এবং তার প্রতিফলন আমরা আজও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণে দেখতে পাই।
এইভাবে, জরাথুস্ট্রীয় দ্বৈতবাদ মানব সভ্যতাকে একধরনের নৈতিক সংহতির কাঠামো দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি বিশ্ববাস্তবতার জটিলতা ও পরিবর্তনশীলতাকে প্রায়শই উপেক্ষা করেছে। বহু ধর্ম ও দর্শন এই দ্বৈত কাঠামোকে প্রশ্ন করে, এমনকি ভেঙে দেয়। বিশ্বকে বোঝার জন্য প্রয়োজন একধরনের বহুবাচনিক, আন্তঃসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ একে অপরকে সংজ্ঞায়িত করলেও, তারা সর্বদা আপেক্ষিক, প্রসঙ্গনির্ভর এবং পরিবর্তনশীল।
অদৃশ্য শাসনের চোখ: প্যানোপটিকন ও ব্রিটিশ উপনিবেশের গল্প
প্যানোপটিকনের সমাজে নৈতিক কোতোয়ালি: দেখার ভয় থেকে শাসনের জন্ম