Published : 06 Aug 2025, 05:21 PM
প্যানোপটিকন সামাজিক আদেশ মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যেন সে সবসময় মনে করে কেউ তাকে দেখছে। এই ‘দেখা হচ্ছে’ ভয়ই ধীরে ধীরে তৈরি করে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং তার চেয়েও ভয়ানক—অন্যকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। ফলে ব্যক্তি শুধু নিজেই নিয়ন্ত্রিত হয় না বরং অন্যকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যা রূপ নেয় এক ধরনের সমাজকেন্দ্রিক নৈতিক তদারকিতে। যাকে আমরা বলি নৈতিক কোতোয়ালি। মিশেল ফুকো বলেছিলেন, “প্যানোপটিকন এমন এক কাঠামো, যেখানে ক্ষমতা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।” এই অনুভব থেকেই জন্ম নেয় ভয়ের শৃঙ্খল।
নৈতিক কর্তৃত্ব যখন সর্বব্যাপী এক সত্তার হাতে থাকে, তখন মানুষ ভয় পায় ‘ঊর্ধ্বতন’ এক অলৌকিক বিচারকের। কিন্তু যখন এই কর্তৃত্ব রাষ্ট্র, সমাজ বা জনমতের হাতে আসে, তখন নাগরিকেরা একে-অপরের ওপর নজর রাখা শুরু করে। এভাবেই নৈতিক কোতোয়ালি তৈরি হয়। কারণ মানুষ তখন ভাবে, “আমি যেমন জানি, তেমনি অন্যদেরও জানানো আমার দায়িত্ব।” এনলাইটেনমেন্টের পর ইউরোপে সর্বব্যাপী সত্তার স্থান নেয় র্যাশনালিজম ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আর ওখানে নজরদারিই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি। কিন্তু রাষ্ট্র যখন পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, মানুষও তা করতে শেখে।
মানুষ যখন ভাবে, কেউ দেখছে না, কিন্তু দেখতেই পারে—তখনই প্যানোপটিকনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কাজ করে। এই অনিশ্চিত নজরদারির পরিস্থিতিতে মানুষ নিজে শুধু ভালো আচরণ করে না বরং অন্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করে। এখানে ক্ষমতা আসলে আচরণ-নিয়ন্ত্রণে, যা একধরনের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি তোলে। যে নিজেকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে, সে মনে করে অন্যদেরও নিয়ন্ত্রণে আনা তার দায়িত্ব। এতে জন্ম নেয় সামাজিক বিচারবোধ, কিন্তু তা প্রায়ই হয়ে ওঠে পক্ষপাতদুষ্ট এবং হিংস্র। ফুকোর ভাষায়, “মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার এই শক্তি আত্ম-আলোচিত এক কারাগার।”
প্যানোপটিকনের ভয় শুধু নিজের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকলে তাও মানা যেত। কিন্তু এই ভয় যখন ‘আমি ভালো’ ভাবনার সঙ্গে মিশে যায়, তখন মানুষ ভাবতে থাকে, “আমি ভালো, তাই আমি অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ”। এখান থেকেই এক তৈরি হয় ভয়ঙ্কর আত্মতুষ্টি—নৈতিক উচ্চস্থানের আত্মপ্রতিষ্ঠা। এই অভ্যাস মানুষকে নৈতিক কোতোয়ালে পরিণত করে এবং অন্যের ‘ভুল’ ধরিয়ে দেওয়া, অপমান করা, এমনকি শাস্তি দেওয়াকেও ‘সঠিক’ বলে মনে করায়।
রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয় বা ব্যর্থ হয়ে পড়ে এই প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়। যেমন নেদারল্যান্ডসে ১৬৭২ সালে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়লে, জনগণ নিজেদের হাতে ন্যায়বিচারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল। য়োহান ও কর্নেলিস ডি উইট নামে দুই রাজনীতিবিদকে ‘দেশদ্রোহী’ অপবাদ দিয়ে জনতা জেল থেকে বের করে এনে হত্যা করে। তাদের দেহ টুকরো করে শহরের মাঝে ঝুলিয়ে দেয়। এ এক চরম নৈতিক কোতোয়ালির বহিঃপ্রকাশ—যেখানে ভয়ে, গুজবে আর সামাজিক ন্যায়ের নামে গণমানুষ নিজেরাই বিচারক, পুলিশ ও কার্যকারক হয়ে ওঠে। সেখানে আর কোনো সর্বব্যাপী সত্তার অস্তিত্ব নেই, রাষ্ট্র নেই, আছে কেবল ভীতিপ্রবণ জনতার চক্ষু।
আধুনিক সময়েও আমরা এমন আচরণের ছায়া দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেইভন মার্টিন নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে ‘নেইবারহুড ওয়াচ’-এর সদস্য জর্জ জিমারম্যান হত্যা করে, কারণ সে মনে করেছিল ট্রেইভনের আচরণ সন্দেহজনক। জিমারম্যান আদালতে খালাস পায়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ‘অভ্যন্তরীণ পুলিশিং’ কে অনুমতি দিয়েছে? এই হলো আধুনিক প্যানোপটিকন—যেখানে জনগণ নিজেরাই বিচারকের আসনে বসে। আর ওই বিচার প্রায়শই বর্ণবাদ, লিঙ্গবিদ্বেষ কিংবা সামাজিক শ্রেণিভিত্তিক হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ‘আপার্টহাইড’ কালে, কৃষ্ণাঙ্গদের চলাফেরা, চাকরি, বাসস্থান সবই ছিল নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী নিজেরাও হয়ে উঠেছিল নিয়ন্ত্রক। তারা ভাবত, “আমরাই জানি কারা শুদ্ধ, কারা অপরাধী।” ফুকো বলেছিলেন, “শৃঙ্খলা আর শাস্তি যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে মিশে যায়, তখন তা আর কেবল কারাগারের বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে সামাজিক বাস্তবতা।” দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ ‘ওয়াচ গ্রুপ’ এই বাস্তবতার নির্মাতা ছিল।
বাংলাদেশেও এমন নৈতিক কোতোয়ালির প্রচুর দৃষ্টান্ত আছে এবং হাল-আমলে সেটা বাড়ছে। হিজাব পরা-না পরা, প্রেমিক-প্রেমিকার রাস্তায় হাঁটা, রাতের বেলায় মেয়েদের বাইরে থাকা—এসব নিয়ে জনতার ‘নৈতিক তদারকি’ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফেইসবুকে লাইভ বিচার, টিকটকে জনসম্মুখে ধমক বা ভিডিও শেয়ার করে অপমান—এসবের পেছনে রয়েছে প্যানোপটিকনীয় ভয়। “কেউ না দেখলেও কেউ দেখে ফেলতে পারে”—এই ভয়ই তৈরি করে এক ভয়ানক নৈতিক কোতোয়ালি সমাজ।
ভারতে লাভ জিহাদ, খাবার-পোশাক-বক্তব্য নিয়ে নৈতিক শাসন, হোয়্যাটসআ্যাপে নজরদারি গ্রুপ এসব একই মডেলের অংশ। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, “আমি যদি নিয়ম মানি, তাহলে আমার অধিকার আছে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার”। এই বিশ্বাস বিপজ্জনক, কারণ এটি কেবল নিয়ন্ত্রণ নয় বরং শাস্তি দেওয়ার একধরনের নৈতিক অনুমোদন। রাষ্ট্র তখন নীরব দর্শক, আর জনগণ নিজেরাই হয়ে ওঠে পুলিশ।
মানুষ যখন সমাজে নিজেদের ‘সহনীয় নাগরিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন অনেকে অন্যকে হেয় করেই নিজেকে উঁচুতে তোলে। এর পেছনে থাকে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে বিচারক হওয়ার বাসনা। ফুকো বলেছিলেন, “প্যানোপটিকনের শক্তি এই নয় যে সে বাধ্য করে, বরং সে বোঝায় তুমি নিজের দৃষ্টিতেই দেখছ”। এই বোঝানো থেকেই জন্ম নেয় বিচার, আর বিচার থেকে আসে আসল বিপদ—অন্যের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা।
এভাবে, প্যানোপটিকন সামাজিক ব্যবস্থা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রিত করে, কিন্তু ওই আত্মনিয়ন্ত্রণই ক্রমে অন্যের নিয়ন্ত্রণে রূপ নেয়। আর এই নিয়ন্ত্রণ, যেখানে কেউ ক্ষমতাবান নয়, কিন্তু সবাই ক্ষমতার দাবিদার—সেখানেই নৈতিক কোতোয়ালি সবচেয়ে ভয়ানক হয়ে ওঠে।
প্যানোপটিকন আমাদের শিখিয়েছে, ‘দৃষ্টির ভয়ে’ আচরণ বদলানো যায়। কিন্তু যখন এই দৃষ্টি কারও নিজের নয় বরং সামষ্টিক সমাজের, তখন ব্যক্তি ভুলে যায় নিজের সীমা। তখন সে শুধু নিজেই নিয়ন্ত্রিত হয় না, অন্যকেও নিয়ন্ত্রণের দায় নিয়ে নেয়। এতে তৈরি হয় এক অদৃশ্য কারাগার, যার প্রহরী আর কেউ নয়—আমরাই, যারা চোখ মেলে থাকি একে অপরের আচরণ, পোশাক, বিশ্বাসের দিকে।
এই সমাজে যদি আমরা সত্যিকারের ন্যায় চাই, তবে হয়তো দরকার ‘দেখা হচ্ছে’ এই বিশ্বাস নয় বরং ‘বোঝা হচ্ছে’ এই অনুভূতি। নৈতিকতা যদি বোঝাপড়ার হয়, তবে নৈতিক কোতোয়ালি নয় চাই সংলাপ, সহানুভূতি আর নীরবতা যেখানে প্রয়োজন।
এই প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, সাংগঠনিক পর্যায়েও কাজ করে। আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করি, তখন আমাদের আচরণ অনেকটা নিজে থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়—কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না জানলেও ‘কেউ দেখছে’ এই অনুভূতি কাজ করে। এটিই হলো প্যানোপটিকন প্রভাবের দৈনন্দিন বাস্তবতা। এখানেই জন্ম নেয় একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যেখানে নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গঠিত হয় নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে নয় বরং অনুমান এবং আগ্রহী চোখের উপস্থিতি থেকে।
নৈতিক কোতোয়ালি থেকে শিশুরাও মুক্ত নয়। বিদ্যালয়ে বন্ধুদের মধ্যে কেউ একটু ভিন্ন আচরণ করলেই অন্যরা তাকে ‘সংশোধন’ করার নামে বিদ্রূপ করে বা একঘরে করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অল্পবয়সী ব্যবহারকারীদের মধ্যেও এই তদারকি প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা তাদের পরিণত করে নতুন প্রজন্মের নৈতিক কোতোয়ালে—যেখানে শাসনের ভাষা মিশে যায় বন্ধুত্ব, রসবোধ বা অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছার সঙ্গে।
আমরা যদি প্যানোপটিকন সমাজে মানবিকতা রক্ষা করতে চাই, তবে এই তদারকির সংস্কৃতির বিকল্প কল্পনা করতে হবে। প্রতিটি মানুষের আচরণ, পছন্দ, জীবনধারা স্বতন্ত্র—এই স্বীকৃতিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্ব না দিলে নৈতিক কোতোয়ালি শুধু বাড়তেই থাকবে। শাসনের পরিবর্তে সংলাপ, পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে বোঝাপড়া এবং শাস্তির পরিবর্তে সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এই অবস্থার একমাত্র নৈতিক উত্তর।