Published : 27 Jan 2026, 12:52 AM
বর্তমান প্রজন্মের চারজন তরুণের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “তোমরা মার্ক টালির নাম শুনেছ?” তিন জনের উত্তর ছিল, “না, শুনিনি”। একজন উল্টো জানতে চাইল, “মার্ক হু?”
না, আমি ঠিক নামই বলেছিলাম। কেউ চিনল না। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মার্ক টালি যখন বাংলাদেশে ঘরোয়া নাম ছিলেন, তখন এই তরুণদের কারোর জন্মই হয়নি। আর এখন স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের বইপুস্তক থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে, মার্ক টালির নাম তারা জানবে কোথা থেকে?
এক সময়ে মার্ক টালির নাম এ দেশের জনগণের মুখে মুখে ফিরত। গ্রামের কৃষক, বাজারের দোকানদার, স্কুলের শিক্ষক, নৌকার মাঝি, শহরের চাকরিজীবী, আর মুক্তিযোদ্ধারা তো বটেই—সবার কানের কাছে বাজত বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠান। সেখানে প্রচার হতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মার্ক টালির রিপোর্ট। কখনো রণাঙ্গনের, কখনো নির্বাসিত সরকারের, কখনো পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার, কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের, আবার কখনো বড় দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে খবর থাকত।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার মানুষ প্রতিদিন গ্রামে-শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দয় গণহত্যা দেখেছে। কোথাও কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যামবুশও ঘটেছে। এ দেশের জনগণই ছিল এসবের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এগুলোর অনেক খবর প্রচারিত হতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তবু মার্ক টালির কণ্ঠে ওই খবর আবার শুনতে বাংলাদেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করত বিবিসির সকাল কিংবা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের জন্য—“সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠান”।
সারা বিশ্ব যেভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনছে, বাংলার মানুষও অধীর আগ্রহে তা শুনত। ওই ভারী বাংলা কণ্ঠস্বরকে সবাই ধরে নিয়েছিল এটাই মার্ক টালির নিজস্ব কণ্ঠ। তাকে এ দেশের মানুষ এতটা আপন করে নিয়েছিল যে, অনেকেই ভুলে গিয়েছিল তিনি বাংলা বলতে জানেন না। ১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরে জন্ম হয় মার্ক টালির। তার বাবা ছিলেন ইংরেজ, মা বাঙালি। দার্জিলিংয়ের একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঁচ বছর পডাশোনা করার পর নয় বছর বয়সে তিনি ব্রিটেনে চলে যান। তবে তিনি জীবনের বড় একটা অংশ কাটিয়েছেন ভারতবর্ষে।
১৯৭১ সালে মার্ক টালির মূল রিপোর্টগুলো বিবিসির ইংরেজি অনুষ্ঠানে প্রচার হতো এবং তার বাংলা অনুবাদ করে প্রচার করা হতো বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠানে। তাতে কী? সবাই ওই রিপোর্ট শুনেই খুঁজে পেত সংবেদনশীল মার্ক টালিকে। তিনি তার সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমাদের বীরত্ব, আমাদের প্রতি অন্যায় এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতেন।
রেডিও রিপোর্টে স্বাভাবিকভাবেই ভিডিও ছিল না। তখন ইন্টারনেট বা ইউটিউবের যুগও আসেনি। কিন্তু এগুলোর প্রয়োজনও আমাদের ছিল না। মার্ক টালির বর্ণনা থেকেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত পুরো দৃশ্য। প্রকৃতপক্ষে বিবিসিতে মার্ক টালির রিপোর্ট শুনেই সারা বিশ্ব ধীরে ধীরে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছিল।
আমার এখনো একটি ঘটনা মনে পড়ে। ১৯৭১ সালের শেষার্ধে মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য নিয়ে অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছিল। তখন অক্টোবর মাসের এক সকালে খবর পেলাম, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর ও পাকিস্তানের দোসর মোনায়েম খান মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তখন বিশ্বাস হচ্ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দালালদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিত। আমরা অপেক্ষা করছিলাম বিবিসির খবরের জন্য। অবশেষে ওই পরিচিত কণ্ঠে প্রচারিত হলো মোনায়েম খানের মৃত্যুর সংবাদ। মার্ক টালির রিপোর্টে বলা হওয়ার পর অবিশ্বাসের প্রশ্নই ওঠে না। আমি বলব, এই একটি ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে যে সাহস জুগিয়েছিল, অনেক বড় ঘটনাকেও তা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
মার্ক টালির রিপোর্ট না থাকলে কেউ এ ঘটনা বিশ্বাস করত না। পাকিস্তান সরকার প্রথমে অস্বীকার করেছিল, পরে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। মার্ক টালি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার বন্ধু, এ দেশের জনগণের বন্ধু এবং সত্যিকারের একজন মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব।
শুধু একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতায় তার অবদান নিয়ে স্মরণ করলে সাংবাদিক মার্ক টালির প্রতি বড় অন্যায় করা হবে। মার্ক টালি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার মানুষ এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে রয়েছে আরও অনেক চমকপ্রদ ঘটনা। ভারতবর্ষেই তার সাংবাদিক জীবনের শুরু এবং উপমহাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী।
যে মানুষটা একসময় পাদ্রি হতে চেয়েছিলেন, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রিস্টধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, যিনি দুনিয়ার অশান্তি দূরে ঠেলে ভারতবর্ষের কোনো গির্জায় শান্তিতে ধর্মযাজক হয়ে বসবাস করতে চেয়েছিলেন—কীভাবে যেন একটি ছোট ঘটনায় তার সব পরিকল্পনা ওলোটপালট হয়ে গেল।
পরে বিবিসির হয়ে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে দুনিয়ার সংকটময় স্থানগুলোতে। বাংলাদেশের যুদ্ধ, ভারতে শিখদের গোল্ডেন টেম্পলে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর দখলদারি—এরকম অসংখ্য সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়েছে তাকে। বাবরি মসজিদ ভাঙা ও সেখানে রাম মন্দির নির্মাণ নিয়ে যে হাঙ্গামা হয়েছিল, ওই হাঙ্গামায় তার জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, অল্পের জন্য বেঁচে যান সেবার।
ষোড়শ শতাব্দীর অযোধ্যার বাবরি মসজিদটি ১৯৯২ সালে হিন্দু দাঙ্গাবাজরা ভেঙে ফেলে। এই দাঙ্গাবাজদের নেতৃত্ব দিয়েছিল তৎকালীন বিজেপির কর্মীরা, যারা দাবি করেছিল মসজিদটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের জায়গায় নির্মিত।
আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় এই ঘটনা কভার করার সময় একদল হিন্দু জনতা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। তারা ছবি তোলার সরঞ্জাম ও টেলিভিশনের যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করছিল এবং মার্ক টালির নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিল। কারণ তিনি তখন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো প্রধান এবং মসজিদ ভাঙা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের উগ্রতার সমালোচনা করে একাধিক রিপোর্ট করেছিলেন।
অল্পের জন্য হামলা থেকে রক্ষা পান তিনি। একটি ছোট মন্দিরে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই দীর্ঘক্ষণ তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। পরে একটি লম্বা শাল জড়িয়ে ছদ্মবেশে পালিয়ে যান। বাবরি মসজিদ নিয়ে সত্য প্রকাশের জন্য ভারতীয় সরকার তাকে যথেষ্ট হেনস্তা করেছিল।
২৫ জানুয়ারি নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে মারা গেলেন বাংলাদেশের বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালি। যে শান্তির খোঁজে তিনি পাদ্রি হতে চেয়েছিলেন, ওই শান্তির জগতেই তিনি ফিরে গেলেন। মার্ক টালি চলে গেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি যে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন, তা রেখে গেছেন বাংলাদেশিদের জিম্মায়। এখন আমাদের দায়িত্ব মার্ক টালির ওই বন্ধুত্বকে যথাযথ সম্মান দিয়ে সংরক্ষণ করা।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক