Published : 26 Nov 2025, 01:10 AM
ঢাকা শহরে কোন জায়গায় নিয়মিত আগুন লাগে? উত্তরটা সম্ভবত সবাই জানে। কড়াইল বস্তি। আগামী দিনে বিসিএস প্রিলিমিনিনারিতে এ ধরনের কোনো প্রশ্ন আসলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগাটা বার্ষিক কুচকাওয়াজের মতো নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এখানে সর্বশেষ মঙ্গলবার দুপুরে ভয়াবহ আগুন লাগল এবং সেই আগুন নেভাতে সময় লেগেছে সোয়া পাঁচ ঘণ্টা। এই আগুন যেন অন্য সব দিনের তুলনায় আরও নিষ্ঠুর ছিল। এই বস্তির অদূরেই আমার কর্মস্থল। দুপুরের পর পরই খেবর পেলাম, কড়াইলে আবার আগুন লেগেছে। অফিসের ৯তলা থেকেই দেখা যাচ্ছিল আগুনের লেলিহান শিখা। এবার আগুন শুধু ঘর পোড়ায়নি, পুরো আকাশটাই যেন গ্রাস করে ফেলেছিল। লেকের ওপারে তাকালে মনে হচ্ছিল কালো ধোঁয়ার পাহাড় উঠছে। আগুনের লেলিহান শিখা এত উঁচু যে, দূর থেকেও তাপ এসে মুখে লাগে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দুই-তিনশো ঘর ভস্মীভূত। শিশুদের কান্না, মায়েদের আর্তচিৎকার, বৃদ্ধদের হাহাকার মেশানো দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব জমে আছে।
রাতে যখন যখন ঘরে ফিরছিলাম, লেকের ধারে বস্তিতে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের ভিড় দেখলাম। কানে ভেসে এল নানা ক্ষয়ক্ষতির কথা। কারও বাচ্চার পরীক্ষার বই নেই, কারও সব বেতন জমা ছিল একটা প্লাস্টিকের ট্রাঙ্কে, কেউ রান্নার হাঁড়িটাও বাঁচাতে পারেনি। আগুনের ছাইয়ের মতোই ছাই হয়ে গেছে মানুষের স্বপ্ন, ছোট ছোট সঞ্চয়, গোপন দুঃখের ওপর গড়ে তোলা ছোট্ট সংসার। আগুনটা দেখে মনে হচ্ছিল, এই শহরটা যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামক ভাস্কর্যের মতো মানুষের দিকে তাকিয়েই আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না!
কড়াইল বস্তি যেন ঢাকার বুকের ওপর থাকা একটা আলাদা পৃথিবী। গুলশান-বনানীর উঁচু দালানগুলোর নিচে, তাদের আড়ম্বর আর আলোর পাশে এতটাই বিপরীত এক জীবন যে, কখনো কখনো মনে হয়, এটা যেন শহরের বিবেককে প্রশ্ন করে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে বস্তিটাকে সুন্দর লাগে, মনোরম লাগে। লেকের ধার, টিনের ঘরগুলো, রঙিন কাপড় শুকানোর দড়ি… সব মিলিয়ে টুকরো টুকরো শান্তির মতো। কিন্তু কাছে গেলে ভুল ভাঙ্গে। বোঝা যায়, এই সব সৌন্দর্য আসলে টিকে থাকার সংগ্রামের শরীরে জোড়া লাগানো এক-একটা পাতলা পলিথিন ছাড়া আর কিছু নয়।
যখনই শুনি, কড়াইলে আগুন, বুকটা কেমন শুষ্ক হয়ে হয়ে আসে। কারণ আমি জানি, এ আগুন শুধু দুর্ঘটনা নয়। এ আগুন মানুষের জীবনে ঢুকে পড়া দুঃস্বপ্ন। কতগুলো পরিবার আছে, যারা গত পাঁচ বছরে তিনবার ঘর হারিয়েছে। কারও হয়তো দুই মাস আগেই নতুন টিন কিনে ঘর বানানো হয়েছিল। কেউ ধার করে একটা ফ্যান এনেছিল। কোনো বাবা ঠিক করেছিল এই মাসে ছেলেমেয়ের স্কুলে ভর্তি করবে। কত শত পরিকল্পনা, আর তার সবই পুড়ে এক গাদা ছাই।
ভাবলে খুবই অসহায় লাগে যে, একটা মানুষ তার সবকিছু হারিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করবে। তারপর আবার আগুন লাগবে। আবার শূন্যতে নামবে। এই শূন্যতার চক্র যেন কড়াইলের মানুষদের জীবনেই বাঁধা আছে।
শহরের অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী আমরা যখন এসি রুমে বসে এসব দেখছি, তখন কড়াইলের গলিতে গলিতে লোকেরা পানির বালতি হাতে ছুটছে, পুরুষেরা ভাঙা টিন খুলে ফেলে আগুন আটকানোর চেষ্টা করছে, নারীরা বাচ্চাদের বুকে চেপে ধরে দৌড়াচ্ছে, কোথাও নিরাপদ জায়গা খুঁজতে। আগুনের দাউ দাউ একদিকে, আরেক দিকে চেঁচামেচি, কান্না, গালিগালাজ, দৌড়ঝাঁপ সব মিলিয়ে ভয়, আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা একাকার হয়ে যায়।
আজকের আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে লেকের পানি টেনে নিতে হয়েছে। গলি এমন সরু যে, গাড়ি তো দূরের কথা, একজন মানুষও পিঠে বোঝা নিয়ে হাঁটতে পারে না। দমকলকর্মীদের দৌড়ে টেনে নেওয়া পাইপ যেন শহরের অক্ষমতার প্রতীক। যেন পুরো ঢাকা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু এগিয়ে এসে হাত বাড়াতে পারছে না।
প্রতিবার আগন লাগে, আর শোনা যায়, এ আগুন নাকি দুর্ঘটনা। চুলার আগুন, মশার কয়েল, শর্টসার্কিট। এসব শুনলে কেমন বিরক্ত লাগে। কারণ এ হলো সত্যের শুধু অর্ধেক। বাকি অর্ধেক কেউ মুখে বলে না। বলা যায়ও না।
বস্তিবাসী বলে, এই আগুন স্বাভাবিক না। তাদের এই কথাকে উপেক্ষা করতে পারি না। প্রশ্ন হলো, কারা করে? কেন করে? প্রমাণ নেই। কিন্তু সন্দেহের গন্ধটা লুকোনো যায় না। আগুন যেন কোনো এক অমানবিক পরিকল্পনার হাতিয়ার। দখলদারির খেলা, জমির হিসাব, রাজনৈতিক চাপ ইত্যাদি সবকিছু মিলেমিশে এখানে আগুনকে প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত করেছে।
আমার সবচেয়ে কষ্ট লাগে সেই শিশুদের দিকে তাকিয়ে, যারা আগুন লাগার সময় বাবার হাত ধরে চিৎকার করে বলছিল, আমার খাতা? আমার ব্যাগ?
তাদের বাবা শুধু দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে ছিল! একটা ছোট শিশু কান্নাকাটি করতে করতে বলেছিল, আমার স্যার যদি কাল জিজ্ঞেস করে খাতা কোথায়? কি বলব?
এই শহর, এই দেশ কি শিশুর প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবে?
কড়াইল বস্তির মানুষগুলো নিজেরাই বলে, আগুনের সঙ্গে তাদের সখ্য হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি আমি জানি, এটা আসলে বেঁচে থাকার বিড়ম্বনা, মানিয়ে নেওয়ার মিশ্র বেদনা। বারবার আগুনের পর তারা আবার ঘর বানায়, আবার স্বপ্ন বানায়, আবার বাঁচতে থাকে। এ বাঁচাটাও যেন এক ধরনের প্রতিবাদ।
কড়াইল বস্তি যে কেমন ঘনবসতিপূর্ণ, সেটা না দেখলে বোঝা যায় না। একটা ঘরের চুলা আরেকটা ঘরের কাপড় শুকানোর দড়ির কাছে। বাথরুমের পাইপ আর বিদ্যুতের তার একসঙ্গে ঝুলে থাকে বাতাসে। চোরাই ইলেকট্রিক লাইনের জটলা দেখলে মনে হয়, যেন পুরো পাড়া দাঁড়িয়ে আছে একটা মাত্র স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায়।
তার ওপর আছে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ, পানির পাইপের ফুটো, কাঁচা রাস্তা, কাঠের বেড়া, টিনের ঘর, থেঁতলানো ইট, সব মিলিয়ে আগুন ধরার মতো উপাদান এখানে এত বেশি যে, আগুনের জন্য আলাদা ষড়যন্ত্রেরও দরকার হয় না। আবার অনেক সময় হয়তো সত্যিই দরকার হয়।
আর সরকারের অবস্থান? পুরাই হাত-পা গুটানো। তারা বিরক্ত স্বরে বলে, এরা অবৈধভাবে থাকে, তাই স্থায়ী সমাধান কঠিন। নির্বাচিত, চেপে বসা কিংবা অন্তর্বর্তী, সব সরকারের কর্তাব্যক্তিদের একই কথা, একই বক্তব্য। কিন্তু এই ‘অবৈধ’ মানুষেরাই তো শহরের সব চাকা ঘোরায়। তাদের ছাড়া ঢাকা দুদিনও চলবে না!
মঙ্গলবারের আগুনের পর অনেক পরিবার রাতটা কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। কারও ঘর নেই, কারও জামাকাপড় নেই, কারও খাবার নেই। ওদের মধ্যে কেউ কেউ আগুন নেভানোর সময় ধোঁয়ার গন্ধে অসুস্থ, আবার কেউ শুধু চুপচাপ বসে আছে, তাদের চোখে অবিশ্বাস, ক্ষোভ, ভয়, আতঙ্ক… আর বিশাল এক অনিশ্চয়তা। তাদের কে সান্ত্বনা দেবে? কী বলে সান্ত্বনা দেবে?
আগুন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ঢাকার অভিজাত দেয়ালের পাশে আরেকটি শহর আছে, যে শহরটা লড়াই করে, পুড়ে, আবার দাঁড়ায়। কড়াইল যেন এক নীরব শহর, যেখানে মানুষের কষ্ট এত বেশি যে, কান্নার আর আলাদা শব্দ হয় না।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, আগুনের ভয়াবহতা শুধু ঘর পোড়ানো নয়, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো–এই শহরটা আগুনকে নিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগুন ঘর পোড়ায়, হয়তো সংবেদনশীল অনেকের মনও পোড়ায়। কিন্তু ক্ষমতাবানদের, যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিবেকে একটু আচড়ও দিতে পারে না। গরিবের বাড়ি পুড়লে আর কার কি যায় আসে?