Published : 19 Apr 2026, 03:13 PM
মুসলিম লীগের রক্তচক্ষু আর দমন-পীড়নের কঠিন সময়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যেভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা আজও বিস্ময়ের। সেদিনের সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ জন কর্মী। সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে যখন ঢাকার কোনো মিলনায়তন কর্তৃপক্ষ জায়গা দিতে সাহস পায়নি, তখন কাজী হুমায়ুন বশীরের ব্যক্তিগত বাসভবন ‘রোজ গার্ডেন’ হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের সূতিকাগার। একটি রাজনৈতিক দলের শুরুটা যে কতটা প্রতিকূল হতে পারে, রোজ গার্ডেনের সেই দোতলার হলরুম তার সাক্ষী।
তবে ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হলো এই দলটির অপ্রতিরোধ্য গতি। প্রতিষ্ঠার মাত্র ২২ বছরের মাথায় এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বিশ্বমানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, দলের জন্মলগ্নে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বন্দি থেকেও যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা তার তৎকালীন রাজনৈতিক গুরুত্বকেই স্পষ্ট করে। ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তিনি ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠেন আন্দোলনের প্রাণপুরুষ এবং অর্জন করেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে একজন ব্যক্তি, একটি দল এবং একটি দেশের স্বপ্ন একই বিন্দুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এটি কেবল একটি দলের ইতিহাস নয়, বরং একটি জাতির শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য গল্প।
সব বড় গল্পই কেন যেন ট্র্যাজেডিতে গিয়ে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটিতে যখন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, তখন মুহূর্তের মধ্যেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ এক অনিশ্চিত অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল। মনে হয়েছিল, একটি নতুন দেশের স্থপতিকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে দলটিও বুঝি চিরতরে মুছে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের বাঁক বদল হয় নাটকীয়ভাবে। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দলের হাল ধরে নির্বাসন ও সংগ্রামের দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন।
১৯৯৬ থেকে ২০২৪—এই দীর্ঘ সময়কালের বড় একটি অংশ জুড়ে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করেছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, আবারও সেই অগাস্ট মাসেই দলটি তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। যে দলটির শিকড় ছিল গভীরে, সেই দলটিকে মাত্র ৩৬ দিনের এক আকস্মিক আন্দোলনের মুখে চরম পতনের স্বাদ নিতে হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানে খোদ শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। রাজপথের সেই চিরচেনা আধিপত্য নিমিষেই ধুলোয় মিশে যায়। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত দলীয় কার্যালয়গুলো ভাঙচুর হয়, আর মাঠপর্যায়ের কর্মীরা পড়ে যান চরম নিরাপত্তাহীনতা ও নিপীড়নের মুখে। প্রতিষ্ঠার সেই রোজ গার্ডেন থেকে আজকের এই ধ্বংসস্তূপ—আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ পথচলা যেন উত্থান আর পতনের বিষাদময় উপাখ্যান। মাঝেমধ্যে ঝটিকা কর্মসূচি দিলেও নিষিদ্ধ দল হওয়ার কারণে গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলা দুরূহ। গতবছর ১০ নভেম্বর নূর হোসেন দিবসে গুলিস্তানের বঙ্গব্ন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পিটুনির শিকার হন দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয়গুলো খোলার একটা হিড়িক লেগেছিল, যা অচিরেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিরোধের মুখে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অথচ ১৯৭৫ সালের সেই ভয়াবহ ধকল কাটিয়ে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগের কিন্তু খুব বেশি সময় লাগেনি। মাত্র এক বছরের মাথায়, ১৯৭৬ সালের ২৫ অগাস্ট ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে দলটি আবারও সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে সেই পুনর্গঠনের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না; বরং তা ছিল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর ভাঙা-গড়ার এক জটিল সমীকরণ। ১৯৭৭ সালের সম্মেলনে যখন কোনো একক নেতৃত্বে ঐকমত্য আসছিল না, তখন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়ে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন।
আওয়ামী লীগের এই সংকটকালীন সময়টি ছিল নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষার। ১৯৭৮ সালে আব্দুল মালেক উকিল সভাপতি ও আব্দুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর দলের ভেতরে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যার ফলে মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় পাল্টা আওয়ামী লীগ। এত অনৈক্য আর প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটির জনভিত্তি যে কতটা শক্তিশালী ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন। মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন অংশটি প্রায় ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয় এবং চরম বৈরী পরিবেশেও ৩৯টি আসনসহ ২৭ শতাংশের বেশি ভোট পায়। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করা গেলেও সাধারণ মানুষের মন থেকে দলটিকে মুছে ফেলা ছিল অসম্ভব।
এবারের প্রেক্ষাপট কিন্তু অতীতের সব সংকটকে হার মানিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুতির প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দলটিকে ঘিরে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতায় আসা বর্তমান বিএনপি সরকারও দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখেছে। শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই এখন হয় কারাগারে, না হয় বিদেশের মাটিতে ফেরারি। এই ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি আর কখনো ফিরতে পারবে?
আওয়ামী লীগ বিরোধীদের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনা তার জীবদ্দশায় দলটিকে আর পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন না। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। দলটি কত দ্রুত আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে টানা ৪৫ বছর সভাপতির দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর। প্রথমত, তাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কবে দেশে ফিরবেন? যদিও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাকে দিল্লিতে পাঠানো হয়েছিল, তবুও ‘দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া’র যে তকমা তার গায়ে লেগেছে, তা এক বড় রাজনৈতিক কলঙ্ক হিসেবে তাকে তাড়া করে ফিরছে, তাড়া করবে আরও অনেকদিন। অনেকের মতেই, ভারতে এই নির্বাসিত জীবনের চেয়ে দেশের মাটিতে কারাবরণ করা তার জন্য অনেক বেশি সম্মানজনক হতো। তবে বাস্তবতা হলো, দেশে ফিরলে তাকে হয়তো ফাঁসির মতো চরম দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। আর সেই জীবনঝুঁকির কথা মাথায় রাখলে, খুব দ্রুত তার পক্ষে দেশে ফেরা হয়তো সম্ভব নয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় দিল্লির একটি সুরক্ষিত সরকারি বাসভবনে অবস্থান করছেন। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার সেখানে থাকা বা এর শর্তাবলি নিয়ে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে এটা স্পষ্ট যে তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় নিরাপত্তা বলয়ের আশ্রয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণ অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর হলেও এ দেশের একটি বড় জনশক্তির মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড ভারত-বিরোধী মনোভাব।
এই বাস্তবতাকে মাথায় রাখলে মনে হয়, দীর্ঘমেয়াদে ভারতের মাটিতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য খুব একটা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। জনমতের এই ভারত-বিদ্বেষী স্রোত তার রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে পারে। তাই দিল্লিতে তার এই অবস্থান হয়তো তাকে নিরাপদ রাখছে, কিন্তু দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ফেরানোর লড়াইয়ে এটি খুব একটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে না।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ দিল্লি এতদিন উপেক্ষা করলেও এবার ঢাকার অনুরোধ ‘আইনি ও বিচারিক পন্থায়’পর্যালোচনা করার কথা বলেছে। ১৭ এপ্রিল নয়া দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা বলেন। এমন এক সময়ে দিল্লির এই বক্তব্য এল, যখন আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর তলানিতে পৌঁছানো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরাতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার কথা বলছে ভারতের নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ভারতের এই নতুন অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এখন আর কেবল পুরোনো বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে বসে থাকতে চাচ্ছে না; বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে ভারতের নিরাপত্তা বলয়ে রাখা যেখানে দিল্লির জন্য এক বড় কূটনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে ‘আইনি পর্যালোচনার’ কথা বলে ভারত সম্ভবত একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছে। কূটনৈতিক দাবার এই চালে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে—ভারত কি সত্যিই আইনি পথে হাঁটবে নাকি এটি স্রেফ সময়ক্ষেপণের কৌশল—তা সময়ই বলে দেবে।
শেখ হাসিনার জন্য ভারত ছেড়ে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যে যাওয়া সম্ভব হলে সেটি আওয়ামী লীগের জন্য অনেক বেশি ইতিবাচক হতো। বিশেষ করে, যুক্তরাজ্যের বিকল্পটি এক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী। ব্রিটেনের সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এছাড়া ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি সেখানকার রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী, যা তার জন্য একটি বড় শক্তির জায়গা হতে পারত। শেখ হাসিনা লন্ডনে অবস্থান করলে তা কেবল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা চিকিৎসার জন্যই সহায়ক হতো না। দলের রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত তৈরির কাজেও দারুণভাবে লাগত।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনার ব্রিটেন বা আমেরিকায় যাওয়ার বিষয়টি কেবল তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এই মুহূর্তে তাকে গ্রহণ করতে আগ্রহী কি না। আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ এবং কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে তার এই কাঙ্ক্ষিত যাত্রা এখন বিরাট অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
কোনো কোনো পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব বদলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা থেকে অপমানজনক পতন ও দলটির বর্তমান পরিণতি নিয়ে নেতাকর্মীদের অনেকের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ-হতাশা থাকলেও, এটা বোঝা যায় যে দলটি চরম সংকটের মুখেও কোনো পরিবর্তনের পক্ষে নয়। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ছাড়া বিপর্যস্ত দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই নেতৃত্ব নিয়ে তাদের বিকল্প চিন্তার কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি যেহেতু এখনই দেশে ফিরতে পারছেন না, তাই শেখ হাসিনার উচিত হবে দেশে অবস্থানরত কোনো একজন নেতাকে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া। মনে রাখা দরকার, ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা যখন দলের সভাপতি হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩৪ বছর। এখন তার বয়স ৭৮।
দলটি পুনর্গঠনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগ তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেয়নি। এর ফলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। তাছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের পরিস্থিতি সামলাতে একের পর এক ভুল করেছে। নিজেদের আলোচনায় দলের অনেকের অনুশোচনা উঠে এলেও তা তারা প্রকাশ করতে চান না। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা করেননি। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে এখন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ফিরে আসার চিন্তা করতে হবে, যাতে তারা জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে। নিজেদের ভুলগুলো মেনে নিয়ে, দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক পথ খুঁজে বের করতে হবে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয় সেদিকে খেয়াল রাখা, দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ যাতে বেশি পরিমাণে দেশে আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের দিকে নজর দেয়নি। এতে সমাজে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা বেড়ে যায়। তরুণদের মধ্যে সেক্যুলার রাজনীতির তুলনায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি ঝোঁক বাড়ে। তাছাড়া সেক্যুলার রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বারবার আপস করেছে।
এটাও মনে রাখতে হবে যে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কেবল তাদের নিজের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে না। বর্তমান সরকারের আচরণের ওপর আওয়ামী লীগের এবং তাদের নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। হয়তো সেনাবাহিনীও। তাই আওয়ামী লীগের যুদ্ধটা ভীষণ কঠিন।
বিএনপির সামনে এখন দুটি পথ খোলা। তারা চাইলে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবে। বিএনপির জন্য অন্য বিকল্প হলো একটি ‘রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির’ পথ বেছে নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া। জামায়াতের দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উত্থান এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব কমাতে বিএনপির উচিত আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির মাঠ কিছুটা উন্মুক্ত করা।
অবশ্য আমাদের দেশের মেঠো রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে প্রায়শই প্রতিপক্ষ বলে মনে করা হয়। তাই বিএনপি আওয়ামী লীগকে ন্যূনতম কোনো সুযোগ দেবে বলে মনে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগকে সেই ক্ষেত্রে বিএনপির ব্যর্থতার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—আওয়ামী লীগ বিরোধী এই সম্মিলিত শক্তি দেশ চালাতে ব্যর্থ হলে মানুষ তাদের ওপরে ক্ষিপ্ত হবে। আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। সেই সময় আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠ দখলে নিতে পারে। বহু কারণে সময়সাপেক্ষ এই ব্যাপারটা কবে ঘটতে পারে তা কেউ জানে না। তাই অন্যের ব্যর্থতার ওপর নিজের ভাগ্যকে পুরোপুরি সঁপে না দিয়ে আওয়ামী লীগের উচিত হবে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠিত করা এবং শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
ড. মো. আবু নাসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন