Published : 11 Jun 2026, 01:31 PM
আর্জেন্টাইন লেখক ও সাংবাদিক এর্নান কাসিয়ারি প্রায় দুই দশক স্পেনে কাটিয়েছেন। সেই সময়ে তিনি বার্সেলোনায় খুব কাছ থেকে দেখেছেন ফুটবলের ক্ষুদ্র ঈশ্বর লিওনেল মেসির উত্থান। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর নিজের অভিবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা ও আবেগ থেকে লেখেন বিখ্যাত এক গল্প "লা বালিহা দে লিওনেল" (লিওনেলের স্যুটকেস) ।
গল্পটির যাত্রাও ছিল একেবারে নাটকীয়। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর কাসিয়ারি আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান Perros de la Calle-তে গল্পটি প্রথম পাঠ করেন। অনুষ্ঠান চলাকালে মেসিকে রেডিও স্টেশন থেকে সেটি শোনার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়। গল্পটি শুনতে শুনতে মেসি ও তার স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো কেঁদে ফেলেন। মুহূর্তেই গল্পটির আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে-প্রথমে আর্জেন্টিনায়, পরে সামাজিক মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে।
প্রবাস, পরিচয়, শিকড়ের প্রতি টান এবং লিওনেল মেসির প্রতি গভীর ভালোবাসায় ভরপুর এই অসাধারণ গল্পের সংক্ষিপ্ত রূপ পাঠকদের জন্য বাংলায় তুলে ধরলেন আসাদ মিরণ। বি.স
২০০৩ সালের শনিবারের সকালগুলোতে কাতালোনিয়ার টিভিথ্রি চ্যানেলে বার্সলোনার যুব দলের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। আর আর্জেন্টাইন অভিবাসীদের আড্ডায় প্রায় সব সময়ই দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো: কনডেন্সড মিল্কের ক্যান ফুটিয়ে কীভাবে দুলসে দে লেচে বানানো যায় এবং রোসারিও(আর্জেন্টিনার) থেকে আসা সেই পনেরো বছরের ছেলেটি- যে প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল করে- সে কখন খেলবে।
২০০৩-২০০৪ মৌসুমে লিওনেল মেসি সাঁইত্রিশটি ম্যাচে পঁয়ত্রিশটি গোল করেছিল। ফলে শনিবার সকালে কাতালান টেলিভিশনে তার ম্যাচগুলোর দর্শকসংখ্যা অনেক সময় রাতের অনুষ্ঠানগুলোকেও ছাড়িয়ে যেত। সেলুনে, বারে, এমনকি ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারিতেও মানুষ শুধু ‘এই ছেলেটিকে’ নিয়ে কথা বলত।
একমাত্র সেই-ই কোনো কথা বলত না। ম্যাচ শেষে সাক্ষাৎকারে কিশোরটি প্রায় সব প্রশ্নের জবাবে শুধু 'হ্যাঁ', 'না' বা 'ধন্যবাদ' বলেই মাথা নিচু করে থাকত। আমরা আর্জেন্টাইন অভিবাসীরা অবশ্য একটু বাচাল ছেলেকেই বেশি পছন্দ করতাম। তবে এরও একটা ভালো দিক ছিল। যখনই সে কোনো বাক্য তৈরি করত, তখনই তার উচ্চারণে স্পষ্ট ধরা পড়ত রোসারিওর ছাপ। ‘ফাল্তাস’-এর বদলে সে বলত ‘ফাল্তা’, শব্দের শেষে ‘s’ প্রায় গিলে ফেলত। কখনও কখনও 'a' ধ্বনিও 'u'-এর মতো শোনাত। এসব ছোট ছোট ব্যাপার আমাদের আশ্বস্ত করত।
আমরা অত্যন্ত স্বস্তির সঙ্গে বুঝতে পারলাম, সে আমাদেরই একজন। সে সেই ধরনের অভিবাসী নয়, যারা নতুন কোনো দেশে গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নেয় আর ধীরে ধীরে নিজের শিকড় ভুলে যায়। বরং সে ছিল তাদেরই একজন, যাদের স্যুটকেস সবসময় খোলা থাকে।
এখানে দুই ধরনের অভিবাসী আছে। একদল যারা স্পেনে আসা মাত্রই স্যুটকেসটা আলমারিতে তুলে রেখে 'ভালে', 'তিও' আর 'হোস্তিয়াস' বলতে শুরু করে (স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে স্প্যানিশ কথ্য ভাষার ব্যবহার)। আর আমরা, যারা স্যুটকেস খোলা রেখেছিলাম, তারা 'মাতে' কিংবা 'ইয়েসমো'-র মতো নিজস্ব উচ্চারণ ও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে ছিলাম। আমরা বলতাম 'ইউবিয়া', 'কাইয়্যে'-আর্জেন্টাইন উচ্চারণে 'বৃষ্টি ও রাস্তা'।
সময় গড়াতে লাগল। মেসি বার্সার অবিসংবাদিত ১০ নম্বর খেলোয়াড় হয়ে উঠল। একে একে লিগ, কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে লাগল। আর সে এবং আমরা, অভিবাসীরা, উভয়েই জানতাম, স্পেনে থেকেও নিজের আর্জেন্টাইন উচ্চারণ ধরে রাখাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
ফুটবলের ড্রিবলিং বোঝাতে স্পেনে বলা হয় 'রেগাতে'; আর আর্জেন্টিনায় বলা হয় 'গামবেতা'। আর এখানে থেকে ‘রেগাতে’-র বদলে ‘গামবেতা’ বলে যাওয়াটা সহজ ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম, এটাই আমাদের শেষ প্রতিরোধ। আর সেই লড়াইয়ে মেসিই ছিল আমাদের নেতা। যে ছেলেটি প্রায় কথা বলত না, সে-ই আমাদের কথা বলার ধরনটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
তাই অবধারিতভাবেই, আমরা শুধু পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়ের খেলাই উপভোগ করতাম না, একই সঙ্গে নজর রাখতাম, সাক্ষাৎকারে সে যেন কোনো স্প্যানিশ অপভাষা ব্যবহার না করে ফেলে।
তার গোলগুলোর পাশাপাশি আমরা এটাও উদযাপন করতাম যে, লকার রুমে তার কাছে সবসময় 'মাতে', মানে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী পানীয় আর সেটি পান করার জন্য গরম পানির বোতল থাকতো। হঠাৎ করেই সে বার্সেলোনার সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষ হয়ে উঠেছিল। তা সত্ত্বেও অন্য দেশে থেকেও, আমাদের মতোই, সে কখনো নিজের আর্জেন্টাইন পরিচয় ত্যাগ করেনি।
প্রতিটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের উদযাপনে তার হাতে থাকত আর্জেন্টিনার পতাকা। ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসে আর্জেন্টিনার হয়ে যখন সে সোনার পদক জিততে গিয়েছিল, তখন ক্লাবের অনুমতির জন্যও অপেক্ষা করেনি। বড়দিন সে সবসময়ই রোসারিওতেই কাটাত, যদিও জানুয়ারিতে তাকে ন্যু ক্যাম্পে ফিরতে হতো। এভাবে, তার প্রতিটি কাজই ছিল আমাদের জন্য এক ইশারা—আমাদের জন্য, যারা ২০০০ সালে তার সাথে বার্সেলোনায় এসে পৌঁছেছিলাম।
বাড়ি থেকে দূরে থাকা আমাদের মতো মানুষদের জীবনে সে কতটা আনন্দ এনে দিয়েছিল, তা বোঝানো কঠিন। সে আমাদের প্রবাসের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিয়েছিল, জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সে আমাদের শিকড়ের কথা ভুলে যেতে দেয়নি। মেসি আমাদের এতটাই স্বাভাবিক ও নীরবে আপন করে নিয়েছিল যে, যখন আর্জেন্টিনা থেকে তার বিরুদ্ধে গালিগালাজ আর অভিযোগের ঝড় উঠতে শুরু করল, আমরা কিছুতেই তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
"হৃদয়হীন। তুমি শুধু টাকার কথা ভাবো। ওখানেই থাকো। তোমার কাছে জাতীয় দলের জার্সির কোনো মূল্য নেই। তুমি গালিসীয়, আর্জেন্টিনীয় নও। ভাড়াটে।"
আমি পনেরো বছর আর্জেন্টিনার বাইরে কাটিয়েছি। আর পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা থেকে এমন অবজ্ঞার কণ্ঠস্বর শোনার চেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন আর কিছু হতে পারে না।
আর সেই কথাগুলো যখন একজন বাবা নিজের সন্তানের মুখে শোনে, তখন তার চেয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে? মেসি তার ছেলে থিয়াগোর মুখেই শুনেছিল,
“বাবা, আর্জেন্টিনায় ওরা তোমাকে কেন মেরে ফেলতে চাইছে?”
সন্তানের মুখে বাবার প্রতি এমন কথা শোনার ব্যপারটি ভাবলেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি জানি, একজন সাধারণ মানুষ হলে এতদিনে সে ক্ষোভে ফেটে পড়ত।
এ কারণেই ২০১৬ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে মেসির পদত্যাগ আমাদের মতো অভিবাসীদের কাছে এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছিল। আমরা এভাবে তার কষ্ট পাওয়া দেখতে পারছিলাম না। কারণ আমরা জানতাম, সে তার দেশকে কতটা ভালোবাসে এবং সেই নাড়ির বন্ধন অটুট রাখার জন্য কত চেষ্টাই না সে করে যাচ্ছিল।
যখন সে পদত্যাগ করল, তখন মনে হলো মেসি যেন হঠাৎ করেই কিছু সময়ের জন্য আগুন থেকে হাত সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু তার নিজেরই নয়। সেইসব সমালোচনায় আমরাও দগ্ধ হয়েছিলাম।
আমার মতে, সাম্প্রতিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের সেই বিকেলে, যখন অপমান আর গালিগালাজ সহ্য করতে করতে ক্লান্ত হয়ে মেসি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ঠিক তখনই পনেরো বছর বয়সী এক কিশোর তাকে ফেসবুকে একটি চিঠি লিখেছিল। চিঠির শেষ বাক্য ছিল:
“থেকে যাওয়ার কথা ভাবো। অন্তত আনন্দ করার জন্য থেকে যাও- যে আনন্দটা এই মানুষগুলো তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইছে।”
সাত বছর পর দেখা গেল, সেই চিঠির লেখক এনজো ফের্নান্দেসই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির অন্যতম সতীর্থ হয়ে উঠেছে।
মেসি জাতীয় দলে ফিরেছিল। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, যাতে তাকে চিঠি লেখা সেই শিশুদের কেউ বিশ্বাস না করে যে জীবনে হাল ছেড়ে দেওয়া কোনো বিকল্প পথ হতে পারে।
আর যখন সে ফিরে এল, তখন যা কিছু অধরা ছিল তার সবটাই সে জিতে নিল। একই সঙ্গে নিন্দুকদের মুখও বন্ধ করে দিল। যদিও কেউ কেউ তাকে মাইকের সামনে “প্রথমবারের মতো অশালীন” বলে আবিষ্কার করেছিলেন। সেটা তখনই, যখন সে বলেছিল:
"Qué mirá, bobo? andá payá!" (কী দেখছিস, হাঁদারাম? ভাগ এখান থেকে!)
কিন্তু আমরা যারা পনেরো বছর ধরে তার কথা বলার ধরন লক্ষ্য করেছি, তাদের কাছে এটি ছিল এক নিখুঁত বাক্য। কারণ সে প্রতিটি ‘s’ ধ্বনি গিলে ফেলেছিল আর তার ইয়েইসমো (আর্জেন্টাইন উচ্চারণ) এখনও অটুট রয়েছে।
আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, সে এখনও সেই আগের মানুষটিই আছে, যে আমাদের প্রবাসজীবনকে আনন্দময় করে তুলেছিল।
এখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে ফিরে গেছে, কেউ থেকে গেছে। কিন্তু আমরা সবাই আনন্দ পেয়েছি মেসিকে তার খোলা স্যুটকেসে বিশ্বকাপ নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখে। এই মহাকাব্যিক গল্পটি কখনোই ঘটত না, যদি পনেরো বছরের মেসি তার স্যুটকেসটি আলমারিতে লুকিয়ে রাখত। যদি ছেলেবেলাতেই 'ভালে' 'তিও' আর 'হোস্তিয়া'র কাছে আত্মসমর্পণ করত। কিন্তু সে কখনো নিজের উচ্চারণ ভুলে যায়নি, ভুলে যায়নি পৃথিবীতে তার নিজের জায়গাটাও।
এই কারণেই সমগ্র মানবজাতি মেসির এমন প্রবল বিজয় কামনা করেছিল। পৃথিবীর শীর্ষে এর আগে কোনো সাধারণ মানুষকে কেউ কখনো দেখেনি।
আর গতকালও, প্রতি বছরের মতো, মেসি ইউরোপ থেকে রোসারিওতে ফিরে এসেছে পরিবারের সঙ্গে বড়দিন কাটাতে আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে। তার ঐতিহ্য বদলায় না।
তবে একটাই জিনিস বদলেছে- এবার সে তার স্যুটকেসে করে আমাদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্খিত ট্রফিটাই নিয়ে এসেছে।