Published : 05 Dec 2025, 10:44 PM
বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পরিবর্তে ‘দখলদার বাহিনী’ লেখা নিয়ে নানা পরিসরে সমালোচনা চলছে। ৪ ডিসেম্বর এ নিয়ে বিডিনিউজের একটি খবরে বলা হয়, ৪ ঘণ্টার ২০০ নম্বরের এ পরীক্ষার ‘মহানন্দা’ সেটের ‘১’ নম্বর প্রশ্নটি এরকম: ‘১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।’ একজন প্রার্থীর বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ ও দখলদার বাহিনী শব্দগুলো দেখে কিছুটা খটকা লেগেছে। বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষার্থীরাও আলোচনা করেছেন।’
অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হেয় করতে গিয়ে নানারকম বয়ান হাজির করা—যে বয়ানগুলো বছরের পর বছর বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর তরফে দেওয়া হতো নিতান্তই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। যে বয়ানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামকে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘আত্মসমর্পণকারী’ ও ‘আপসকামী নেতা’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা রয়েছে। যে বয়ানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে ‘এই সংখ্যা দুই তিন হাজারের বেশি নয়’ বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আত্মদান ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাজি রাখা লড়াই সংগ্রামকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের এমন সব বয়ান সামনে আনা হচ্ছে যা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী তথা মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিগুলো বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ৪ মাসের মাথায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন: ‘বাঙালীরা আলাদা হয়ে গেলে পাকিস্তান খণ্ড খণ্ড হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এখন উন্মাদ। তাঁর পূর্বপুরুষ নাদির শাহের মতোই নির্বিচারে নরহত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন। বহু লক্ষ মরেছে। চল্লিশ পঞ্চাশ লক্ষ প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে। ভারতও জড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। এখন দুনিয়া কী করে দেখা যাক।’ (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তধারা/১৯৭১, পৃ. ৮)।
যুদ্ধ শুরুর চার মাসের মাথায়ই লেখা হলো যে, লাখ লাখ মানুষ খুন করা হয়েছে। তাহলে বাকি মাসগুলোয় কী হয়েছে, সেটি সহজেই অনুমেয়। অথচ গত এক বছর ধরে একদল লোক বলার চেষ্টা করছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বড়জোর কয়েক হাজার!
এটা ঠিক যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কটা বেশ পুরোনো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই বিতর্ক অনেকটা কমে এলেও অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পরে জনপরিসরে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুলছেন। তাদের দাবি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যাটি ‘আওয়ামী বয়ান’।
বাস্তবতা হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সত্যিই কত মানুষ শহীদ হয়েছেন, একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সর্বজনগ্রাহ্য গবেষণার মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধশতাব্দী পরেও সেটি নিরূপণ করা যায়নি। এর একটি বড় কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বারবারই নানাবিধ অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। আবার মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে ক্ষমতায় থাকা সব দলের দৃষ্টিভঙ্গিও এক ছিল না।
বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধে শহীদের গ্রামভিত্তিক তালিকা প্রণয়নের কথাও শোনা গিয়েছে। কিন্তু সেটি খুব একটা হালে পানি পায়নি। এত বছর পর অবশ্য প্রতিটি গ্রামে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করাও কঠিন।
প্রশ্ন হলো ৩০ লাখ সংখ্যাটি কি সত্যিই অতিরঞ্জিত? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু একজন বিদেশি সাংবাদিককে ৩০ লাখ শহীদের কথা বলার পর থেকে বিতর্ক চলেছে। অথচ মওলানা ভাসানী যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়েই ১০ লাখ মানুষ হত্যার কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কবি আসাদ চৌধুরীর লেখা বেশ কয়েকটি কবিতায় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে। ‘রিপোর্ট ১৯৭১’ কবিতায় তিনি লিখেছেন ‘১০ লাখ গলিত লাশ’।
দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ লোক ও দুশতাধিক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে...’। তখনও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে।
১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি রাশিয়ার প্রাভদা পত্রিকায়ও ৩০ লাখের কথা উল্লেখ আছে। ওই বছরের ৫ জানুয়ারি মর্নিং নিউজও ৩০ লাখের কথাই লিখেছে। একই দিন ঢাকার পত্রিকা দৈনিক অবজারভারের শিরোনাম ছিল, ‘পাক আর্মি কিল্ড ওভার ৩০ লাখ পিপল’। এর আগের দিন আজাদ পত্রিকাও প্রাভদার কথা উল্লেখ করে তাদের সংবাদে। (আরিফ রহমান, প্রতিচিন্তা, ১০ ডিসেম্বর ২০২১)।
সুতরাং এতকিছুর পরেও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নতুন বয়ান হাজিরের মধ্যে যে রাজনীতি লুকিয়ে আছে, সেটি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। বরং ৫ অগাস্টের পরে বেশ প্রকাশ্য। সেই তৎপরতার অংশ হিসেবেই কি বিসিএসের প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে দখলদার বাহিনী লেখা হল কি না, এই প্রশ্ন উঠছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই সংগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রতিরোধ যুদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হল কি না এবং সচেতনভাবেই পাকিস্তানি বাহিনীর পরিবর্তে দখলদার শব্দটি ব্যবহার করা হল কি না—এই প্রশ্ন জনমনে আছে। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু দলীয় কর্মীর প্রোপাগান্ডা আর বিসিএসের প্রশ্ন কি এক হতে পারে? নাকি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা নতুন বয়ান তৈরি করছেন, তারাই বিসিএএসের প্রশ্ন লিখেছেন?
মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান এবং বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার এই মিশনের অংশ হিসেবেই কি সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে একজন আইনজীবী বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাসঘাতক বলে উল্লেখ করেছেন? আবার অনুষ্ঠানের যে উপস্থাপক এই কথার প্রতিবাদ করেছেন, তাকে নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল হচ্ছে। যথারীতি তাকেও ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে গালি দেওয়া হচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এই টেলিভিশন চ্যানেলটি ছিল আন্দোলনকারীদের প্রথম পছন্দ। এই উপস্থাপকই মীর মুগ্ধ নিহত হওয়ার পর কেঁদেছিলেন অনুষ্ঠান সঞ্চালনার সময়। বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার প্রতিবাদ করায় এই উপস্থাপককেই এখন ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে ট্যাগ দেওয়া শুরু হয়েছে !
প্রসঙ্গত, অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পরে গত বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভয়েস অব আমেরিকাকে একটি ক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধ্বংস এবং জাতীয় শোক দিবস বাতিল করা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, You need to see what’s happening in this new situation. You do not seem to have any questions about how many students have sacrificed their lives, why they sacrificed their lives. First, we must admit that they, the students, said that we have pushed a reset button. The past is gone for sure. Now we will build up in new way. People also want that. And this new way means we must bring reforms. অর্থাৎ. অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণরা বলেছে যে, আমরা রিসেট বাটনে চাপ দিয়েছি। অতীত মুছে গেছে। এখন সময় নতুন পথ তৈরির। জনগণও এটা চায়। আর এই নতুন পথ বলতে বুঝায় আমাদের অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। (ভয়েস অব অ্যামেরিকা, ০৩ অক্টোবর ২০২৪)।
প্রসঙ্গত, রিসেট বাটন বলতে এমন একটি বোতাম বা অপশনকে বোঝায়, যা কোনো যন্ত্র, সফটওয়্যার বা সিস্টেমকে তার শুরুর (ডিফল্ট) অবস্থায় ফিরিয়ে দেয় বা নতুন করে চালু করে। যেমন মোবাইল ফোন হ্যাং হলে বা সমস্যা দেখা দিলে সেটিংস আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য রিসেট বাটনে চাপ দেওয়া হয়। ফলে প্রধান উপদেষ্টা রিসেট বাটন বলতে একাত্তর-পূর্ববর্তী বাংলাদেশের কথা বুঝিয়েছেন—এমন বিতর্ক ওঠে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার কথা বলেছেন। যদিও পরে এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: রিসেট বাটন চাপার কথা বলে তিনি কখনোই বাংলাদেশের গর্বিত ইতিহাস মুছে ফেলার কথা বলেননি। বরং তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি, যা বাংলাদেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে, অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে এবং কোটি মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার হরণ করেছে, সেটি থেকে বের হয়ে এসে নতুনভাবে শুরু করার কথা বুঝিয়েছেন।
গত ২৮ অগাস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আজকের বাংলাদেশ দেখলে বোঝা যায় না এই দেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।’ স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে এসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এই হতাশার মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশের চিত্র ফুটে ওঠে—সেটিই কথিত নতুন বাংলাদেশ কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। কেননা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেকেই নতুন বাংলাদেশ বলে অভিহিত করছেন। প্রশ্ন হলো, নতুন বাংলাদেশ মানে কী? তার চেহারাটা কেমন? গত এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা এবং ইসলাম রক্ষার নামে যেসব তৎপরতা চলছে, সেগুলোই কি নতুন বাংলাদেশ?
পরিশেষে, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনে নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। বড় অর্জন। জনগণের আন্দোলনের মুখে একজন শাসকের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। কিন্তু ওই বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জনকে হেয় করা; শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্বকে গুলিয়ে ফেলা; বাহাত্তরের সংবিধানকে কবর দেওয়া বা এই সংবিধান ছুড়ে ফেলার মতো বক্তব্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, সেই বাংলাদেশ কত শতাংশ লোকের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং সেই বাংলাদেশের চেহারাটি কেমন হবে—সেই প্রশ্নটি জনমনে আছে।