Published : 16 Sep 2025, 06:01 AM
ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুললেও বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ভোট বর্জন করে মাঠ ছেড়ে যায়নি। জাকসু নির্বাচনে তারা নির্বাচন বর্জন করে মাঠ ছেড়ে চলে যায়। ডাকসুতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভোটের হার প্রমাণ করে যে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসমাজের বড় অংশের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে তাদের নিজস্ব সমর্থন খুব বেশি শক্তিশালী নয়। অর্থাৎ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রদলের আওয়াজ যতটা বড়, ভোট প্রাপ্তির হিসেবে তাদের প্রকৃত শক্তি ততটা নয়।
জাকসুতে ছাত্রদলের সমর্থন বা ভোটার কেমন, তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা কেমন—তা বোঝার সুযোগ তারা নিজেরাই রাখল না। ভোট বর্জনের ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে ধারণা করা এখন কঠিন হয়ে গেল।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এরকম দুর্দশা হলো কেন? এর জন্য ছাত্রদলই কি দায়ী? নাকি এর পেছনে আছে বিএনপি হাইকমান্ডের ব্যর্থতা? ডাকসু, জাকসুর পর রাকসু, চাকসুতে কি এর চেয়েও খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে? এই ফলাফলের পরিণতি কী, জাতীয় রাজনীতিতেই বা এর প্রভাব কেমন? আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই বা এর কী প্রভাব পড়বে? জেন-জি প্রজন্মের এই মনোভাব কি বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবে? এসব প্রশ্ন আলোচনার আগে দেখা যাক, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন।
প্রথমত, বিএনপির নেতৃত্বে থাকা সিনিয়রদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনার অনেক পার্থক্য। বিএনপির সিনিয়র নেতারা এখনও আশির দশকের রাজনৈতিক আবহে পড়ে আছেন। বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ধারণার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তারা সচেতন হলেও গত দুই দশকের বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রভাব সম্পর্কে তারা উদাসীন। এই দুই দশকে বাঙালি মুসলমানের মনে ধর্ম ও নৈতিকতার ব্যবহার বিষয়ে যে নতুন বিচার-বিবেচনা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করার শক্তি ও আগ্রহ কোনোটাই বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নেই।
মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে তারা ব্যর্থ যে, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপির সিনিয়র নেতারাও অনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না, আর্থিক দুর্নীতি ও পাচারে যুক্ত হবেন না। তাদের কাজ, কথা, ব্যবহার ও টকশোতে কোথাও ওই নৈতিক শক্তির ঝলক দেখা যায় না। এসব নেতা ও তাদের পরিবারের জীবনযাপনের খরচের সঙ্গে তাদের নৈতিক আয়ের কতটা সামঞ্জস্য আছে—এই প্রশ্ন সাহস করে মুখে না বললেও, সুযোগ পেলে মানুষ ব্যালটে ওই প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করবে না। তরুণরা ডাকসু, জাকসুতে নীরবে ওই প্রশ্ন তুলেছে। বিএনপির হাইকমান্ড সম্ভবত তা দেখতে পাচ্ছে না। ফলে রাকসু ও চাকসুর পরিণতি কি হবে তা ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিএনপির যে প্রভাবশালী অংশ ছাত্রদল থেকে উঠে এসে এখন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন, তারা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষকে ‘ধাওয়া দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেবার’ যে ঘোষণা প্রকাশ্যে লাইভ টকশোতে দিয়েছেন—এটা শুধু মুখের কথা নয়, বরং তাদের রাজনীতির অন্তর্নিহিত বক্তব্য। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ যতবারই এটা দেখেছে, ততবারই ‘আওয়ামী লীগের উগ্রতা ও দম্ভকে’ স্মরণ করেছে।
বিএনপির মাঝবয়সী প্রভাবশালী নেতাদের এই দাম্ভিক আওয়াজ ডাকসু ও জাকসুর তরুণ শিক্ষার্থীরা দারুণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বলা দরকার, ডাকসু নির্বাচনের সময় ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ভিসির সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তা সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেশের মানুষ সরাসরি দেখেছে। তার অভব্যতা ছাত্রদলের আবিদ-তামিম-মায়েদ প্যানেলের সকল সুসভ্য প্রচেষ্টাকে নেতিবাচক প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বড় দলের বড় নেতার আচরণ বড় সংখ্যক মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবেই, তা সে দল আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি। তাই সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা যা-ই করুক না কেন, তা মানুষের নজর এড়াচ্ছে না।
তৃতীয়ত, ভারতীয় আধিপত্যবাদ, পলাতক আওয়ামী লীগ এবং দেশের মধ্যে থাকা গুপ্ত ভারতীয় আধিপত্যবাদের সহযোগী শক্তি সম্পর্কে বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। অন্যদিকে, এ বিষয়ে প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপি সম্পর্কে যে ভাবনা ছড়াচ্ছে, তা প্রতিরোধে বিএনপির বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ খুবই নড়বড়ে। বিএনপি প্রসঙ্গে, ভারত প্রশ্নে যে আলোচনা ও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে তা শুধু ডানপন্থী, ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী মনোভাবের মানুষজনকেই নয়, বিএনপির সমর্থন ভিত্তির মধ্যে থাকা র্যাডিক্যাল অংশকেও দ্বিধান্বিত ও বিভ্রান্ত করছে। বিএনপির নয়া বুদ্ধিবৃত্তিক অংশের যান্ত্রিক বয়ান কোনোভাবেই এই দুরবস্থা ঘোচাতে সাহায্য করতে পারছে না।
চতুর্থত, বিএনপি তার পরীক্ষিত রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে দূরত্ব তৈরি করছে। এটি কি দলের রাজনৈতিক কৌশল, নাকি দলের ভেতরের সাবেক বামপন্থীদের ইচ্ছা, নাকি ভারত তোষণ নীতির ফল—তা এখনও পরিষ্কার নয়। এই দূরত্ব কমানোর কোনো উদ্যোগ আপাতত বিএনপির পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। ডাকসু-জাকসু নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপির সম্মিলিত আচরণে ‘ক্ষমতায় এসেই গেছি’—এমন মনোভাব এই দূরত্ব তৈরির একটি বড় কারণ। এই বিবেচনা থেকেই জুলাই সনদ তৈরি ও তা বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পুরোনো মিত্রদের এভাবে দূরে ঠেলে দিলে তা যদি ঐক্যবদ্ধ বা সম্মিলিত বিএনপি বিরোধী জোটে পরিণত হয়, তবে সেটাও বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
দুই.
ডাকসু ও জাকসুতে শিক্ষার্থীদের রায় এবং ছাত্রদলের অবস্থান আমাদের চলমান রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। রাকসু ও চাকসুর ফলাফল এতে আরও হাওয়া দেবে।
দেশের প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে যে নতুন ৪ কোটি ভোটার আছে, যারা জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি, তাদের মনোভাব কিছুটা হলেও এইসব ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আঁচ করা যাচ্ছে। ফলে এই নতুন প্রজন্মের মন জয় করতে বিএনপি কী ব্যবস্থা নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।
একটা কথা পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে, দেশের রাজনীতির প্রভাবশালী অংশ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গণতন্ত্রের নির্ভার পথচলা নির্ভর করছে বিএনপির রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও সঠিক পদক্ষেপের ওপর। বিএনপি যদি এই গভীর সংকটের মুহূর্তে ভবিষ্যতের দিশা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিএনপির নিজের যেমন বিপদ, দেশের বিপদ আরও গভীরতর। একারণেই বিএনপিকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকাতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বিএনপি হলেও তা তাদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। দলীয় কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদ তাড়াতে যুক্ত হয়েছিল। এবং একটি নতুন শক্তি জীবন দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল বলেই ওই শক্তির ডাকে সাধারণ মানুষ পথে নেমেছিল। ওই শক্তি নতুন প্রজন্মের মধ্যেই নিহিত। এই প্রজন্মকে শুধু ‘এনসিপি’ বলে ভাবলে ভুল হবে। এই প্রজন্মকে বুঝতে ভুল হলে, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করলে, নতুন নতুন জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর সব বিপদ তৈরি করবে।
‘দুর্নীতি-দখল-পাচার’ জারিত সংস্কৃতির আচরণে বেড়ে ওঠা আমাদের প্রচলিত রাজনীতি দিয়ে সেই বিপদ ঠেকানো সম্ভব হবে না। নতুন ধারার নৈতিক রাজনীতি লাগবে। মানুষের মনে সংশয় তৈরি করা পুরোনো রাজনীতির সঠিক বিকল্প লাগবে। বিএনপিকে ওই কঠিন, অথচ অনিবার্য রাজনীতিই করতে হবে।
মানুষ বিএনপির মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দস্যুবৃত্তির’ ছায়াও দেখতে চায় না। সংখ্যার জোরে, হাতের জোরে, স্লোগানের জোরে, টকশোর কথার জোরে—মানুষের মনের এই আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করতে চাইলে তা টিকবে না।
অনেকেই বলছেন, ছাত্র সংসদের নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে না। যারা এরকম কথা বলছেন, তারা জনগণের শক্তিশালী অংশের মনের কথাটি বুঝতে চাইছেন না। তারা দেয়ালের লিখন পড়তে পারছেন না। তারা ফ্যাসিবাদী হাসিনার দাম্ভিক রাজনীতির করুণ পরিণতি দেখেও মনের জানালা খুলতে চাইছেন না। শুধু বাংলাদেশ নয়, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও তারা তাদের ভাবনা বদলাচ্ছেন না। মানুষের ইচ্ছা আর ক্ষমতাসীন অথবা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মের মধ্যে যে ফারাক, সেটাকে তারা হিসাবে নিচ্ছেন না। তারা সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল প্রভাবকেও আমলে নিচ্ছেন না।
সবার জন্যই তাতে সতর্কতার নির্দেশনা আছে। শুধু বিএনপি নয়, যারা ডাকসু, জাকসুতে জিতেছেন—ওইসব দল ও মতের প্রতিশ্রুতি, কাজ এবং আচরণের দিকেও জনগণের চোখ থাকবে। তাদের বাড়াবাড়িও মানুষ ভালোভাবে নেবে না।
ডাকসু, জাকসু নির্বাচন পুরো সিনেমার ট্রেলার মাত্র। সামনে রয়েছে রাকসু ও চাকসু। অবশ্য পুরো সিনেমা এখনও অনেক বাকি আছে। কাজেই সাধু সাবধান। মনে রাখতে হবে সেই পুরোনো প্রবাদ, ‘নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পাবে না…’।