Published : 12 Mar 2026, 12:41 PM
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পৌনে এক মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে নানা ঘটনাপ্রবাহ, আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে। ‘ভোরের সূর্য দেখে দিন কেমন যাবে’ তা বলা যায় কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হলো আজ। সংসদ শুরুর আগেই মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়ে গেছে। কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যে তাদের বক্তব্যের জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
তারপরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়-ধীরস্থিরভাবে এগিয়ে চলেছেন। ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদনের পুরনো সংস্কৃতি ভেঙে তিনি জনগণের কাতারে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চান এরকমই একটা বার্তা দিচ্ছেন। মানুষ এই আচরণ বা সংস্কৃতিকে বেশ পছন্দ করছে। বাংলাদেশের মানুষ চায় এমন নেতা যাকে সহজে কাছে পাওয়া যায়। যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে এক মাস আগে অনুমতি নিতে হয়, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা তো স্বপ্নের মতো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তারেক রহমান জনগণের কাতারেই থাকতে চান। এটা কতদিন টিকবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তিনি দীর্ঘদিন ব্রিটেনে ছিলেন। সেখানে এমপি-মন্ত্রীরা বাসে-ট্রেনে, সাইকেলে বা পায়ে হেঁটেও পার্লামেন্টে যান। বাংলাদেশে এমন দৃশ্য আমরা কল্পনাও করিনি। তিনি যদি এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তাহলে মন্দ হবে না। জনগণের খুব কাছাকাছি থাকলে সরকার পরিচালনা অনেক সহজ হয়। এতে চাটুকারিতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের প্রভাব কমবে বলে মনে করি।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছর সাধারণ মানুষ চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে। কী হচ্ছে, কী হবে এসব প্রশ্নের কোনো কূল-কিনারা ছিল না। ওই সরকারের কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ দেখা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা, শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা কোনো ক্ষেত্রেই মানুষ আশ্বস্ত হতে পারেনি। বিদায়ের সময় অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করেছে যে, তারা অনেক সংস্কার করেছে। কতটা করেছে, তার মূল্যায়ন জনগণই করবে। গত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকার দুটোই জনগণের কাছ থেকে স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে। ক্ষমতা জনগণের হাতে। গণতন্ত্রের এই মন্ত্র ভবিষ্যতে কোনো সরকার ভুলবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ভালো সূচনা করেছে। এখনো পর্যন্ত চারদিকে ইতিবাচক চিত্র দৃশ্যমান। মনে হয় এবার দেশে প্রকৃত রাজনীতির দরজা খুলবে। মানুষ রাজনীতির নির্মল সুবাতাস পাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যিকারের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে বা ছন্দপতন হয়, তাহলে জনগণ আবার পরিবর্তন চাইবে। এখন দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন।
বিএনপি পাহাড়সম সংকট নিয়ে সরকার গঠন করেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নিজস্ব রূপ ফিরিয়ে আনা—এমন অসংখ্য কাজ সামনে দুর্গম পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সংকটের মাত্রা। সেই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ মহাসংকট হয়ে আসতে যাচ্ছে।
সবকিছু একসঙ্গে বলা সম্ভব নয়। একটু নজর দিতে চাই শিল্প-বাণিজ্য-অর্থনীতির দিকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে নেতিবাচক কাজ ছিল বিভিন্ন শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেওয়া। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি এই ভয়ানক সিদ্ধান্ত না নিত, তাহলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা অনেক সহজ হতো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার অজুহাতে অসংখ্য কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। প্রায় সকল সচল শিল্পের চাকা হঠাৎ থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলাফল কী? লাখ লাখ শ্রমিক এক মুহূর্তে বেকার। তাদের পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থনীতিতে বড় ধস নেমেছে। অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রেমিট্যান্স কিছুটা রিজার্ভ ধরে রেখেছে, কিন্তু রপ্তানি আয় চরমভাবে কমেছে।
শিল্প-কারখানা কিংবা বাণিজ্যিক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা সরকারের লোক যুক্ত থাকতে পারে। তাই বলে পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কখনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। শ্রমিক-কর্মচারী, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মন্ত্রণালয় সমাধানের পথ দেখাতে পারে। উৎপাদনমুখী শিল্প বন্ধ করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে প্রায় চারশ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে। অনেক কারখানায় হামলা-লুটপাট হয়েছে। নিটওয়্যার, টেক্সটাইলসহ অন্যান্য খাতে বন্ধের সংখ্যা বিশাল। ভাবুন, কত মানুষ বেকার হয়েছে, কতজনকে নিজের সরকার মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে!
বন্ধ কারখানার মালিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ঋণ খেলাপি, দুর্নীতির অভিযোগ; সব মেনে নিলাম। কিন্তু এজন্য উৎপাদন বন্ধ করার যুক্তি কী? ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশে অর্থনীতির চাকা থামানো সুষ্ঠু কোনো ধারা নয়।
স্বাধীনতার এত বছর পরও মানুষ ভাতের অধিকারের জন্য লড়ছে। তদবির ছাড়া চাকরি মেলে না। শিক্ষাব্যবস্থা এমন হয়েছে যেন জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার জন্য কালো হাত উঠেছে। চাঁদা ছাড়া গাড়ি চলে না। কোথাও নিরাপদ নয় মানুষ। রাজনীতি মানুষের মঙ্গলের জন্য হওয়া উচিত, কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছে উল্টো। ফলে রাজনীতিতে মানুষের আস্থা তলানিতে।
বাংলাদেশ ওই অর্থে কখনো কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি। বরং অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছে। প্লেটোর ‘শিপ অব স্টেট’-এর মতো অন্ধ ও বধিরদের দাপট চলেছে। অনভিজ্ঞদের হাতে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে। সম্ভাবনার এ দেশ, এখানে রয়েছে বিপুল মানব সম্পদ। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও কম নয়। কেবল এসবের সুষ্টু ব্যবহার এবং বন্টন নিশ্চিত করতে পারলে বদলে যাবে বাংলাদেশ।
বিএনপি সরকারের দিকে পুরো জাতি তাকিয়ে। অর্থনীতির চাকা সচল করাই এ সরকারের প্রথম কাজ। বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা, শ্রমিকদের কাজে ফেরানো দরকার। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অনেক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী বন্ধ কারখানা চালু করতে এগিয়ে এসেছিল। রহস্যজনক কারণে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সুযোগ দেয়নি। বিএনপি সরকার এই বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে পারে।
অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিনিয়োগ বোর্ড যৌথভাবে কাজ করলে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে। এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সহায়তা করতে পারে। এ কাজে রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—জাতীয় স্বার্থই প্রধান।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। ব্রিটেন-ইউরোপের ব্যাংক-বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, প্রথমেই তারা রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বলে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অনেকে পিছিয়ে যায়।
এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ উৎসাহ দিতে হবে। এ বিনিয়োগ শিক্ষাখাতেও হতে পারে। অনেকে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে ক্যাম্পাস করতে চায়, কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় তা আর হয়ে ওঠে না। একবার ইউজিসির এক চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম একটা ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। তিনি এক বাক্যেই বললেন, সরকারের এমপিরা হচ্ছে প্রধান বাধা। তারা চান না বাংলাদেশে কোনো বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু করুক। কারণ দেশের অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে এমপি-মন্ত্রীরা যুক্ত রয়েছেন।
প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতায় হয়রানির শিকার হয়। এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিএনপি সরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এসব অসঙ্গতি দূর করে যাত্রা অব্যাহত রাখলে অনেক সংকট দ্রুত সমাধান হবে।
সর্বোপরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সব দলকে রাজনীতি চর্চার সুযোগ দিতে হবে। দেশবিরোধী অপশক্তিকে কঠোর আইনে দমন করতে হবে। সকলকে জাতীয় স্বার্থে এক হতে হবে। তবেই অর্থনীতি দ্রুত সচল হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।