Published : 16 May 2026, 04:24 PM
তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে বাংলাদেশে এসে যমুনায় মিলেছে। বাংলাদেশ অংশে তিস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার এবং এর অববাহিকায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বসবাস করে। একসময়ের প্রমত্তা এই নদী আজ শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ চরভূমিতে পরিণত হয়।
ভারত ১৯৮৩ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার শুরু করার পর থেকে বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। গবেষণা বলছে, ১৯৭৩-৮০ সালে তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৫,০০০ কিউসেক, যা ২০০০ সালের দিকে এসে ৫০০ কিউসেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' গ্রহণ করে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অর্থায়ন সংকট, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং পরিবেশগত প্রশ্ন বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিস্তা নদী: ঐতিহাসিক পটভূমি ও বর্তমান সংকট
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তিস্তা নদী হিমালয়ের সিকিম অংশ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০৯ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ ছিল।
১৯৮৩ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করে। এই ব্যারেজের মাধ্যমে ভারত তিস্তার মূল প্রবাহ থেকে পানি মহানন্দা নদীতে সরিয়ে নেয়, যার ফলে বাংলাদেশে প্রবাহিত পানির পরিমাণ আমূল হ্রাস পায়।
২. বর্তমান জলবায়ু ও পানিপ্রবাহ সংকট
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-মে) গড় পানিপ্রবাহ বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ২০০-৩০০ কিউসেকে নেমে আসে; অথচ একই সময়ে তিস্তা সেচ প্রকল্পের চাহিদা থাকে কমপক্ষে ৮,০০০-১০,০০০ কিউসেক। এই ঘাটতির ফলে উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার কৃষিব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরো এলাকাটি প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং তখন তামাক চাষই থাকে একমাত্র ভরসা।

অন্যদিকে বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) তিস্তায় হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ বন্যা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলনের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই চরম পরিস্থিতি আরও তীব্র হচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: কাঠামো ও লক্ষ্যমাত্রা
১. পরিকল্পনার উৎপত্তি ও বিবর্তন
তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু হলেও 'মহাপরিকল্পনা'র বর্তমান রূপটি মূলত ২০১০-এর দশকে স্পষ্ট হয়। ২০১৬ সালে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান 'পাওয়ার চায়না' এই প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করলে এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়।
২০২০ সালে চীনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার প্রস্তাব আসে। ২০২৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা বেশ অগ্রসর হয়। তবে অগাস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো ও অংশীদারত্ব পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চলছে।
২. পরিকল্পনার মূল উপাদানসমূহ
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় নিম্নলিখিত প্রধান উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
৩. প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়ন প্রস্তাব
তিস্তা মহাপরিকল্পনার মোট ব্যয় বিভিন্ন সূত্র মতে ৮,৭০০ কোটি টাকা থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। প্রাথমিক আলোচনায় চীনের কাছ থেকে প্রায় ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ 'সফট লোন' পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি: একটি অমীমাংসিত ইতিহাস
১. ২০১১ সালের চুক্তি প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতা
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশ ৩৭.৫ শতাংশ এবং ভারত ৪২.৫ শতাংশ পানি পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে চুক্তিটি ভেস্তে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের যুক্তি ছিল যে, তিস্তার পানির বড় অংশ ইতিমধ্যে তাদের রাজ্যের সেচকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাংলাদেশকে বাড়তি পানি দিতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই অবস্থান নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব ভারতের ফেডারেল সমস্যার প্রতিফলন।
২. পরবর্তী বছরগুলোতে স্থবিরতা
২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে তিস্তা চুক্তি আলোচনায় এলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১৫ সালে মোদি সরকারের ঢাকা সফর এবং ২০১৭ ও ২০২১ সালে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরেও তিস্তার বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে ছিল; কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের আগে এই চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন। এটি মূলত ভারতের ফেডারেল কাঠামোর জটিলতার ফলস্বরূপ, যেখানে পানিসম্পদ রাজ্যের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি: ভারত-চীন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে তিস্তা
১.চীনের কৌশলগত স্বার্থ
চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'পাওয়ার চায়না'র তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ চীনের 'বিআরআই' (Belt and Road Initiative)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ বিন্দু। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের প্রবেশাধিকার ও প্রভাব বিস্তারের জন্য বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্প চীনকে কৌশলগত সুবিধা দেয়।
দ্বিতীয়ত, পাওয়ার চায়নার মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে বৈশ্বিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। তিস্তা প্রকল্প তাদের জন্য ব্যবসায়িক সুযোগ ও প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্র।
তৃতীয়ত, ভারত-চীন সীমান্ত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে ভারতের 'নিকট প্রতিবেশী' বাংলাদেশে চীনের অবস্থান শক্তিশালী করা তাদের একটি ভূরাজনৈতিক পাল্টা পদক্ষেপ।
২. ভারতের উদ্বেগ ও স্বার্থ
ভারতের তিস্তা প্রকল্পে আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে 'চিকেন নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোর সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ। শিলিগুড়ি করিডোর মাত্র ২২-৩০ কিলোমিটার চওড়া একটি ভূখণ্ড, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে সংযুক্ত করে। এই করিডোরের কাছে বাংলাদেশে চীনের সামরিক বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো তৈরি হওয়া ভারতের কাছে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাই ভারত একদিকে তিস্তা চুক্তি বিষয়ে কালক্ষেপণ করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে নিজের উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চীনকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করছে। ২০২৩-২৪ সালে ভারত বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, যার একটি অংশ তিস্তার বিকল্প উন্নয়নের জন্য বলে জানা যায়।
৩. বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান

বাংলাদেশের জন্য তিস্তা ইস্যুটি একটি দ্বিধার সামনে দাঁড় করায়; ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও ভৌগোলিক নির্ভরশীলতা একদিকে, আর উন্নয়নের জন্য বিকল্প অংশীদারের প্রয়োজনীয়তা অন্যদিকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ‘তিস্তা নিয়ে আমরা কারো জন্য বসে থাকবো না’ বক্তব্যটি এই দ্বিধারই প্রকাশ। এটি মূলত ভারতের প্রতি একটি কূটনৈতিক বার্তা যে, বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার আছে এবং সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে থাকবে না।
প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল ও বিপদসমূহ
১. সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল
তিস্তা মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে যে সুফলগুলো আশা করা যায়, তা নিচে দেওয়া হলো:
২. প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি রয়েছে:
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা
১. চীনের নদী ব্যবস্থাপনা মডেল
চীন তার 'তিন গিরিখাত বাঁধ' (Three Gorges Dam)-সহ বিভিন্ন বড় নদী প্রকল্পে বিশাল সাফল্য পেয়েছে। তবে এই প্রকল্পগুলো ব্যাপক পরিবেশগত সমস্যা, স্থানচ্যুতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করেছে বলেও প্রমাণিত হয়েছে। যেমন—শুধু তিন গিরিখাত বাঁধ নির্মাণেই প্রায় ১৪ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে হয়েছে।
২. নেপাল-ভারত মহাকালী চুক্তির অভিজ্ঞতা
১৯৯৬ সালের মহাকালী চুক্তিতে নেপাল ও ভারতের মধ্যে পানিবণ্টনের সুষম কাঠামো তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অপর্যাপ্ত যন্ত্রকৌশল এই চুক্তির কার্যকারিতা সীমিত করেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি শিক্ষণীয় যে, আইনি কাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতাও জরুরি।
৩. মেকং নদী কমিশনের মডেল
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মেকং নদী ব্যবস্থাপনায় বহুপক্ষীয় কাঠামো কার্যকর হয়েছে। চীন, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের যৌথ অংশগ্রহণে পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা ও তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রে এই মডেল সফলতা দেখিয়েছে। তিস্তার ক্ষেত্রেও ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনকে (JRC) শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই ধরনের সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
সুপারিশমালা
১. স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ (১-৩ বছর)
২. মধ্যমেয়াদি সুপারিশ (৩-৭ বছর)
৩. দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ (৭+ বছর)
তিস্তা সংকটের শেষ কোথায়?

তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তার একটি পরীক্ষাস্থল। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানে এই প্রকল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টনের ন্যায্য সমাধান কূটনৈতিকভাবে আদায় করতে হবে; কারণ উজান থেকে পানির প্রবাহ না থাকলে কোনো প্রযুক্তিগত সমাধানই কার্যকর হবে না। দ্বিতীয়ত, বিদেশি অর্থায়নে যে প্রকল্পই হোক, তার শর্তাবলি অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণকে কেন্দ্রে রেখে, দেশীয় বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে।
সর্বোপরি, বিদেশি মেগা প্রকল্পনির্ভর 'বড় সমাধান' নয়; বরং ন্যায্য পানিবণ্টন, প্রকৃতিনির্ভর নদী ব্যবস্থাপনা ও দেশীয় সক্ষমতার সমন্বয়েই তিস্তার দীর্ঘমেয়াদি সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব। এ পথে বাংলাদেশকে এগোতে হবে সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে।