Published : 11 Jun 2026, 07:46 PM
আগামী অর্থবছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; যা চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের তুলনায় ৩৯৩ কোটি টাকা বেশি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাতটির উচ্চ ভর্তুকি, আমদানি নির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।
বিকালে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংকট শুরু হয়, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ভর্তুকির ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারের ‘নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে’ দায়ী করে আমির খসরু বলেন, “বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
“ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে।”
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের ওপর চেপে বসেছে।”
তার দাবি, এসব কারণে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বর্তমানে দেশের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। তবে অতীতের ‘ভুল নীতির’ কারণে এখনো নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ, অদক্ষ ও পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ বা আধুনিকায়ন, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যমান ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পর্যালোচনা।
সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানোর কাজও চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। একই সময়ে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরবরাহ এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাত নিয়ে তার ভাষ্য, “দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার কারণে খাতটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।”
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে আগামী তিন বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। একই সময়ে ৬৯টি নতুন কূপ খনন ও ৩১টি পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার করা হবে বলেও জানিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) কাঠামো সংশোধন করে নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।