Published : 12 Jun 2026, 03:08 AM
সবার জন্য সমান সুযোগ রাখার বাজেটে ব্যবসায়ীরা পেলেন অকাতরে; করছাড় বাড়ল, ব্যবসায় প্রাণ ফেরাতে প্রণোদনার আশ্বাস থাকল; তবে সর্বনাশা মূল্যস্ফীতি থেকে মুক্তির দৃশ্যমান স্বস্তির দেখা পেলেন না স্থবির আয় নিয়ে কোনোমতে জীবন পার করা সীমিত আয়ের মানুষ।
যতটা ছাড় পেলেন ধনীরা, ততটাই করের বোঝার চাপে পড়লেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের করদাতারা। দুই দশক পর দেশ পরিচালনায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম আর্থিক রূপরেখার পর যে কারণে সামনে এল পুরনো বিতর্ক কতটা মানবিক হল এ বাজেট।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেটে এমন আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিতই থাকল।
বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করার সময় এক সময়ের ব্যবসায়ী নেতা ও রাজনীতিক আমির খসরু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির আকাঙ্খা পূরণের আশাবাদী চিত্র তুলে ধরেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিনিয়োগ খরা, দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক খাত, ধীরগতির রাজস্ব আদায়, রপ্তানির নেতিবাচক ধারা ও চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা অর্থনীতিতে কীভাবে এ দুই লক্ষ্য অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পথরেখার দেখা মিলল না।
অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় রাজনৈতিক দর্শনের অনেক কিছু শুনতে সবার ভালো লাগলেও সাধারণের জীবনযাত্রায় ওঠা নাভিশ্বাস কাটানোর দেখা মিলল না সেভাবে। নতুন কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর দিশার পরিবর্তে দেখা গেল জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে উৎরে যাওয়ার এক চেষ্টা।

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিমুখে যাত্রা’ স্লোগানকে সামনে রেখে ঘোষণা করা তার বাজেটে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের সমাধানের জটিলতা কাটল না।
এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানির সংকট বেড়ে যখন দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে, তখন মূল্যস্ফীতি আটকে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি মিলল বাজেটে সেটির প্রভাব বাস্তবে কতটা পড়বে তা সময়ই দেবে। না কি বৈশ্বিক অস্থিরতার জেরে আগামী অর্থবছর দেশের পরিস্থিতি আরও টালমাটাল হয়ে পড়বে- সেই শঙ্কাও থাকল।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার কিছু আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদের অধিবেশন কক্ষে আসেন প্রথমবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আমির খসরু। দুই দশক আগে ক্ষমতায় বিএনপির শাসনামলে যিনি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার হাত ধরে ১৯ বছর আবার বাজেট দিল বিএনপি।
তার প্রস্তাব করা বাজেটের আকার বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। টাকার ওই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান।
শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের দেওয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সংশোধিত বাজেটের ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশের সমান।
ধনীদের নানাভাবে করছাড় দেওয়ার পর এক লাফে এত বড় অঙ্কের বাজেট দেওয়া বিএনপি সরকার তা কী করে বাস্তবায়ন করবে সেই উত্তর খোঁজা শুরু করেছেন নীতি বিশ্লেষকরা। তারা এটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এত খাত থেকে কর কমানো হলে প্রথমবারের মত ৯ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়ানো বিশাল এ বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি চাকুরেদের বেতনসহ কল্যাণমুখী ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে?
এর উত্তর হিসাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু কর বাড়ানো, আদায় প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিক করা, দুর্নীতি কমানো এবং কর ফাঁকি দূর করার কথা বলেছেন। তবে এগুলো খুব সহজ কাজ নয়।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অতি বেশি উচ্চাভিলাষী’ বলেই বর্ণনা করেছেন।
তার মতে, টাকা আসবে কোথা থেকে, তা-ই সবচেয়ে ‘বড় প্রশ্ন’।
অর্থনীতির বিশ্লেষক মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেখানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োজন, সেখানে বাজেটের আকার অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে তা মুদ্রানীতির লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার মাত্র তিন মাস বিশ দিন ক্ষমতায় আসার পরই এই বাজেট দিয়েছে তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বাজেট পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে এসে তিনি বলেন, ভোটারদের প্রতি তাদের বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা পূরণের চাপ রয়েছে।
তিনি বলেন, চরম দুরূহ অর্থনৈতিক অবস্থায় এই বাজেট প্রণীত হয়েছে; যেখানে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সর্বগ্রাসী সমস্যা তৈরি করছে এবং প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো (বেসরকারি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, রপ্তানি) নিম্নমুখী।
এ অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, গত ১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার মত। অথচ নতুন বাজেটে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের মধ্যে এনবিআরের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
তার মতে, এনবিআরের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ছাড়া এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায় অসম্ভব।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশে ১ কোটি ১৮ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ৭৫ হাজার ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত। তাতেই এনবিআরের সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়।
পারভেজ বলেন, সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে বেসরকারি খাত মূলধন পাবে না, যা কর্মসংস্থান ও শিল্প সম্প্রসারণকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে।
অপরদিকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ কীভাবে করবে সেই প্রশ্নেরও উত্তর নেই। আবার বড় অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নে সরকার ব্যাংকমুখী হলে ব্যাংক থেকে অর্থায়ন কীভাবে পাবেন উদ্যোক্তারা- সেটিও অমীমাংসিত। সেক্ষেত্রে শুধু করছাড়ের সুবিধায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সহজ কথা নয় বলেই বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন।

পাশাপাশি সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে বাজেট অর্থায়নের পথে হাঁটলে তা মূল্যস্ফীতি আরও উস্কে দেবে কি না সেই আলোচনাও চলছে।
বাজেট আশা দিল, দিশা দিল না
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট দিতে গিয়ে ‘টেকসই উন্নয়নের পরিক্রমায় স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তবে সেই বাজেট বাস্তবায়নের সুযোগ তার সরকার পায়নি। বাজেট বাস্তবায়ন শুরুর এক মাসের মাথায় ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
সরকার পতনের সেই আন্দোলনে সহিংসতা, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে পুলিশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। থমকে যায় ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা।
এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক দিকে দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ক্ষত সারাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো যায়নি।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারে আসা বিএনপির কাছে সাধারণের প্রত্যাশা ছিল তাদের ওপর জেঁকে বসা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে উদ্যোগ থাকবে বাজেটে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি এনে অর্থনীতিতে ছন্দ ফেরানো, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোসহ আর্থিক খাতের দুর্দশা কাটিয়ে আস্থা ফেরানো ছিল সরকারের চ্যালেঞ্জ।
বাজেটে এসব বিষয়ে মনোযোগ থাকল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হবে, এতে দেশের বাজারে অর্থ প্রবাহ বাড়বে এবং তাতে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর চাপ কিছুটা কমবে- এমন সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা দেখা গেল তার মধ্যে। এজন্য শিল্পে করছাড় দেওয়ার পদক্ষেপ দেখা গেল। তবে কর্মসংস্থানের বাড়ানোর সুস্পষ্ট তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। স্বকর্মসংস্থান বাড়ানোর স্টার্টআপ ও সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখতে তহবিল গঠনের ঘোষণা দিলেন তিনি।
তবে ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ঘাটতি যোগাতে সরকারের অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনায় বেসরকারি খাত কাঙ্খিত ঋণ পাবে কি না সেই শঙ্কা থেকেই গেল।

এছাড়া এলডিসি গ্রাজুয়েশন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে নেওয়া আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় গেল কয়েকবছর ধরেই কর ছাড় দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার চাপ ছিল।
এ নিয়ে কর ব্যয় বা ছাড় সংক্রান্ত বিধানও বদলে দেওয়া হয়; করা হয় কর ছাড় বিষয়ক প্রতিবেদনও। সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল কোন বছরে কোন খাতে কত পরিমাণ করছাড় দেওয়া হল। গত দুই বাজেটে কর ছাড়ের এসব তথ্য বাজেট বক্তৃতায় মিললেও তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা বিএনপির বাজেটে এসব পরিসংখ্যান মিলল না।
উল্টো দিকে চড়া মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে খরা, সরকারি ব্যয়ে ধীরগতি, বিদেশি ঋণে দূরাবস্থা আর রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়েই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন অর্থমন্ত্রী।
টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার কথাও বলছেন তিনি; তবে পুরনো ছকের কথাবার্তা ছাড়া বাজেট বক্তৃতায় এমনকিছু মেলেনি যার মাধ্যমে দিশা মিলবে কেমন করে ঘুরে দাঁড়াবে অর্থনীতি।
সরাসরি সেসব বার্তা না মিললেও ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসা বিএনপি যে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে হাত প্রসারিত করে রেখেছে তার ইঙ্গিত মিলেছে বাজেট বক্তৃতার শব্দে-শব্দে। এসব কতটুকু শেষতক কাগজে-কলম থেকে বেরিয়ে বাস্তবে রূপ পাবে তা বোঝা না গেলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অর্থমন্ত্রীর পদক্ষেপকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এজন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা ছাপিয়ে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো, আমানতকারীর আস্থা ফিরায়ে তারল্য সংকট কেমন করে কাটবে তার দিশা মেলেনি।
এসব ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে বর্তমান সংকট ও পুরনো পরিসংখ্যানের ফিরিস্তি মিলেছে। কিছুটা নির্বাচনি ইশতেহারের আবহের মিশেল দেখা গেছে।
অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ভালো চেহারায় না থাকলেও সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুরনো ছকেই জনতুষ্টির বিশাল বাজেট দিলেন।
মধ্যবিত্ত যতভাবে করজালে
নিত্যপণ্যের চড়া বাজারে যখন সীমিত আয়ের মানুষের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ার প্রত্যাশায় সাড়া দেননি প্রথমবার অর্থমন্ত্রী হওয়া আমির খসরু। উল্টো সঞ্চয়পত্র ও বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে যে করছাড় মেলার কথা সেটি কমিয়ে দিয়েছেন।
মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো, তরুণ ও নারীদের জন্য স্টার্টআপে নানামুখী সুবিধা ও তহবিল দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সাধুবাদ পেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমন কিছু কর্মসূচি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে থাকলেও সেগুলো পরে কর্মসংস্থান বাড়াতে খুব বেশি কাজে আসেনি।
সেক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো গেলে স্বস্তি ফিরত তাদের চোখেমুখে। তবে সেখানে ছাড় না দিয়ে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করে দেওয়া বিধানেই ভরসা রেখেছে বিএনপি সরকার।
এর ফলে এতদিন চারে লাখ টাকা আয়ে যেখানে একজন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাকে পাঁচ হাজার টাকা দিলেই হত, সেখানে দিতে হবে সাড়ে সাত হাজার টাকা।
এর সঙ্গে কর রেয়াত কমানোর মত ধারা এবারও বহাল রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থবিল ২০২৬ এ বর্তমান আয়কর আইন সংশোধনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে কর রেয়াতের বিধানে।
এক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম হচ্ছে, করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ বা অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা ১০ লাখ টাকা- যেটি কম হবে সেটি রেয়াত বা ছাড় পাবেন করদাতা। নতুন নিয়মে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ এর জায়গায় হবে ১০ শতাংশ এবং ১০ লাখ টাকার জায়গায় হবে সাড়ে সাত লাখ।
অর্থ্যাৎ সীমিত আয়ের মানুষ যাদের আয় কম এবং বিনিয়োগ কম তারা ১৫ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ হওয়ায় বড়ধরনের করছাড় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়বেন। একদিকে করহার বেশি অন্যদিকে ছাড় কম- এমন দ্বিমুখী চাপে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের মধ্যে সঞ্চয়পত্রও রয়েছে।
পৈত্রিক সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করার ক্ষেত্রেও রয়েছে করজালে আটকে যাওয়ার শঙ্কা। আর্থিক সংকটে পড়ে থাকা জমিতে যে ডেভলপার দিয়ে ফ্ল্যাট বা স্থায়ী ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন দেখবেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, সেখানেও রয়েছে অর্থ প্রাপ্তি না হওয়ার পরও সরকারকে দিতে হবে কর। এক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফা হিসেবে দিতে হবে ১৫ শতাংশ কর।
অর্থ্যাৎ পুরো বাড়ির ছয়টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পর কোনো ব্যক্তি যদি অর্ধেক বা তিনটা ফ্ল্যাটের মালিক হন। তখন এই তিনটার বাইরেও ওই ডেভলপার যে তিনটা ফ্ল্যাট চুক্তির আওতায় পেল সেটিকে জমির মালিকের মুনাফা ধরে ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে যদিও সেসব ফ্ল্যাট তিনি বিক্রি করেননি এবং কোনো অর্থ তার মেলেনি।

অপরদিকে রড ও ইটের মত নির্মাণ সামগ্রীতে করের চাপ তৈরি করায় সেগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জমির মিউটেশন বা নামজারি করতেও দেখাতে হবে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র; একই বিধান প্রযোজ্য হবে পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও। প্রান্তিক মানুষ যারা কর-ভ্যাট এসবের হিসাবনিকাশ বোঝেন না তাদের এ নিয়ে বিপাকে পড়ার শঙ্কা থাকছে।
সাধারণ মানুষ আরও বিপাকে পড়তে পারে সন্তানের রেমিট্যান্স পাওয়া বা মাসিক খরচা পাওয়ার জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে; কারণ এক্ষেত্রেও তাকে দেখতে হবে করদাতা হিসাবে স্বনাক্তের সনদ। এতে বড় অংশের প্রান্তিক মানুষ ব্যাংকের ঝামেলায় ক্ষুদ্র ঋণ বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা থাকছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) দেখালেই কেবল মিলবে হিসাব খোলার সুযোগ। এটি করলেই তিনি পড়ে যাবেন ব্যবসায়িক রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতায়।
এছাড়াও খুচরা দোকানিদের থেকে মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট নিতে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট নেওয়ার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত অর্থবিলে। তবে তার পরিমাণ কী হবে তা এখনও সুস্পষ্ট হয়নি।
খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য সরবরাহে প্রতি হাজারে দুই টাকা কর রাখার বিধানে সরাসরি প্রভাব ফেলবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে; প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।
কালো টাকা সাদার সুযোগ
আগের রাজনৈতিক সরকারের মতোই প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখল প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন সরকার।
একই সঙ্গে এ টাকার উৎস নিয়ে যাতে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে সে বিধানও রাখা হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে এ ধরনের সুযোগ না রাখার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবিলে এ সংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে।
এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতির বিশ্লেষকদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে অর্থমন্ত্রীকে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব অর্থনৈতিক দূর্বৃত্তায়নকে নতুন করে উৎসাহ যোগাবে।

যা কিছু ভালো
১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে ‘ধাপে ধাপে’ নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২০ দিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন।
অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় নতুন বেতনকাঠামোর কিছু অংশ বাস্তবায়নের খবরে সরকারি চাকুরেদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ হচ্ছে।
এর বাইরে বাজেটে চলতি অর্থবছরে আয়ের ওপর আয়মুক্ত না বাড়লেও পাঁচ বছরের জন্য ‘প্রগতিশীল’ করকাঠামো ঘোষণা করায় করপোরেট করের ক্ষেত্রে স্বস্তি ফেরার কথা বলেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। বারবার আইন পরিবর্তনে বিনিয়োগে যে বাধা ছিল তা অনেকটাই কেটে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছে তারা।
এছাড়াও পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার আইপিওর মাধ্যমে হস্তান্তর হয়নি–এমন তালিকাভুক্ত কোম্পানির বেলায় কর হারে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব কোম্পানি আয়বর্ষে সব প্রকার আয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনে আড়াই শতাংশ ছাড় পাবে। বর্তমানে এসব কোম্পানির জন্য করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ; শর্ত পূরণ করলে এই করহার হবে ২৫ শতাংশ।
এর বাইরে স্বস্তির ঘোষণার মধ্যে উৎসে কর কেটে রাখার পর এর বেশি কর না এলে সেটিকে ন্যূনতম কর হিসেবে দেখানোর যে বিধান ছিল তা বাতিল করা হয়েছে। এটিকে দেখানো হবে অগ্রিম কর হিসেবে।
এতে ব্যাংক ও সঞ্চয়ের সুদ প্রাপ্তি, বেসরকারি চাকরির বেতন বা গাড়ি কেনার সময়সহ নানান কারণে যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়, আগামী অর্থবছর থেকে তার বাড়তি অংশ ফেরত পাওয়ার বিধান করল সরকার।
তৈরি পোশাক শিল্পের ন্যায় শতভাগ রপ্তানিমুখী লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং টাওয়েল, লিলেন ও হোমটেক্সটাইল শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেল বন্ডের মেয়াদ এক বছরের স্থলে তিন বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুদের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব মিলেছে।
পাশাপাশি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের মেয়াদোত্তীর্ণের অন্যূন ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি গ্রহণের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টার আগেই যেন পাওয়া যায় সেই বিধান করায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাদেশ পাঠানোর সময় ও বাধা খানিকটা দূর হওয়ার সুযোগ থাকবে।
শুধু ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করার আইনি বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কতিপয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়। এর মাধ্যমে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে বলা হয় বাজেট বক্তৃতায়।
দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধকল্পে ‘সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স’ আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
এছাড়া পরিবেশগত বিবেচনায় সোলার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি খাত ও সার-কীটনাশকে করছাড় মিলেছে।
কিছু ক্ষেত্রে আমদানি পণ্যে কর বাড়িয়ে দেশিয় শিল্পের প্রতিরক্ষণ করা হয়েছে।
মদ, সিগারেট, নিকোটিন পাউচের মতো জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি পণ্যের বাড়তি ভ্যাট ও শুল্ক বসানো হয়েছে। আর কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ আর ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির মাধ্যমে তাদের নানামুখি করছাড় প্রণোদনার অংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক কর্মসূচির বলয় বাড়ল
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার। এজন্য বাজেটে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তারা মাসে আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
বাজেটে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে প্রায় ১৯ লাখ মা ও শিশুকেও।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ফান্ডের আওতায় অবসর গ্রহণকালে মোট অর্থের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুইটি বা আনুতোষিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এ ব্যয়কেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রাখার কথা বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
এ কর্মসূচির আওতায় বাড়ানো হয়েছে প্রতিবন্ধী ভাতা। কিছু সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এর বাইরে তেমন কোনো নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আগের ছকেই এ কর্মসূচির বরাদ্দ রেখে কতটা প্রান্তিক মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যাবে তা নিয়ে শঙ্কা এসেছে অর্থনীতির বিশ্লেষকদের তরফে।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে গোঁজামিল
বাজেটের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যয় মেটাতে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করার আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। সে হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
এ ঘাটতি মেটাতে তিনি বিদেশ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ করবেন, যা জিডিপির ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটের এই সময়ে মোট ঘাটতির ৬৪ দশমিক ১৩ শতাংশই বিদেশি ঋণ দিয়ে পূরণের আশা করছে নতুন সরকার।
এর মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে আগে নেওয়া ঋণের কিস্তি আর সুদ পরিশোধে। তাতে নিট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত নিট বিদেশি ঋণের চেয়ে ৮৯.৪ শতাংশ বেশি।

এত বিশাল করছাড়ের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা পূরণ না হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার দুই জায়গায় দুই লক্ষ্যে।
অর্থনীতির হালচাল বোঝাতে যেয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমানে কর-জিডিপির অনুপাত ৬.৮ শতাংশ, যা আমরা আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে এবং রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত বর্তমান ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করব।”
অর্থাৎ সাড়ে ৯ শতাংশে কর-জিডিপি উন্নীত করতে সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পাঁচ অর্থবছরের। অথচ রাজস্ব ব্যয়ের প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করছি।”
যেখানে যে শতাংশে উন্নীত করার চিন্তা বিএনপির আগামী পাঁচবছর নানাবিধ সুবিধা ও আইনি কাঠামোর বেড়াজাল ভেঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করে তারপর, সেখানে একবছরের মধ্যেই শতাংশের নিরিখে এমন চাওয়া কেবল পুরনো ছকে সংখ্যা বসিয়ে দেওয়ার প্রবণতাই প্রমাণ করে।
রাজস্ব আদায়ের এত বিশাল লক্ষ্য পূরণ নিয়ে সংশয় ও শঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফেও।
‘ইতিবাচক’ দেখছে ব্যবসায়ী নেতারা
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ব্যবসাবান্ধব’ হিসেবে বর্ণনা করে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
তবে রাজস্ব লক্ষ্য পূরণ করা ‘বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় চ্যালেঞ্জিং’ বলে মনে করছে সংগঠনটি।
তবে করপোরেট কর না কমানো নিয়ে আশাহত হওয়ার কথা বলেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বেশ কয়েকটি।
সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, করপোরেট কর কমানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী ‘রোডম্যাপ’ না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ টানার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানির ই-ভ্যাট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি আশঙ্কাও করেছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী নেতারা। উদ্বেগ এসেছে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা ও ব্যবসা সহজীকরণকে গুরুত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
অপরদিকে বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই)। তবে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার কয়েকটি সংস্কারমূলক উদ্যোগকে স্বাগতও জানিয়েছে সংগঠনটি।

‘উচ্চাভিলাষী’
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ‘আশাবাদ’ দেখলেও উচ্চাভিলাষী এ বাজেট বাস্তবায়ন ‘অনেক কঠিন’ বলে মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতারা।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সন্ধ্যায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। আর দলটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে শুক্রবার। সেদিন বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি রেখেছে আরও কয়েকটি দল।
এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ ফেসইবুক পোস্টে বলেছেন, “এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট। সরকার প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা বললেও বাস্তবে ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে লাখ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।”
প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, বলে তুলে ধরেছে বামপন্থি দলগুলোর জোট-গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
বিবৃতিতে জোটের নেতারা বলেন, “সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কালো টাকা সাদা করার পুরোনো প্রক্রিয়া এবারও বহাল রাখা হয়েছে । রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাতবায়ন হবে কীভাবে? চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বাজেটকে ‘গণবিরোধী চরিত্রের’ বর্ণনা হিসেবে তুলে ধরেছে। বিবৃতিতে দলটি বলেছে, “প্রস্তাবিত বাজেট অনেক বড় অঙ্কের কিন্তু একইসাথে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘অসার’ বা ‘ফাঁকা’ বলে প্রতিভাত হচ্ছে।
“মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো আশাবাদ প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। এই বাজেট বৈষম্য বৃদ্ধি করবে।”
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘কথার ফুলঝুড়ি, রাজনৈতিক চমকবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়’ বলে মনে করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। এ বাজেট অবাস্তব ও কোনোভাবেই অর্জনযোগ্য নয় বলে মনে করছে দলটি।
নতুন বাজেট সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, নতুন অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাবে ‘সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণে আধাআধি প্রচেষ্টা' রয়েছে।
“বিশাল ঘাটতি পূরণ আর রাজস্ব সংগ্রহই হবে বাজেট বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি রোধ করতে না পারলে প্রবৃদ্ধির কোনো খতিয়ান কাজে আসবে না।”
আরো পড়ুন
স্থিতিশীলতায় ফেরার বাজেটে ব্যয় বাড়ল ১৯%
বিশাল বাজেটে ৬.৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা
বাজেট বাস্তবায়ন কীভাবে, 'স্পষ্ট ঘোষণা নেই': সিপিডি
শিক্ষার বাজেটে 'আশার সঞ্চারণ', যেতে হবে আরো পথ
সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ছে ১৩%