Published : 12 Jun 2026, 12:45 AM
বিএনপির নতুন সরকারের বাজেটকে ‘ইতিবাচক’ বললেও বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তার ‘স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না থাকার’ কথা বলেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণসহ যেসব লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে, সেগুলো আরেকটু বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করে তারা।
বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় বাজেট দিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ‘বড় ঘাটতি’ ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির নানামুখি সংকটের মধ্যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে সরকার।
সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পর এদিন রাতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, “লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবসম্মত না হয়, তখন বাস্তবায়নও সম্ভব হয় না। যখনই বাস্তবায়ন করা যায় না, তখনই বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। তখন বাজেটে কোথা থেকে আয় আসবে, কোথায় ব্যয় হবে, এমন অনেক শৃঙ্খলার অভাব দেখা দেয়।”
বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে যে বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তাতে শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, স্থিতিশীলতা, আস্থা ও সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, “বর্তমানে কঠিন বিষয় হল একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে পুনুরুজ্জীবিত করা। সবচেয়ে আগে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপটা কমাতে হবে।”
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে রাখার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
“চলতি অর্থবছরে যে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে, সেটির সঙ্গে আরো প্রায় দেড় শতাংশ বৃদ্ধি; সাড়ে ৫ শতাংশ বা ৬ শতাংশও করতে চাই, সেক্ষেত্রেও কিছু পূর্ব শর্ত রয়েছে। সেগুলো হল- বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা, শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি গতিশীল করা।
“কেননা বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে অবস্থায় রয়েছে, কিংবা আর্থিক খাতে যে দুর্বলতা রয়েছে এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে আমাদের এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।”
বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর, আগামী অর্থবছরে তা নামিয়ে আনা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি বর্তমানের প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ নামিয়ে আনতে হলে সেটারও কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে।
“মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আমাদের টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার হার স্থিতিশীল করা, খাদ্য সরবরাহ ও কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতিকে যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে। ব্যয়ের বিপরীতে যদি আয় বাড়াতে পারি, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি এবং সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।”
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে আমাদের রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা রয়েছে। প্রতিবছরই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা অর্জন করতে পারে না।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রাকে বিরাট ‘উল্লম্ফন’ বলে বর্ণনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, “রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যদি অর্জন না হয়, সরকারকে ব্যাংক থেকে ধার নিতে হবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।”
বাজেটে বিএপির নির্বাচনি ইশতেহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে মন্তব্য করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ নির্ভর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক দিক থেকেই নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারে যেই বিষয়গুলো ছিল, সেই বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
“অর্থনীতির গণতান্ত্রিকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসরকারি খাত নির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে করা হবে, তার কোনো ঘোষণা নেই বাজেটে।”