Published : 31 May 2026, 02:36 PM
গতকাল দেশজুড়ে ছিল অন্য এক আলোচনা। কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসকের দাবি, রাজস্ব তহবিল থেকে এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১৫ কোটি এবং হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। এর পরই এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ তার ফেইসবুক পোস্টে কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব থেকে ১০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া নিয়ে প্রশাসকের বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। অভিযোগটি সামনে আসার পর মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তর্ক, বিতর্ক, সমর্থন ও সমালোচনার ঝড়। রাজনৈতিক কর্মী, বিশ্লেষক, ইউটিউবার, ফেইসবুক বিশেষজ্ঞ—সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই বিষয়।
কিন্তু বাংলাদেশের লাখো ফুটবলপ্রেমীর কাছে গতকালের সবচেয়ে বড় খবর ছিল অন্য কিছু।
কয়েক ঘণ্টার জন্য রাজনীতি পেছনে চলে গিয়েছিল। ফেইসবুকের বাকযুদ্ধ, টকশোর উত্তাপ, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ—সবকিছু যেন সাময়িক বিরতিতে গিয়েছিল। মানুষের চোখ তখন ইউরোপের আকাশে। কারণ সেটি ছিল শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; ছিল বহু বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য স্মৃতি, অগণিত স্বপ্ন, অজস্র হতাশা এবং অবিশ্বাস্য এক আশার গল্পের পরিণতি দেখার রাত।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্সেনাল ও প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। দুই ভিন্ন ইতিহাস, দুই ভিন্ন যাত্রাপথ, দুই ভিন্ন দর্শনের ক্লাব। একদিকে ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা পুনরুদ্ধার করে নতুন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত আর্সেনাল। অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যকে স্থায়ী রূপ দিতে চাওয়া বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি।
কোটি কোটি দর্শকের মতো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও জানতেন, এমন রাত বারবার আসে না। শেষ পর্যন্ত ট্রফি উঠেছে পিএসজির হাতে। টাইব্রেকারের নির্মম নাটকে তারা শিরোপা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর আর্সেনাল? তারা আবারও ইউরোপের সর্বোচ্চ শিখরের খুব কাছে গিয়ে থেমে গেছে।
তবু অদ্ভুতভাবে, এই পরাজয়ের রাতেও আর্সেনালের জন্য ভালোবাসা কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। কারণ ফুটবলে সব গল্প ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। কিছু গল্প থাকে যাত্রার, কিছু গল্প থাকে বিশ্বাসের, কিছু গল্প থাকে এমন এক সম্পর্কের, যার সঙ্গে যুক্তি দিয়ে হিসাব মেলানো যায় না।
বাংলাদেশে বসে এই ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল বিশেষ। গভীর রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। রাস্তাঘাট ফাঁকা। অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে। অথচ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা হাজারো বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীর হৃদস্পন্দন তখন একই ছন্দে চলছে। ইউরোপের কোনো স্টেডিয়ামে যা ঘটছে, তার প্রতিটি মুহূর্ত যেন ঢাকার কোনো অ্যাপার্টমেন্টে, রাজশাহীর কোনো বাড়িতে, বরিশালের কোনো চায়ের দোকানে কিংবা গ্রামের কোনো উঠোনে বসে অনুভব করা যাচ্ছে। এটাই ফুটবলের জাদু।
আমাদের প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমের গল্পও একটু অন্য রকম। আমরা বড় হয়েছি আবাহনী-মোহামেডান, ব্রাদার্স-মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের গল্প শুনে। ফুটবল তখন শুধু একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল সামাজিক সম্পর্কের অংশ, পাড়ার পরিচয়, বন্ধুত্বের বন্ধন এবং বিকেলের আনন্দ। স্কুল ছুটির পর মাঠে ছুটে যাওয়া, বর্ষার কাদামাখা জমিতে খেলা, নারকেলের পাতা দিয়ে গোলপোস্ট বানানো কিংবা বিকেলের শেষ আলো পর্যন্ত বলের পেছনে ছুটে চলা—এসবই ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার অংশ।
বিশ্বকাপ এলেই পরিস্থিতি অন্য মাত্রা পেত। তখন সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে বসে রাত জাগা ছিল এক ধরনের উৎসব। লোডশেডিং ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেটিও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে হার মানাতে পারেনি। ব্যাটারি ভাড়া করে, প্রতিবেশীদের ডেকে, একসঙ্গে বসে খেলা দেখার যে সংস্কৃতি ছিল, সেটি আজকের যুগে প্রায় হারিয়ে গেছে। সেই সময় ফুটবল ছিল এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে ঝগড়া হতো, ইতালি-জার্মানি নিয়ে তর্ক হতো, কিন্তু খেলা শেষে সবাই একই চায়ের দোকানে বসে গল্প করত।
সেই সময় ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল ছিল অনেকটাই দূরের বিষয়। বিবিসির রাতের বুলেটিনে কিংবা পত্রিকার ছোট্ট কলামে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, আর্সেনাল, জুভেন্টাস কিংবা এসি মিলানের নাম চোখে পড়ত। কিন্তু সেগুলো ছিল যেন অন্য এক পৃথিবীর গল্প। তারপর এলো স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগ।
স্টার স্পোর্টস, ইএসপিএন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম আমাদের সামনে এক নতুন ফুটবল মহাবিশ্ব খুলে দেয়। আমরা প্রথমবারের মতো নিয়মিত দেখতে শুরু করি ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর খেলা। সেখানেই জন্ম নেয় নতুন ভালোবাসা।
অনেকের মতো আমরাও তখন আর্সেনালের প্রেমে পড়ি। আর্সেন ওয়েঙ্গারের দল ছিল ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতীক। থিয়েরি অঁরি যখন বল নিয়ে ছুটতেন, মনে হতো তিনি দৌড়াচ্ছেন না, ভেসে যাচ্ছেন। ডেনিস বার্গক্যাম্পের প্রথম স্পর্শ, প্যাট্রিক ভিয়েরার নেতৃত্ব, রবার্ট পিরেসের নৈপুণ্য—সব মিলিয়ে আর্সেনাল ছিল শিল্প আর প্রতিযোগিতার এক অনন্য মিশ্রণ।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, আর্সেনালের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল তাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে। সাফল্যের দিনে সমর্থক পাওয়া সহজ। কঠিন সময়ে পাশে থাকা কঠিন। ২০০৪ সালের অবিশ্বাস্য ‘ইনভিন্সিবলস’ মৌসুমের পর আর্সেনাল দীর্ঘ এক অপেক্ষার মধ্যে ঢুকে পড়ে। নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বিদায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমবর্ধমান শক্তি—সব মিলিয়ে ক্লাবটি এক কঠিন সময় পার করে।
প্রতিটি মৌসুমে মনে হতো, এবার হয়তো কিছু হবে। তারপর আবার কিছু না কিছু ঘটত। কখনও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সামনে এসে দাঁড়াত। কখনও চেলসি। কখনও পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি। কখনও ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুল।
স্বপ্ন বারবার ভেঙেছে। কিন্তু সমর্থকেরা দল ছাড়েননি। কারণ মানুষ সবসময় সাফল্যের প্রেমে পড়ে না। অনেক সময় মানুষ সংগ্রামের প্রেমে পড়ে। একটি দলকে ভালোবাসা মানে শুধু ট্রফি হাতে ছবি তোলা নয়। এর মানে ব্যর্থতার দিনেও পাশে থাকা। হতাশার মধ্যেও বিশ্বাস রাখা। চারপাশের উপহাস সহ্য করেও নিজের আবেগকে ধরে রাখা।
মিকেল আরতেতার আর্সেনাল সেই বিশ্বাসকে নতুন জীবন দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও যে দলটিকে অনেকে দিকহারা ভাবতেন, আজ তারা আবার ইউরোপের সেরাদের কাতারে। বুকায়ো সাকা, মার্টিন ওডেগার্ড, ডেকলান রাইস, উইলিয়াম সালিবা, গ্যাব্রিয়েল এবং ডেভিড রায়াদের নিয়ে গড়ে ওঠা দলটি শুধু প্রতিভাবান নয়; তারা চরিত্রবানও।
তারা শিখিয়েছে, পুনর্গঠন সম্ভব। তারা শিখিয়েছে, ধৈর্য ফল দেয়। তারা শিখিয়েছে, দীর্ঘ পথ ঘুরেও গন্তব্যের কাছে ফেরা যায়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি এবার তাদের হাতে ওঠেনি। কিন্তু সেটি পুরো গল্প নয়। কারণ খেলাধুলার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখায়।
জীবনেও তো এমন হয়। আমরা অনেক সময় লক্ষ্যপূরণের খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হই। অনেক বছরের পরিশ্রম একটি মুহূর্তের ভুলে মাটি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাতে কি পুরো যাত্রা অর্থহীন হয়ে যায়? না। বরং অনেক সময় যাত্রাটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান।
আর্সেনালের গল্পও তাই। এটি শুধু একটি ক্লাবের গল্প নয়। এটি অপেক্ষার গল্প। এটি ধৈর্যের গল্প। এটি ব্যর্থতার মধ্যেও আশা ধরে রাখার গল্প। একজন সাধারণ দর্শক যখন আর্সেনালের খেলা দেখতে বসে, সে একা বসে থাকে না। তার পাশে থাকে ইতিহাস, থাকে লাখো ভক্তের অশ্রু, থাকে আরতেতার সেই কণ্ঠ, থাকে সাকার হাসি। সেটাই মূল প্রাপ্তি, ট্রফি নয়।
আজকের পৃথিবীতে সবাই দ্রুত সাফল্য চায়। সবাই শর্টকাট খোঁজে। সবাই তাত্ক্ষণিক ফলাফল দেখতে চায়। চাকরি হোক, ব্যবসা হোক, সম্পর্ক হোক—সবেতেই এখন তড়িঘড়ি। ধৈর্য ধরা প্রায় অসম্ভব মনে হয়। সেই পৃথিবীতে আর্সেনাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় অর্জনের জন্য কখনও কখনও দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। কখনও সফল হওয়া যায়, কখনও যায় না। কিন্তু বিশ্বাস হারালে কিছুই অর্জন করা যায় না। আর্সেনাল সমর্থক হওয়া মানে এই শিক্ষাটি আত্মস্থ করে নেওয়া।
গত রাতের ফাইনাল শেষ হয়েছে। আলো নিভেছে। ট্রফি নতুন ঠিকানা পেয়েছে। পিএসজি উদযাপন করছে। আর্সেনাল সমর্থকেরা হতাশ। তবুও কোথাও যেন এক ধরনের প্রশান্তি আছে। কারণ এই দলটি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আর ফুটবলে, এমনকি জীবনেও, স্বপ্ন দেখতে পারাটা অনেক সময় ট্রফি জেতার চেয়েও বড় অর্জন। এই স্বপ্নই মানুষকে ভোরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই স্বপ্নই ঘুম কেড়ে নেয় রাতে, আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায় ভোরে।