Published : 26 Nov 2025, 08:38 PM
বন্দর হলো একটা দেশের প্রাণভোমরা। ১৮৫৩ সালে ভারতবর্ষের দুটি প্রাণভোমরা অর্থাৎ শুল্ক বন্দরের একটি ছিল চট্টগ্রাম। পরবর্তীকালে, ১৯২৮ সালে, ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতবর্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে ঘোষণা দেয়। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দর। সেই সময় আমাদেরই মতো সদ্য স্বাধীন হওয়া ভিয়েতনামের সমুদ্র বন্দরের সুযোগ-সুবিধা, সক্ষমতা এবং কর্ম-সম্পাদনের পরিমাণ ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের সমান। অর্ধশতাব্দী পরে, ২০২৫ সালে, চট্টগ্রাম বন্দর যখন বছরে ৩.৩ মিলিয়ন টিইইউস (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভেলেন্ট ইউনিট অর্থাৎ ২০ ফুট সমমানের কন্টেইনার) হ্যান্ডলিং করছে, ভিয়েতনামের সিএমটিভি বন্দর হ্যান্ডল করছে ২০.৫ মিলিয়ন টিইইউস। তার মানে ওরা এই ৫০ বছরে আমাদের চেয়ে সোয়া ছয় গুণ বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই বহুগুণ সক্ষমতা অর্জনের কারণ– সেই দেশ আমদানি রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত সহযোগিতায় আমাদের চেয়ে মনোযোগী, আমাদের চেয়ে দূরদর্শী, আধুনিকমনস্ক ও ক্রিয়াশীল।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা (ডিপ সি পোর্ট ফ্যাসিলিটি) গড়ে তুলতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিইনি, সমুদ্রতীর বা মোহনায়ও পর্যাপ্ত টার্মিনাল গড়ে তুলিনি এবং বিদ্যমানগুলোর যথার্থ আধুনিকায়ন করিনি। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সক্ষমতা বাড়িয়ে ভিয়েতনামের সিএমটিভি বন্দর একটা ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে জাপান, কোরিয়া, আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্ট ইত্যাদি দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল সুবিধা নিশ্চিত করেছে; সময় এবং অর্থের অপচয় রোধ করে ভিয়েতনামের আন্তর্জাতিক ব্যবসাগুলোর জন্য অধিকতর অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করছে। সেই তুলনায় চট্টগ্রাম এখনো যন্ত্রপাতি, কলাকৌশল, প্রযুক্তি, পরিধি সকল বিবেচনায় পিছিয়ে থেকে এদেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীদের সময় এবং অর্থের ব্যয় বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে বা কঠিনতর প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মালামাল সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে যেতেও পারে না আসতেও পারে না। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে মুখাপেক্ষী হতে হয় নিকটবর্তী সুবিধাজনক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাঙ, শ্রীলঙ্কার কলোম্বো বন্দরের। ফিডার ভেসেলে (সমুদ্রগামী জাহাজে) করে এদেশের কন্টেইনার একবার যায় এইসব ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে, তারপর সেখান থেকে মাদার ভেসেলে (গভীর সমুদ্রগামী জাহাজে) করে যায় যে দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে সেই দেশে। একইভাবে আমদানি পণ্যের কন্টেইনারও আসে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হয়ে জাহাজ পাল্টে। এতে ব্যয় বাড়ে, যাতায়াত এবং জাহাজ বদলের জন্য বিরতিতে সময় ক্ষেপনও বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এদেশের পণ্য। এমন বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দর যখন বৈশ্বিক বিবেচনায় ৩৩০ ক্রমের পরে অবস্থান করছে দক্ষতা ও সক্ষমতার নিরিখে সেখানে ৫ দশক আগে একই মানে থাকা ভিয়েতনামের বন্দরটি অর্জন করেছে বিশ্বের ১১তম দক্ষ বন্দরের স্বীকৃতি ও সম্মান।
দক্ষতর, সাশ্রয়ী, দ্রুততর এবং অধিক সক্ষমতায় বৃহত্তর একটা বন্দর হিসেবে সেবা নিশ্চিত করতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর যেখানে নাব্য গভীরতা এবং জোয়ার-ভাটার কারণে সীমিত সক্ষমতার আবর্তে আবদ্ধ, বাধ্য হয়ে প্রতিদিনই দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাজ বন্ধ রাখতে হয়; তাই চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনটা আরও বেশি। এই বাস্তবতার নিরিখে এবং বন্দর সেবা পরিধির বৃদ্ধি ঘটাতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত এক দশক আগে থেকে টেবিল ঘুরে ঘুরে কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় ছিল। প্রায় এক দশক ধরে আলাপ আর সিদ্ধান্তের জেরেই গত ১৭ নভেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত দুটি পৃথক সভার একটিতে চট্টগ্রামের দ্বীপ ভূখণ্ড লালদিয়ায় কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ (৩ বছর সময়কালের মধ্যে) এবং এরপর ৩০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য শর্তে পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেওয়ার চুক্তি হয়েছে ডেনমার্কের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে। দ্বিতীয় সভাটিতে পানগাঁও ইনল্যান্ড কন্টেইনার টার্মিনালের (পিআইসিটি) মানোন্নয়ন এবং ২২ বছর সময়কাল পরিচালনার জন্য নিয়োগ চুক্তি হয়েছে সুইজারল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত মেডিটারেনিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ-এর সঙ্গে।
লালদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে এপিএম টার্মিনালস ৫৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সাইনিং মানি হিসেবে সরকারকে তারা দিচ্ছে ২৫০ কোটি টাকা। তাদের অর্থায়নে বিশ্বমানের এই বন্দর নির্মিত হলে নাব্য সুবিধার কল্যাণে এখানে গভীর সমুদ্রগামী জাহাজগুলোও ভিড়তে পারবে। চট্টগ্রামের সব আমদানি-রপ্তানি কন্টেইনারকে ফিডার ভেসেলে করে আর যেতে হবে না সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনো দেশের ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে। ফলত, সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবেও বন্দরটির বিস্তার ঘটবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এদেশের আমদানি-রপ্তানি খাত এগোবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়।
দ্বিতীয় চুক্তি পানগাঁও ইনল্যান্ড কন্টেইনার টার্মিনাল (পিআইসিটি) সম্পন্ন হওয়ার ফলে ২০১৩ সালে ১৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বার্ষিক ১,১৬,০০০ টিইইউস সক্ষমতা নিয়ে সাশ্রয়ী উপায়ে ঢাকা ও নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত দেশের সর্বাধিক আমদানি-রপ্তানি সেবাগ্রহীতাদের দ্রুততর সময়ে কন্টেইনার আনা-নেওয়ার সেবা দেওয়ার প্রকল্পটি ১,৬০,০০০ টিইইউস সক্ষমতার লক্ষ্যে উন্নীত করে নেবে ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মেডলগ। এজন্য ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে ৪০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪৯০ কোটি টাকা। সাইনিং মানি হিসেবে সরকারকে তারা দিচ্ছে ১৮ কোটি টাকা।
লালদিয়ার অপারেটর এবং পিআইসিটি অপারেটর উভয় প্রতিষ্ঠানই ২৪/৭ (সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা) টার্মিনালের কার্যক্রম চালু রাখবে। গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা থাকবে না এখানে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো। ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠান দুটোই অভ্যন্তরীণ নৌপথে দ্রুত কন্টেইনার স্থানান্তরের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ। তাই পরিকল্পনা ও পদ্ধতিগতভাবে দুটো ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত সাফল্যের হাতছানি দিচ্ছে।
এখন কথা হচ্ছে যে, সক্ষমতার সমান্তরালে কন্টেইনার ট্রাফিক (আমদানি-রপ্তানির জন্য কন্টেইনারের আসা-যাওয়া) নিরবচ্ছিন্নভাবে হবে কিনা! লালদিয়ায় যতটা সহজে আশাবাদী হওয়া যায় পানগাঁওয়ের ব্যাপারে অতটা সহজ সাদামাটা নয় ব্যাপারটা। নাব্যসংকট নদীপথের জায়গায় জায়গায় যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখে তা দূর করতে ড্রেজিং প্রয়োজন। দিন-রাত লাগাতার সেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ এবং যন্ত্রপাতি-উপকরণ ঘাটতি আছে, অবশ্য ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের অর্থায়নে এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে দেবে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সঙ্গে লালদিয়ার মতো একই সেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইজারাপ্রাপ্ত মেডলগকে সামাল দিতে পারতে হবে।
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, সার্বিকভাবে সকল বিবেচনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা প্রদানের সিদ্ধান্তটি যদি কৌশলগতভাবে ইতিবাচক হয় তাহলে এটা নিয়ে এত হৈচৈ কেন হচ্ছে? এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে আমাদেরকে আরও কিছু তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে হবে।
অংশীজনদের প্রথম অসন্তোষ এই ইজারা প্রদানের তড়িঘড়ি উদ্যোগকে ঘিরে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করবার ব্যবস্থা নেবেন এবং সংসদের অনুমোদন নেবেন। তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এরকম কোনো চুক্তি কেবল সংসদের গোপন অধিবেশনে পেশ করা হবে। সংবিধানের এই ধারার নির্দেশনা এই দুই ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করা হয়নি। সেক্ষেত্রে আরও প্রশ্ন উঠছে যে, এমন কোনো চুক্তি করার এখতিয়ার স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আছে কি না? পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আসলে পরে এই চুক্তির নিয়তি কি কোনো প্রকার জটিলতার মুখোমুখি হবে কি না?
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দ্বিতীয় আপত্তি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা না দেওয়া নিয়ে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা না দেওয়ায় কি কি সমস্যা হতে পারে বা হয়েছে সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের চারপাশে নিকটবর্তী বিভিন্ন বন্দরের ইজারা চুক্তির দর তুলনা করলে বুঝতে পারা যাবে প্রশ্নের হেতু। প্রতিবেশী দেশ ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালের ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে আদানি গ্রুপ দর দিয়েছিল ২৯ শতাংশ লভ্যাংশ সরকারকে দেওয়ার। বিপরীতে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান পিএসএ দর দেয় ৩৫.৭৯ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার। স্বাভাবিকভাবেই পিএসএ বন্দরটির ইজারা পায়। এদিকে আমাদের দেশে ইজারা দেওয়ার আগে সম্প্রতি অকস্মাৎ বন্দর সেবার বিভিন্ন খাতে ব্যপক হারে মাশুল বাড়ানো হয়।
সামগ্রিকভাবে ৪০ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধির এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে ক্ষিপ্ত হয়েছে বন্দরের সেবা গ্রহীতা সকল অংশীজন। এর মধ্যে কিছু কিছু খাতে মাশুল চারগুণ বা পাঁচগুণও (পোর্ট ড্যামারেজ চারগুণ, টাগের খরচ পাঁচ গুণ) বৃদ্ধি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই মাশুল বৃদ্ধির ফলে কন্টেইনারপ্রতি মোট মাশুল পূর্বের ১২৬.৬৫ ডলার থেকে ৪৭ ডলার বেড়ে বর্তমানে হয়েছে ১৭৩.৬৬ ডলার। ফলে আশেপাশের ১৩টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রামের মাশুল বড় অংকের পার্থক্য নিয়ে এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গোপনীয়তার কারণে অন্যান্য বন্দরের চুক্তির মতো এপিএম লালদিয়া থেকে কত হারে মাশুল নেবে তা জানা না গেলেও ধরে নেয়া যায় বর্তমানে তড়িঘড়ি করে বাড়ানো নতুন মাশুল হারের চেয়ে তা কম হওয়ার নয়। বিপরীতে লভ্যাংশের হার হিসেবে নয়, এপিএম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে তথা বাংলাদেশকে দেবে কন্টেইনার প্রতি ২১ ডলার করে। আর যদি বছরে ৮ লক্ষ ছাড়িয়ে যায় হ্যান্ডলিংকৃত কন্টেইনারের সংখ্যা তখন দেবে ২৩ ডলার করে। এই অর্থকে শতাংশের হিসাবে নিলে তা দাঁড়ায় মাত্র ১২ শতাংশে।
ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দর যেখানে পাচ্ছে ৩৫.৭৯ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশ পাবে এর এক তৃতীয়াংশ। এই হিসাব সকলের মনে স্পষ্ট করে একটা প্রশ্নই জাগাচ্ছে, তাহলে বাংলাদেশ আসলে কি লাভবান হলো এই চুক্তি থেকে? প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এই ইজারা প্রদান করা হলে এমন করে ঠকতে হতো না বাংলাদেশকে। প্রশ্ন জাগছে, তাহলে প্রতিযোগিতা ব্যতিরেকে এরকম দরপত্রের মাধ্যমে গোপন চুক্তির আওতায় বন্দর টার্মিনাল লিজ দেওয়ায় আসলে লাভবান হলো কে? কার লাভের জন্য এমন তড়িঘড়ি ও সংবিধান উপেক্ষা করা ইজারা দেওয়া? উল্লেখ্য, আশেপাশের যে একটিমাত্র বন্দরের মাশুল চট্টগ্রামের চেয়ে বেশি এখন, তা হলো শ্রীলঙ্কার সমুদ্রবন্দর। আমরা এ প্রসঙ্গে আরও জানি যে, চীনের কাছে লিজ দেওয়ায় চীন তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা জাহাজ এনে নোঙ্গর করিয়ে রাখছে কলোম্বোতে। তা দিয়ে গোটা অঞ্চলে চীনের নজরদারি ঘিরে সকল প্রতিবেশি রাষ্ট্রের অগুন্তি উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর আপত্তি আলোচনায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই তড়িঘড়ি ইজারা দেওয়ার এই ঘটনাটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্তের ওপর একটা হুমকি হিসেবেও দেখছে বিভিন্ন মহল।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান ‘কস্ট বেইজড ট্যারিফ’ ছিল সেবাগ্রহীতা অংশীজনদের কাছে সাদর গ্রহণযোগ্য। এই নীতি অনুসরণ করে নিম্নহারে মাশুল আদায়ের পরও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ছিল সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য লাভজনক প্রতিষ্ঠান। যার লাভালাভ থেকে মংলা বন্দর, পায়রা বন্দর এবং এমন বিবিধ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নও করা হয়েছে এযাবতকাল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দুষ্টচক্রের কাছে যুগ যুগ ধরেই বন্দী ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের সকল সেবা খাত। ওই বন্দীত্ব থেকে অভাবনীয় উত্তরণ ঘটেছিল ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, বন্দর ও জেটি পরিচালনায় অনভিজ্ঞ সেনা ও নৌ সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টায়। যা তারা করেছিলেন সকল অংশীজনদের সমন্বয়ে গৃহীত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। ওই একই পথ ও পন্থা অবলম্বন করে বন্দর সেবার মান সন্তোষজনক উন্নতি করে বর্তমানে আকস্মিকভাবে আরোপিত উচ্চ মাশুলের পথ না মাড়িয়ে সম্ভব ছিল উত্তরণ।
প্রযুক্তি ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে বিশ্বমানের বন্দরসেবা দেওয়া এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব ও বাণিজ্য ভাগে বৃদ্ধি ঘটাতে লালদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর টার্মিনাল তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া যৌক্তিক তবে তা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমেই কেবল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। উল্লেখ্য বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) যে আধুনিক ওয়ানস্টপ পদ্ধতিতে তাদের টার্মিনাল চালাচ্ছে তাতে প্রকৃত পদ্ধতিগত আধুনিকায়ন ঘটলেও বিভিন্ন আরোপিত সমস্যা ঘিরে এখানে সেবা পাওয়ার সময় বিলম্ব হেতু টার্মিনালটি ২০২৩ সালের নভেম্বর অব্দি পূর্ণ গতির কাছেধারেও যেতে পারছে না।
তাই অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে গোপন চুক্তিতে দরপত্রবিহীন নিয়োগে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের কতটুকু অর্জিত হবে আর কতটুকু বিবিধ প্রতিবন্ধকতার চ্যালেঞ্জে নিপতিত থাকবে তা এখনই স্পষ্ট রকম অনুমান করা না গেলেও লভ্যাংশের অংকে দেশ যথাযথ লাভবান না হওয়া, নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রসঙ্গটি চাঙ্গা থাকা, অন্তর্গত আরোপিত সমস্যাগুলোর হুমকি বলবত থাকা, চুক্তি স্বাক্ষর কর্তৃপক্ষের বৈধতা—এইসব নানা প্রশ্ন ঘিরে সংকটগুলো উবে না যাওয়া পর্যন্ত সময়ের বৃত্তে সংশয়গ্রস্ত থাকা কোনোভাবেই যতি পাচ্ছে না। তার ওপর ইউরোপীয় দেশগুলো নিজ দেশে যত সততার ঝাণ্ডাই উঁচিয়ে রাখুক, বিদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাপী কাজ করতে গিয়ে এই খ্যাতনামা দেশের শীর্ষ বন্দর সেবা ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে অন্তত আধডজন গুরুতর অন্যায় ও অসততার অভিযোগ জ্বলজ্বল করছে ব্রাজিল, গুয়াতেমালা, আমেরিকা, ডেনমার্ক ও ইসরায়েলে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলেও তাই বলতেই হচ্ছে যে, করণীয় যতই সিদ্ধ হোক কর্মপদ্ধতির কারণে এমন উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ সীমাহীন মাত্রায়।