Published : 15 Jan 2026, 10:08 AM
এবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ‘সু’-তে নির্বাচনও নাকি খুবই ‘সুন্দরভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে। ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসু আর জকসু—সবখানেই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের একচেটিয়া জয় পেয়েছে। ভোটের ফলাফল দেখে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা নানাবিধ বিশ্লেষণ হাজির করেছেন; তাদের মতে—পুরানো রাজনৈতিক পচনে অতিষ্ঠ হয়ে ছাত্ররা নাকি এবার অতি ‘সুবোধ’ ও ‘ভদ্র’ ছেলেদেরকেই নেতা নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু এই ‘সুবোধ’ ছাত্রনেতারা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ‘পরিচালনা’র গুরুভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং যে হারে শিক্ষকদের হেনস্তা করতে শুরু করেছেন, তাতে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে—এই সুবোধেরা কেন এত উগ্র হয়ে উঠেছেন?
২.
শিক্ষক হেনস্তার এই মহোৎসব চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তা হওয়াটা যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোনটা যে সর্বশেষ, তার হিসাব রাখা কঠিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্তার পর রীতিমতো 'বীরত্বের' সঙ্গে টেনে-হিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেলেন চাকসু নেতারা। অপরাধ? তিনি আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সেই অপরাধের 'শাস্তি' হিসেবে ছাত্রনেতারা তাকে টানা ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখে নিজেদের ক্ষমতার চরম মহড়া প্রদর্শন করলেন।
এর আগের খবরে প্রকাশ পেয়েছে, সালাহউদ্দিন আম্মার—যিনি এখন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছয়জন ডিনের পদত্যাগপত্র নিজ হাতে লিখে তাদেরকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান 'শিক্ষক নেটওয়ার্ক' অবিলম্বে শিক্ষকদের প্রতি একটা বিশেষ ছাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আগ্রাসী ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছে। শিক্ষকেরা বিবৃতিতে বলেন, এইসব উগ্রপন্থী ছাত্রনেতারা হুমকি দিয়েছে যে, লীগপন্থী শিক্ষকরা ক্যাম্পেসে ঢুকলে কলার ধরে টেনে এনে প্রশাসন ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে। শিক্ষক নেটওয়ার্ক সালাহউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রপ্রতিনিধিদের এখতিয়ারবহির্ভূত তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
এর আগে সংবাদ বের হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে হেনস্তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের)। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ওই শিক্ষককে হেনস্তা করেন তিনি।
এমনি অনেক ঘটনা উঠে আসছে আজকাল পত্রিকার পাতায়। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পদোন্নতির সাক্ষাৎকার দিতে এসে উপাচার্যের সামনেই ছাত্রদের হেনস্তার শিকার হয়েছেন। কলেজ, স্কুলের শিক্ষকদেরকেও নানা অজুহাতে আজকাল নাজেহাল করা হচ্ছে। শিক্ষকদের হেনস্তা ও অপদস্থ করা একটা গর্হিত কাজ—কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?
৩.
আমাদের দেশে এখন শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সব রাজনীতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি সবসময় ছিল; আগেও ছাত্ররা রাজনীতি করতেন এবং শিক্ষকেরাও। তবে ছাত্র-শিক্ষক যার যার রাজনীতির পরিসর ছিল ভিন্ন। অনেকের মধ্যেই মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকলেও একটা সমীহ ছিল। শিক্ষকেরা কোথায় কী বিবৃতি দিয়েছেন, কার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, কী বলেছেন, কী লিখেছেন—এই নিয়ে ছাত্রদের অনেকের হয়তো অসন্তোষ ছিল; কিন্তু ছাত্ররা কখনো শিক্ষকদের সঙ্গে সংঘাত জরাতেন না।
আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়তাম, আমাদের বাংলার শিক্ষক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। স্যার ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র, লোকসাহিত্যে দারুণ একজন পণ্ডিত। তিনি ছিলেন দারুণ রবীন্দ্রভক্ত, কথায় কথায় ক্লাসে কবিগুরুকে উদ্ধৃত করতেন। তখন মোনেম খান ছিলেন (পূর্ব) বাংলার গভর্নর; রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি ছিল তার দারুণ বিদ্বেষ। তিনি একদল শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী জোগাড় করেছিলেন, যারা প্রতি সপ্তাহে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতবিরোধী বিবৃতি দিতেন। আমাদের শিক্ষক আশরাফ সিদ্দিকীও ছিলেন সেই দলে। ক্লাসরুমের রবীন্দ্রপ্রেমী শিক্ষকের বাইরের এমন নির্লজ্জ রাজনীতি দেখে আমরা ঢাকা কলেজের ছাত্ররা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু এই অসন্তোষ কখনো রূঢ়তা ও সংঘাত ছড়ায়নি; হেনস্তা তো নয়-ই। ছাত্র হিসেবে আমরা তার পাণ্ডিত্যের গুণগ্রাহী ছিলাম। এখন ভাবি, আমরা কি তখন পারতাম স্যারকে জাপটে ধরে ক্লাস থেকে বের করে দিয়ে আমাদের অসন্তোষকে আরো কঠোরভাবে প্রকাশ করতে?
৪.
এখন জুলাই আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষককে আওয়ামীপন্থী বলে হেনস্তা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের পরিস্থিতির তুলনা করা চলে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক ছিলেন যারা জামায়াতপন্থী এবং জামায়াত ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সমর্থক।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসল। সেই সময়টা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব উত্তেজনাকর সময়। একদিকে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ, অন্যদিকে ভাষাহীন দুঃখ ও বেদনা। ছাত্ররা এসে দেখলেন মুক্তিযুদ্ধে তাদের অনেক সহপাঠী ও বন্ধু প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দেশের অনেক কৃতি সন্তান ও বেশ কয়জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন শত্রুবাহিনীর দালাল আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীর হাতে। তাদের মধ্যে আরো অনেকের মধ্যে ছিলেন—আমাদের প্রিয় শিক্ষক মুনীর চৌধুরী (বাংলা), আবুল খায়ের (ইতিহাস), গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (ইতিহাস), রশিদুল হাসান (ইংরেজি), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা), ফয়জুল মহী (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। আরো ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, চিকিৎসক আলীম চৌধুরী।
তখন জানাজানি হয়ে যায়, এইসব হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানপন্থী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিছু ছাত্রও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। কিছু দক্ষিণপন্থী শিক্ষকের নামও এর সঙ্গে উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৩০ জনের মতো 'দালাল শিক্ষকের' তালিকা প্রকাশ করল; বলা হলো এদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানো হবে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন (ইংরেজি) ও হাসান জামানের (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) মতো বেশ কয়জন কট্টর পাকিস্তানপন্থীও ছিলেন এই তালিকায়। আবার কিছু শিক্ষক ছিলেন শুধু মৌখিকভাবে পাকিস্তানের সমর্থক। তাদের মধ্যে অনেকেই জামায়াত সমর্থক ছিলেন। এইসব শিক্ষকদেরকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রেখে পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বাসিত করা হলো। ছুটিতে থাকা অবস্থায় এদের কেউ কেউ বিদেশে চলে গেলেন। কাউকে কাউকে সাধারণ ক্ষমার অধীনে ক্ষমা করে দেওয়া হলো। এছাড়া বাহাত্তরে অনেক শিক্ষককে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকতা করতে দেখা গেছে, যারা ছিলেন জামায়াত ও পাকিস্তানের সমর্থক। যেহেতু তারা কারো ক্ষতি করেননি, তাদেরকে কোনো রকম জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
৫.
যে কথা বলার জন্য ১৯৭১-৭২ সালের ‘দালাল’ শিক্ষকদের ঘটনার অবতারণা করলাম, তা হলো—এতসব উত্তেজনা ও শোকের মধ্যেও এই তালিকায় থাকা কোনো ‘দালাল’ শিক্ষককে ছাত্ররা কখনো অপদস্থ বা নাজেহাল করেননি। মনে রাখতে হবে, তখন অনেক ছাত্র কাঁধে বন্দুক নিয়ে সোজা রণাঙ্গন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তারা ইচ্ছে করলে অনেক অঘটন ঘটাতে পারতেন।
এইসবের মধ্যেও আমাদের শিক্ষক, যাদেরকে ছুটি দিয়ে রাখা হয়েছিল, তারা রীতিমতো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন, নিজের অফিসে এসে বসতেন এবং ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতেন। কোনো শিক্ষককে অপদস্থ করা হলো না, কাউকে টেনে-হিঁচড়ে পুলিশের কাছে দেওয়া হলো না এবং কাউকে জেলেও পাঠানো হলো না।
তখনকার ছাত্ররা জানতেন শিক্ষকদের বিচার করা তাদের কাজ নয়। শিক্ষকদেরও বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল, তাদেরকে বরখাস্ত বা জেলে ঢুকানো—যা করার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই করবেন, কিন্তু নিজেদের ছাত্ররা তাদেরকে কোনো নাজেহাল করবে না। এই বিশ্বাসগুলো তখন ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে ছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাহাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে খুব অল্প সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে এসেছিল। আমাদের তখনকার উপাচার্য মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরীর মতো লোকেরা নেতৃত্বে ছিলেন বলেই শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এত সহজ ছিল।
১৯৭২ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ডাকসু ছিল; ছিলেন ডাকসুর ভিপি, জিএস, সমাজকল্যাণ সম্পাদক ইত্যাদি। আমিও তখন ডাকসুর একজন সম্পাদক হিসেবে সেই সময়টাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমাদের সেই ডাকসুর সহযোদ্ধা যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁরা এখনকার ‘উদ্ধারকর্তা’দের কাণ্ড দেখে কী ভাবছেন জানি না। তখন কি ওই তালিকার কিছু শিক্ষককে টেনে-হিঁচড়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া উচিত ছিল আমাদের? কিংবা তখন কি ডাকসুর সদস্যরা কিছু শিক্ষককে পাঁজাকোলা করে থানায় নিয়ে গিয়ে জেলে পাঠাতে পারতাম?
১৯৭২ এবং ২০২৫-এ কেন এত পার্থক্য? ছাত্ররা তো এখনো ছাত্র, আর শিক্ষকেরা এখনো শিক্ষক। তাদের অন্য পরিচয়গুলো নিয়ে টানা-হেঁচড়া করার দায়িত্ব তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের; সেই দায়িত্ব ছাত্রদের নেওয়ার কি কোনো প্রয়োজন আছে?
৬.
শিক্ষকদেরও দায়িত্ব আছে। রাজনীতি নিয়ে শিক্ষকেরা অবশ্যই নিজেদের মতামত প্রকাশ করবেন। সেটা হবে লেখালেখিতে, সেমিনারে, এমনকি বিবৃতিতেও হতে পারে। কখনো ক্লাস রুমে নয়। আমি মনে করি, এইসব লাল, নীল, সাদা দল করে নিজেদেরকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে জড়ানো শিক্ষকদের জন্য মর্যাদাহানিকর। ছাত্রদেরও যেহেতু রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আছে, এতে বিপরীত রাজনীতির শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের বিদ্বেষ ও আস্থাহীনতার জন্ম দেয়।
এটা কোনো অজানা কথা নয়—একসময় স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নেতাদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নামজাদা শিক্ষক পরামর্শ দিতেন। সেটা ছিল শুধু পরামর্শ, কিন্তু তারা কখনো এইসব নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতেন না কিংবা কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়াতেন না। সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেহমান সোবহান 'ফোরাম' নামে একটা সাপ্তাহিক সাময়িকী বের করতেন। রাজনীতি ও অর্থনীতির পাণ্ডিত্যে ভরপুর এই সাময়িকীটা কতভাবে যে আমাদের চিন্তা ও বিবেককে সম্প্রসারিত করেছে, তা লিখতে অনেক শব্দের প্রয়োজন হবে। এই হলো শিক্ষকদের গঠনমূলক রাজনীতি!
ইসলামের খলিফা হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘যার থেকে আমি একটি হরফ হলেও শিক্ষা লাভ করেছি, তিনি আমার মনিব আর আমি তার দাস।’ শিক্ষককে সম্মান জানানোর বিষয়গুলো যদি আজকাল মক্তব-মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজে না শিখানো হয়, সেটা হবে খুব লজ্জার। ভুলে গেলে চলবে না, একজন ছাত্র একজন শিক্ষককে অসম্মান না করেও অপছন্দ বা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক