Published : 09 Jul 2026, 09:24 PM
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়ে অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করার কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রত্যেকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এর মধ্যে সাতকানিয়া পৌরসভা, ঢেমশা, বাজালিয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নের পরিস্থিতি বেশি খারাপ। সব মিলিয়ে সাতকানিয়া উপজেলায় অন্তত তিন লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে জানান ইউএনও।
কেউচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এসএম রানা জানান, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কয়েকদিন ধরে সাতকানিয়া উপজেলার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। বুধবার থেকে তা আরও বাড়তে শুরু করে। বৃহস্পতিবার পানি বেড়ে বাড়ি ঘরেও ঢুকে পড়েছে।

মোবাইল নেটওয়ার্কে ঝামেলা, বিদ্যুৎহীন বিভিন্ন গ্রাম
স্থানীয়রা জানান, বুধবার বিকাল থেকে বিভিন্ন গ্রাম বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু স্থানে দুপুরে বিদ্যুৎ এলেও আবার চলে গেছে। পাশাপশি মোবাইল নেটওয়ার্কেও বিভ্রাট হচ্ছে।
ইউএনও মাহমুদুল বলেন, ঝড়ে বিভিন্ন এলাকায় গাছ ভেঙে তার ছিঁড়েছে। নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে দুপুরের পর থেকে কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।
মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, উপজেলায় মোট ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কিন্তু কোন কেন্দ্রে কত লোক উঠেছে তা মোবাইল নেটওয়ার্কের বিভ্রাটের কারণে জানা যায়নি।
গত রোববার থেকে টানা পাঁচ দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে চট্টগ্রামে। তবে বৃহস্পতিবার বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২২৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
সাতকানিয়ার বাসিন্দাদের ভাষ্য, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে পাহাড়ে বৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে। সাঙ্গু নদী, ডলু ও হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে ভাটির দিকে। সাঙ্গু নদীর পানি বেশি থাকায় সাতাকানিয়াতে পানি বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

উদ্ধার কাজে দরকার স্পিডবোট
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম সাতকানিয়ার উদ্ধার কাজ বেগবান করতে ১০টি স্পিডবোট প্রয়োজন বলে দাবি করেন।
দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাতাকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পানিবন্দি লোকজনকে আপাতত নৌকার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হচ্ছে। উদ্ধার কাজ ত্বরান্বিত করতে স্পিডবোট চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বাঁশখালী
বাঁশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন জানান, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে কমবেশি সবগুলো ইউনিয়নের লোকজন পানিবন্দি হয়েছে। তবে পুঁইছড়ি, নাপোড়া, ছনুয়া, সরল, শেখের খিল, বৈলছড়ি ও কাথারিয়া ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ।
সব মিলিয়ে এ উপজেলার অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে জানান সহকারী কমিশনার আঁকন।

চন্দনাইশ
চন্দনাইশের উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার মধ্যে হাশিমপুর ও জোয়ারা ইউনিয়ন ছাড়া সবকটি ইউনিয়ন কমবেশি দুর্গত হয়েছে।
“সবমিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।”
ইউএনও বলেন, বুধবার গাছ পড়ে দুটি টিনের ঘর এবং বৃষ্টির পানিতে দুটি মাটির ঘর পড়ে গেছে। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
লোহাগাড়া
লোহাগাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ বিন আখন্দ জানান, উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে আমিরাবাদ, আধুনগর, পদুয়া ও লোহাগাড়া ইউনিয়নে বন্যার পানিতে অনেকেই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে আমিরাবাদ ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ইউনিয়নগুলো সাঙ্গু ও ডলু নদী সংলগ্ন, সে কারণে পানি বেশি উঠেছে।

চাল এসেছে ২০০ মেট্রিক টন, টাকা ৩০ লাখ
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম জানান, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এসব টাকা ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে।
বানভাসী মানুষ যাতে খাদ্য সংকটে না পড়ে, সেজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।